জবাব দেয় বন্দনা, কেন তুমি যাবে নাকি?
তরুণ শাসন করে, আঃ বন্দনা! তারপর আবার বলে, রিয়েলি দে আর ভেরি চিপ। দু ডলার দিলেই বড় বড় নাইট ক্লাবে যাওয়া যায়।
…দু বছর পরে সেই ওবেরয় যখন বেইরুটে ট্রান্সফার হলো, তখন সর্বনাশের পথে নামতে আর দেরি হল না। মেডিটারিয়ানে মাতাল হাওয়া ওকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধবরা ঠাট্টা করে ওর নাম দিল, ইভস্ অ্যাম্বাসেডর।
লেবাননের রাজনৈতিক গুরুত্বের চাইতে ওখানকার নাইট ক্লাবের প্রাধান্য বেশি। কিন্তু তবুও বেইরুটে আমাদের একটা বিরাট চান্সেরী আছে। ফরেন সার্ভিসের ক্লাস ওয়ান অ্যাম্বাসেডর পাঠান হয় এই মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিসে! ডজন ডজন ডিপ্লোম্যাট আর শতাধিক কর্মচারী আছেন এই চান্সেরীতে। এছাড়া পূর্ব-পশ্চিম যাতায়াতের পথে বেইরুটে রাত কাটান না, এমন ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাট নেইই।
এদের সবাইকে ঠকিয়েছে ওবেরয়। কাউকে দশ-বিশ পাউন্ড কাউকে আবার সত্তর-আশি একশো পাউন্ড!
কয়েক বছর পরের কথা। ওবেরয় তখন জেনেভায়। বোম্বে থেকে খবর এলো মার ক্যান্সার। অতীত দিনের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অর্ধেক মাইনেটাও পেত না বেচারী। কারুর কাছে হাত পাতারও সাহস ছিল না। প্রয়োজন ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বোম্বে যাবার কথা ভাবতে পারল না।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে তরুণ বললে, উই হ্যাভ লিটল ডিপ্লোম্যাসি উইথ আওয়ার ডিপ্লোম্যাট কলিগ। ওবেরয় কিছু টের পেল না, কিন্তু খবরটা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
বন্দনার মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে পড়ল, আচ্ছা।
খবরটা শুধু ছড়িয়েই পড়ল না টপ সিক্রেট কনসালটেশন হল ইউরোপের পাঁচ-সাতটা ইন্ডিয়ান মিশনের পনের-বিশ জন ডিপ্লোম্যাটের মধ্যে। ঠিক হলো ওবেরয়কে না পাঠিয়ে ওর মাকে জেনেভায় আনান হোক চিকিৎসার জন্য। ডিসিসনের সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাকশান! এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডন অফিসে পনের-বিশটা চেক পৌঁছে গেল। দিল্লি থেকে বোম্বেতে খবর পৌঁছে গেল ওবেরয়ের একমাত্র বোন ও ভগ্নিপতির কাছে, কনটাক্ট এয়ার ইন্ডিয়া ইমিডিয়েটলি ফর। ইওর মাদার্স জার্নি টু জেনেভা ফর ইমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট!
তরুণ সে সব কথা বলতে গিয়ে হেসে ফেলল। ওবেরয় এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকে মার আসার খবর পেয়ে চমকে গিয়েছিল।
বিকাশ জানতে চাইল, ভদ্রমহিলা সেরে গেলেন কি?
না!
অতীত দিনের তিক্ততার কথা ফরেন সার্ভিসের কেউ মনে রাখেন না। রাখতে পারেন না। ওটা ওঁদের ধর্ম নয়, কর্ম নয়। অতীত দিনের কথা মনে রাখলে কি ডিপ্লোম্যাসি করা যায়? অসম্ভব।
ওবেরয়কে যারা এমন করে ভালোবাসতে পারেন, তারা তরুণের জন্য ভাবলেন না?
