হ্যাঁ দাদা।
কবে?
এইতো তিন সপ্তাহের মধ্যেই আই উইল সেল ফর বম্বে। তারপর সিকস্ উইক দেশে থেকেই করাচি যাব।
ওয়াইন গেলাসটা মুখে তুলতে গিয়েও নামিয়ে রাখল তরুণ। স্বগতোক্তির মতো চাপা গলায় বলল, তুমি করাচি যাচ্ছ?
হাবিবও গেলাসটা নামিয়ে রাখে। একটা সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দেয়। দু-এক মিনিট চুপ করে থেকে প্রশ্ন করে, দাদা, করাচিমে কোই কাম হ্যায়?
এবার একটু জোর করেই হাসে তরুণ, কাম? একটু জরুরি কাজ আছে ভাই।
টেল মি হোয়াট আই উইল হ্যাভ টু ডু। মুহূর্তের জন্য একটু চিন্তা করে বলে, যদি আমার দ্বারা না হয় তাহলে আই উইল আস্ক মাই আংকেল টু হেল্প মি।
হু ইজ ইওর আংকেল?
উনি পাকিস্তান ফরেন মিনিস্ট্রির অ্যাডিশন্যাল সেক্রেটারি।
উল্লসিত হয় তরুণ, রিয়েলি?
আর থাকতে পারে না তরুণ। হাবিবের হাত দুটো চেপে ধরে বলে, ইউ মাস্ট হেল্প মি, হাবিব।
নো কোশ্চেন অফ হেল্প দাদা, আপনার কাজ করা আমার কর্তব্য!
ওই রাত্রে দূর থেকে ব্ল্যাক ফরেস্টে সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত পেলো ভগ্নমনা তরুণ সেনগুপ্ত।
জলপ্রপাতের জলধারা যেমন দুরন্ত বেগে গড়িয়ে পড়ে, তরুণও প্রায় সেই রকম এক নিশ্বাসে সব কথা বলে ফেললে হাবিবকে।
অত করে বলার কিছু নেই। কিছু কিছু আমিও জানি, বিকজ আই সেন্ট দ্য অ্যাম্বাসের্ডস মেসেজ টু ফরেন অফিস।
এই পৃথিবীতে মানুষের কত কি সহ্য করতে হয়। জরা, দারিদ্র্য, ব্যাধির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা যায়, সান্ত্বনা পাওয়া যায়, কিন্তু প্রিয়হীন নিঃসঙ্গ মানুষের মতো অসহায় আর কেউ নয়। কাজের মধ্যে যখন ডুবে থাকে, যখন বৃদ্ধ আদ্যেনুরের রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যালান্সশীট মেলাতে হয়, তখন বেশ কেটে যায়। কিন্তু যখন কাজের চাপ নেই, যখন ব্ল্যাক ফরেস্টের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে নিজেকে বড় বেশি অনুভব করা যায়, যখন নিজের হৃদপিণ্ডের মৃদু স্পন্দনও। দৃষ্টি এড়ায় না, তখন হাবিবের মতো কনিষ্ঠ সহকর্মীর কাছেও আত্মসমর্পণ করতে লজ্জা করে না।
হাবিবের দুটো হাত চেপে ধরে তরুণ বলে, ইউ মাস্ট ডু সামথিং হাবিব। আমি বড্ড লোনলি।
বন-এ ফিরেই অ্যাম্বাসেডারের কাছে আর একটা সুখবর পাওয়া গেল।
দেয়ার ইজ এ গুড পিস্ অফ নিউজ ফর ইউ।
তরুণ মুখে কিছু বলে না, শুধু অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকে অ্যাম্বাসেডরের দিকে।
পাকিস্তান ফরেন অফিস হ্যাঁজ ইনফর্মড আওয়ার ফরেন অফিস যে, রায়ট ভিকটিমসদের সমস্ত নাম চেক আপ করেও ইন্দ্রাণীর নাম পাওয়া যায়নি।
রিয়েলি স্যার? তরুণের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
অ্যাম্বাসেডর ডান হাত দিয়ে তরুণের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন, তুমি ফাইল দেখতে চাও?
