মণিলালের সঙ্গে তরুণ বছর খানেক মাত্র কাজ করেছিল দিল্লিতে। তারপর আর দেখা হয়নি কোনোদিন। সেই মণিলাল দেশাই চিঠি লিখেছে।
মুগ্ধ বিস্মিত তরুণ রাইটিং ডেস্কের ওপর রাখা ইন্দ্রাণীর ফটোটা একবার দেখে নেয়। তারপর আপন মনে প্রশ্ন করে, এত লোকের প্রচেষ্টাও কি তুমি ব্যর্থ করে দেবে?
দেশাই-এর চিঠিটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে উঠে যায় রাইটিং ডেস্কের কাছে। হাতে তুলে নেয় ইন্দ্রাণীর ফটোটা।
…অনেক দিন পর আমাকে দেখলে? তাই না?
নিজের প্রশ্নের কৈফিয়ত নিজেই দেয়, কি করব বল? তুমি তো জান ডিপ্লোম্যাটের জীবন!
একটু থামে। একটু হাসে। আমার মতো ঘরকুনো কুঁড়ে ছেলে কি এমনি এমনি বেরুতে চায়? একলা একলা থাকতে কি ভালো লাগে? এই এত বড় অ্যাপার্টমেন্টে একলা একলা থাকতে বুকটা বড় জ্বালা করে, বড় বেশি করে তোমাকে মনে পড়ে…
চোখের দৃষ্টিটা যেন একটু ঝাঁপসা হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি ফটোটা নামিয়ে রেখে ফিরে আসে কৌচে। চিঠিপত্রের বান্ডিল হাতে তুলে নেয়। বন্দনা দুটো চিঠি লিখেছে?…কি আশ্চর্য লোক বলো তো তুমি! কদিন তোমার খবর পাই না। দুটো-তিনটে চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেলাম। তোমার জন্যে যে আমার কত ভাবনা-চিন্তা হয়, তা হয়তো বিশ্বাস কর না বা জান না। জানলে কখনও তুমি আমাকে এমন কষ্ট দিতে না…
এতক্ষণ পর্যন্ত তবু সহ্য করেছিল তরুণ কিন্তু তারপর কি লিখেছে?
…আমি না হয় মার পেটের বোন নই, কিন্তু তাই বলে আমাকে এমন দুঃখ দেবে কেন? আমার ভালোবাসার এমন অমর্যাদা করবে কেন?…
পাগলি মেয়েটা দ্বিতীয় চিঠিটায় শুধু দুটো লাইন লিখেছে, দয়া করে শুধু জানাও তুমি সুস্থ আছ, ভালো আছ। সম্ভব হলে বার্লিন গিয়ে তোমার খোঁজ করে আসতাম। কিন্তু তুমি। জান, সে সামর্থ্য আমার নেই।
বড় অপরাধী মনে হলো নিজেকে। বন-এ যাবার পর অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে দিন কেটেছে, ঘুরতে হয়েছে কয়েক হাজার মাইল। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর লিখতে হয়েছে লম্বা লম্বা রিপোর্ট। কিন্তু তবুও বন্দনাকে একটা চিঠি লেখা উচিত ছিল। বড় অন্যায় হয়ে গেছে।
আরো একটা অন্যায় হয়ে গেছে। বন্দনা সামান্য চাকরি করে। তাছাড়া প্রতি মাসেই দেশে বেশ কিছু পাঠাতে হয়। বিকাশেরও একই অবস্থা। সুতরাং কদিনের জন্য বার্লিন বেড়াতে আসা। ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। তরুণেরই উচিত ছিল একবার ওদের নিয়ে আসা। ওরা ছাড়া তরুণের আর কে আছে?