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তরুণ বলে, এদের মতো কিছু মানুষ না থাকলে হয়তো আমি পাগল হয়ে যেতাম। এই পৃথিবীতে একলা থাকার মতো অভিশাপ আর নেই।
ঘরের পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেল। বিকাশ একবার বন্দনার দিকে তাকাল, বন্দনা বিকাশকে দেখে নিল।
তুমি একলা কোথায়? আমরা কি তোমার কেউ নই দাদা? বন্দনা যে একটু আহত মন নিয়ে কথাটা বলল।
ডান হাত দিয়ে বন্দনার মাথাটা টেনে কাঁধের উপর রেখে আদর করতে করতে তরুণ বলল, আমি কি তাই, বলেছি? তোমাদের চাইতে আপন আমার আর কে আছে?
বিকাশ তরুণকে ভয় না করলেও বেশ সমীহ করে চলে। আজ যেন একটু সাহস পেল। ওকে এত বেশি আদর করবেন না দাদা।
বন্দনা মাথাটা তুলে ভ্রু কুঁচকে বিকাশের দিকে তাকাল।
তরুণ জানতে চাইল, কেন?
একটু চাপা হাসি হাসতে হাসতে বিকাশ জবাব দেয়, আপনি ওকে ভালোবাসেন বলে ওর বড় বেশি অহংকার আর আমাকে ভীষণ কথা শোনায়।
সে কি বন্দনা? আমার জন্যে ওকে কথা শোনাও?
না দাদা, ও সব মিথ্যে কথা বলেছে।
ইভন ইফ দে আর মিথ্যে, আই ডোন্ট লাইক টু হিয়ার সা সিরিয়াস অ্যান্ড ডামেজিং অ্যালিগেশন।
স্বামীকে আর বেশি অপদস্থ করতে চায় না বন্দনা। দাদা, কফি খাবে?
কফি খেতে ভীষণ ভালোবাসে তরুণ। ওর বহুঁকালের স্বপ্ন ডিনারের পর এক কাপ ঘন ব্ল্যাক কফি নিয়ে গল্প করবে ইন্দ্রাণীর সঙ্গে, বন্দনা-বিকাশের সঙ্গে।
কফি? হোয়াট এ ওয়ান্ডারফুল আইডিয়া।
বন্দনা বিকাশকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি খাবে?
হাতের ঘড়িটা দেখে নিয়ে বিকাশ বলল, না না, একটা বেজে গেছে, আমি আর খাব না।
তরুণ হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল। সত্যিই তো অনেক রাত হয়ে গেছে। থাক থাক বন্দনা, আর কফি করতে হবে না। তোমরা বরং শুতে যাও।
বন্দনা বলে, আমি এখন শুচ্ছি না।
যাও বিকাশ তুমি শুয়ে পড়।
বিকাশ একটু আপত্তি করছিল, কিন্তু বন্দনার কথায় আর দেরি করল না। বিয়ের পর এই তো প্রথম ভাইয়ের কাছে এলাম। তুমি যাও তো, আমাদের একটু প্রাইভেট কথাবার্তা বলতে দাও।
তরুণ আবার শাসন করে, আঃ বন্দনা!
বন্দনা প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঠেলেঠুলেই বিকাশকে শোবার ঘরে পাঠিয়ে দিল।
দু কাপ ব্ল্যাক কফি শেষ হবার পরও কত কথা হলো দু ভাইবোনের।
আচ্ছা দাদা, তুমি রেগুলার চিঠিপত্র দাও না কেন বল তো?
চিঠি লিখতে ভালো লাগে না। তাছাড়া চিঠিপত্র লিখে কি মন ভরে? তরুণ নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দেয়, আমাদের কাছে পেতেই ভালো লাগে।
ডান হাতের উপর মুখটা রেখে বন্দনা মুগ্ধ হয়ে দাদার কথা শোনে।
আচ্ছা বন্দনা, আমি যদি লন্ডনে ট্রান্সফার হই, তাহলে বেশ একসঙ্গে থাকা যাবে-তাই না?