অ্যাম্বাসেডর মনে আঘাত পেলেন নাকি? না না, স্যার। ফাইল দেখে কি করব? আপনার মুখের কথাই আমার যথেষ্ট।
অ্যাম্বাসেডর আরো বললেন, তবে পাকিস্তান ফরেন অফিস জানিয়েছে, ইট উইল টেক টাইম টু ট্রেস আউট ইন্দ্রাণী।
টাইম? তা তো লাগবেই। পুলিশের ফাইল ঘেঁটে বর্ডার চেকপোস্টগুলোর রেকর্ড দেখতে হবে, ইন্দ্রাণী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতবর্ষে চলে গেছে কিনা। বর্ডার চেকপোস্টের রেকর্ড হদিস না পেলে আবার নতুন করে খোঁজ করতে হবে। সময় তো লাগবেই।
…তাছাড়া হাবির ইজ গোয়িং টু করাচি অ্যান্ড হিজ আংকেল ইজ দ্য রাইট পার্সন টু হেল্প আস।
হ্যাঁ স্যার, তাই তো শুনলাম।
সুতরাং তোমার আর চিন্তা কি? বাই দ্য টাইম ইউ লিভ বার্লিন, ইন্দ্রাণী উইল রিজয়েন ইউ।
তরুণ মনে মনে বলে, আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক স্যার।
দুঃখে নয়, আক্ষেপে নয়, গোপন খবর সংগ্রহের জন্যেও নয়, নিছক আনন্দে, খুশিতে সে রাত্রে হাবিবের সঙ্গে বোতল বোতল রাইন ওয়াইন ড্রিংক করল তরুণ।
১৬. অ্যাম্বাসেডরের টেলিফোন পেয়ে
অ্যাম্বাসেডরের টেলিফোন পেয়ে কাউকে খবর না দিয়েই বার্লিন ত্যাগ করেছিল তরুণ। বন-এ থাকবার সময়ও অবসর পায়নি কাউকে চিঠিপত্র দেবার। বন্দনাকেও নয়। ফিরে এসে দেখল অনেক চিঠিপত্র এসেছে। একটা খামে পাকিস্তানী স্ট্যাম্প দেখে চমকে উঠল। ঢাকা থেকে মণিলাল দেশাই?
সবার আগে ঐ চিঠিটাই খুলল। চিঠিটি দীর্ঘ নয়। চটপট পড়ে ফেলল। তারপর আবার পড়ল।…পাকিস্তান গভর্নমেন্ট বেশ সিরিয়াসলি কেসটা টেক-আপ করেছে বলেই মনে হচ্ছে। শুনছি পার্টিশানের সময় যেসব সরকারি কর্মচারী ঢাকায় ছিলেন তাদের কাছে একটা সার্কুলার পাঠিয়ে ইন্দ্রাণীর খবর জানবার চেষ্টা করা হবে। মাইনরিটি কমিশন এইভাবে বহু লোকের খবর জেনেছেন এবং মনে হয় এক্ষেত্রেও কিছু খবর পাওয়া যাবে। তবে এসব ব্যাপারে সময় লাগবেই।
দেশাই যে ঢাকায় আমাদের ডেপুটি হাই কমিশনে আছে, একথা তরুণ জানত না। মণিলাল। গুজরাটী হলেও জন্মেছে কলকাতায়, ভবানীপুরে। লেখাপড়াও শিখেছে কলকাতায়। মণিলালের বাবা সৌরাষ্ট্রে বিশেষ সুবিধে করতে না পেরে যৌবনে চলে আসেন কলকাতায়। নগণ্য পুঁজি, সামান্য বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু পরিশ্রম ও সতোর জন্য কয়েক বছরেই নিজের অদৃষ্ট ঘুরিয়ে ফেলেন।
মণিলালের বাবা ছেলেকে ব্যবসায় ঢুকতে দেননি। তুমি লেখাপড়া শিখে মানুষ হও। আমার মতো দোকানদারি করো না।
মণিলাল ব্যর্থ করেনি তার বাবার আশা। কলকাতার রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রামে অবাঙালিদের প্রতি বাঙালিদের বিতৃষ্ণার প্রকাশ দেখেছে বহুদিন কিন্তু বিরক্ত বোধ করেনি। সে তো বোম্বে, আমেদাবাদ, সুরাট ও বরোদার গুজরাটী নয়। সুরাটের আত্মীয়-বন্ধুরা তো ওদের বাঙালি বলে। মণিলাল তার জন্যে গর্ব অনুভব করে। দেশে গেলে ওদের সঙ্গে তর্ক করে, ঝগড়া করে বাঙালির হয়ে।
