তা তো বুঝতেই পারছি।
শুক্রবার মানে পরশু আসছে?
হ্যাঁ ভাবিজী।
এবার ভূমিকা ত্যাগ করে কাজের কথায় এলেন ভাবিজী, তোমার অ্যাপার্টমেন্ট ছোট হলেও ওদের তো আমার কাছে থাকতে দেবে না। তা যাই হোক সারাদিন তো তোমরা ঘোরাঘুরি করবেই এবং রোজ সন্ধ্যার পর ঠিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় ঢুকবে…।
না না, ভাবিজী, বন্দনা আবার ওসব পছন্দ করে না।
তা না করুক। মোট কথা রোজ সন্ধ্যার পর তোমরা তিনজনে আমার এখানে আসবে। গল্পগুজব-খাওয়া-দাওয়া করে ফিরে যাবে, বুঝলে?
বেশ একটু সঙ্কোচের সঙ্গে তরুণ বলল, রোজ কি সম্ভব হবে?
তবে কি একদিন ডিনার খাইয়ে ভদ্রতা করতে বলছ?
আর কি বলবে তরুণ? আচ্ছা ভাবিজী, আপনার সঙ্গে তর্ক করার সাহস তো আমার হবে না।
বিকেলবেলার দিকে মিঃ দিবাকর এলেন।
কি ব্যাপার? কোনো জরুরি খবর আছে নাকি? তরুণ জানতে চায়।
সি-জি পাঠিয়ে দিলেন। আপনার বোন-ভগ্নীপতি আসছেন, তাই যদি কোনো দরকার থাকে।
থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।
সি-জি জিজ্ঞাসা করছিলেন আপনার কি ড্রাইভার লাগবে? যদি লাগে তাহলে…
না না, আমি তো নিজেই ড্রাইভ করি। ড্রাইভার লাগবে কেন?
বন্দনারা আসছে শুনে মি: ও মিসেস ট্যান্ডন অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। আপনজন বলতে তরুণের কেউ নেই। মা-বাবা ভাই-বোন কেউ না। যারা সহজ পথে প্রথম প্রেম ভুলতে পারে তরুণ তাদের মধ্যেও পড়ল না। জীবনে আর কোনো মেয়েকে সে আপন ভাবতে পারল না। বন্দনারা এলে অন্তত কদিনের জন্য ওর নিঃসঙ্গতা ঘুচবে ভেবেই মিঃ ও মিসেস ট্যান্ডন অত্যন্ত খুশি।
দুটো দিন কোথা দিয়ে যে কেটে গেল তা টের পেল না তরুণ। শুক্রবার সকালে অফিস করে লাঞ্চ টাইমেই বেরিয়ে পড়ল। আনন্দে উত্তেজনায় লাঞ্চই খেল না। প্লেন ল্যান্ড করবে। সওয়া তিনটেয়। প্লেনেই বন্দনাদের লাঞ্চ খাওয়া হয়ে যাবে। তবুও তরুণ ভাবল, ওরা এলেই খাব।
প্লেন ল্যাভ করার বেশ খানিকটা আগে পৌঁছে গেল এয়ারপোর্টে। দেখেশুনে বেশ একটা ভালো জায়গায় গাড়িটা পার্ক করল, যাতে বেরুতে না দেরি হয়। একটি মুহূর্তও যেন অপব্যয় না হয়।
এয়ারপোর্টে লাউঞ্জে পায়চারি করতে করতে আর একবার মনে মনে রিহার্সাল দিয়ে নিল ওরা এলে কি করবে। ইতিমধ্যে কখন যে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে প্যান আমেরিকান প্লেন এসে গেছে, সে হুঁশ নেই। অতগুলো সাহেবসুবোর ভিড়ের মধ্যে ঢিপ করে বন্দনা প্রণাম করতেই হুঁশ ফিরে এল তরুণের।
বন্দনার হাত দুটো ধরে তুলে নিতে নিতে বলল, আরে থাক থাক, এখানে নয়।
কে কার বাধা মানে? কথা শেষ করতে না করতেই বিকাশও একটা প্রণাম করল। মালপত্র নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতে বেরুতে তরুণ বিকাশকে জিজ্ঞাসা করল, কোনো কষ্ট হয়নি তো?