বেশ ক্লান্তবোধ করছিল। কোনোমতে জামা কাপড় চেঞ্জ করে কয়েকটা স্যান্টউইচ আর এক কাপ কফি খেয়ে নিল। তারপর একটা দীর্ঘ চিঠি লিখল বন্দনাকে।
শেষে লিখল, কিছুদিনের জন্য তোমরা দুজনে নিশ্চয়ই আমার কাছে আসবে। বিকাশকে বোলো ডেপুটি হাই কমিশনারকে আমার কথা বলতে। তাহলে ওর ছুটির কোনো অসুবিধা হবে না। আর তোমার ছুটি নেবার তো কোনো ঝামেলাই নেই! অ্যাপ্লিকেশন লেখ না বলেই তো ছুটি পাও না। প্যান আমেরিকান অফিসে খোঁজ করে তোমাদের ওপন টিকিট দুটো নিয়ে নিও।
চিঠি শেষ করার আগে আরো দুটো লাইন জুড়ে দিল, যদি আমার এ অনুরোধ রক্ষা করতে না পার তবে এ চিঠির জবাব দিও না। আর আমাকে দাদা বলেও কোনোদিন ডাকবে না।
পরের দিন সকালে অফিসে গিয়েই প্যান অ্যামেরিকান অফিসে ওদের দুজনের ভাড়া পাঠিয়ে দিল।
চিঠির জবাব এলো না। চারদিন পর এলো টেলিগ্রাম, রিচিং ফ্রাইডে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ফাইভ-সেভেন-
সিক্স বন্দনা-বিকাশ। তরুণ জানত এমনি একটা কিছু হবে। বন্দনা যতই রাগ করুক চিঠি পাবার পর আর রাগ করে থাকতে সাহস করবে না। কেবল্টা পাবার পর তরুণ আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল।
কেবলটা হাতে নিয়ে চলে গেল কন্সাল জেনারেল ট্যাভনের ঘরে। কোনো ভূমিকা না করেই বলল, হ্যাভ আই টোন্ড ইউ অ্যাবাউট বন্দনা?
ট্যান্ডন সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, কতবার বলেছ তার কি ঠিক-ঠিকানা আছে?
বন্দনা আর বিকাশ আমার এখানে আসছে।
দ্যাট ইজ হোয়াই ইউ লুক লাইক এ ম্যাড চ্যাপ।
তরুণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসে।
ওরা কবে আসছে?
এই শুক্রবার।
তাহলে তো সময় নেই। বাড়ি ঘরদোর তো একটু ঠিকঠাক করতে হবে।
হ্যাঁ, কিছু তো করতেই হবে।
তাহলে তুমি বরং বাড়ি যাও। আমি অফিসে আছি।
না না, তা কি হয়? কৃতজ্ঞ তরুণ বলে।
আই সে গো হোম! এরপর তর্ক করলে বকুনি খাবে।
আর একটি কথাও না বলে তরুণ চলে এলো নিজের ঘরে। টুকটাক কাগজপত্র সামলে নিয়ে অফিস থেকে বিদায় নিল।
অ্যাপার্টমেন্টে একবার ঘরদোর ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে ভাবছিল ওদের জন্যে স্পেশ্যাল কি করা যায়। আর এক চক্কর ঘুরতে গিয়ে রাইটিং ডেস্কের উপর রাখা ইন্দ্রাণীর ফটোটা বড় বেশি চোখে লাগল। আলতো করে ফটোটা তুলে নিল নিজের হাতে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে। কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল, শুনছ, বন্দনারা আসছে। তুমি আসবে না?
মনে হল ইন্দ্রাণী জবাব দিল, আসব বৈকি। তোমাকে ছেড়ে আর কতকাল থাকব বল।…
টেলিফোনটা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রাণী কোথায় লুকিয়ে পড়ল। ফটোটা নামিয়ে রেখে তরুণ টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিল, টরুণ হিয়ার…কি ভাবিজী? কি ব্যাপার?
হঠাৎ এমন সময় মিসেস ট্যান্ডনের টেলিফোন।
বন্দনা আসছে?
এর মধ্যে সে খবর আপনার কাছে পৌঁছে গেছে?
উনি এক্ষুনি অফিস থেকে টেলিফোন করে জানালেন।