বন্দনা বলল, ওর আবার কি কষ্ট হবে? বিনা পয়সায় বার্লিন ঘুরিয়ে দিচ্ছি, তাতে আবার কষ্ট কিসের?
আঃ বন্দনা! কি যা তা…
এত সহজে কি বিকাশ হার মানে? তোমার টি বোর্ডের পয়সায় বার্লিন দেখছি?
তরুণ থামিয়ে দেয়, বাড়িতে গিয়ে সারারাত ঝগড়া করা যাবে, এখন তাড়াতাড়ি চলো তো।
অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। সামনে লিভিং রুমে মালপত্র নামিয়ে রেখেই তরুণ বলল, নাও নাও, চটপট হাত-মুখ ধুয়ে নাও; ভীষণ খিদে পেয়েছে।
বিকাশ অবাক হয়ে বলল, সেকি দাদা, আমরা তো আজ দুবার লাঞ্চ খেয়েছি।
কন্টিনেন্টাল ফ্লাইট যত ক্ষণস্থায়ীই হোক না কেন, ভুরিভোজনের ব্যবস্থা থাকেই-একথা তরুণ জানে। তবুও ওদের নিয়ে একসঙ্গে লাঞ্চ খাবার লোভে বেশ কিছু ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ও কিছু বলবার আগেই বন্দনা বলল, তুমি কি বলল তো দাদা! সারাদিন না খেয়ে বসে আছ?
আঃ! কি বকবক করছ। হাতমুখ ধুয়ে নাও, সবাই মিলে একটু কিছু মুখে দেওয়া যাক।
বন্দনা আর তর্ক করে না। কোথায় কি আছে, একটু দেখিয়ে দাও তো দাদা। বিকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, একটু তাড়াতাড়ি নাও। দেখছ না, দাদা না খেয়ে আছেন।
সংসারধর্ম বুঝে নিতে মেয়েদের সময় লাগে না, বন্দনারও লাগল না। লিভিং রুমে কৌচে বসে সেন্টার টেবিল টেনে নিয়ে মহানন্দে খাওয়া-দাওয়া মিটল। বন্দনাকে পেয়ে তরুণ হঠাৎ মহাকুঁড়ে হয়ে গেল, হাত ধুতেও উঠে গেল না।
বন্দনা, একটু হাত ধোবার জল…।
এমন সুরে কথাটা বলল যে বন্দনার বড় মায়া লাগল। তোমাকে কে উঠতে বলেছে?
ওই কৌচে বসেই শুরু হলো আড্ডা।
সব চাইতে আগে বল, তোমাদের ছুটি কদিন?
তরুণের এই প্রশ্ন শুনেই বন্দনা আর বিকাশ একবার দৃষ্টিবিনিময় করল। ওরা ভেবেছিল, এয়ারপোর্টেই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। লন্ডন থেকে রওনা হবার আগেই তাই শলা-পরামর্শ করে উত্তরদাতাও উত্তর ঠিক করে রেখেছিল।
বিকাশ চিবুতে চিবুতে বলল, নেকসট উইক থেকে আমাদের অডিট!
চিমটি কেটে তরুণ জানতে চাইল, তিন চারদিন আছো তো?
না-না, দাদা, তিন-চারদিনের জন্য কি এত খরচা করে এতদূর আসে?
বন্দনা চুপটি করে বসে মিটমিট করে হাসছিল। এবার তরুণ ওকে জিজ্ঞাসা করল, বন্দনা, তোমার অডিট কি এই উইকেই শুরু হচ্ছে?
আচ্ছা দাদা, অমন করে কথা বলছ কেন? আমি কি বলেছি–?
আর এগুতে হলো না।-তোমার হয়ে আমিই না হয় বলে দিলাম।
হাসি-খুশিতে ডগমগ হয়ে বন্দনা বলল, ও চলে যাবে যাক। আমি এত সহজে যাচ্ছি না।
ফরেন সার্ভিসের কর্মচারীরা ফরেন সেক্রেটারির চাইতে অডিট পার্টির নিম্নতম কর্মচারীকে যে বেশি ভয় করে, তা তরুণ জানে। তাছাড়া বিকাশের সেকশনের উপরেই যে অডিট করাবার ভার, সে খবরও তরুণ রাখে। তাহলে ছুটি পেলে কেমন করে?
