তরুণ জানে দাদুকে এককালে সবাই ভয়-ভক্তি করলেও আজ নিন্দায় মুখর বহুজনে। প্রকাশ্যে, মুক্তকণ্ঠে।
নির্বাচনের উত্তেজনায় কটা সপ্তাহ কোথা দিয়ে কেটে গেল, তরুণ টের পেল না। পনের দিনে দশটি প্রদেশে ঘুরে ঘুরে কত অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। বড় বেশি ক্লান্ত বোধ করছিল। অ্যাম্বাসেডর বড় খুশি হয়েছিলেন তরুণের রিপোর্ট। তাই তো সবকিছু মিটে যাবার পর অ্যাম্বাসেডর তরুণকে বললেন, বড্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে তোমাকে। টেক সাম রেস্ট রিটার্নিং টু বার্লিন!
তরুণ ধন্যবাদ জানাল, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী মাচ স্যার!
প্রথম দু তিন-দিন তো কোলোনেই কেটে গেল। দিনে মিউজিয়ামে ও রাতে নাইট ক্লাব রোমান্টিকাতে। রোজ রোজ যেতে ভালো না লাগলেও চ্যাটার্জীর পাল্লায় পড়ে যেতেই হতো, আর ওই দোতালার কোণার টেবিলে বসে রাইন ওয়াইন খেতে খেতে শুনতে হতো ওর ইন্দোনেশিয়ার কাহিনি।
তরুণের এসব কোনোকালেই ভালো লাগে না। বিশেষ করে যারা নিজের অধঃপতনের কাহিনি বলতে গর্ব অনুভব করে, তাদের তরুণ মনে মনে দারুণ ঘৃণা করে। তবুও চ্যাটার্জিকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। হাজার হোক এককালের সহকর্মী ও সমসাময়িক। দিল্লিতে রোজ একসঙ্গে লাঞ্চ খেয়েছে, সন্ধ্যায় কনট প্লেস-এ ঘুরেছে, সাঞ্জ হাউসে ওডিসি নাচ দেখেছে। আরো কত কি করেছে।
চ্যাটার্জির প্রথম ফরেন পোস্টিং হলো ইন্দোনেশিয়া। নিষ্ঠাবান, আদর্শবান, ধর্মভীরু সন্তোষ চ্যাটার্জি অত্যন্ত খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে ভারতবর্ষ থেকে বহুদুরে গিয়েও অতীত দিনের ভারতীয় সংস্কৃতির স্পর্শ অনুভব করবে প্রতি পদক্ষেপে। প্রায় দুহাজার বছর আগে ভারতীয় সওদাগরের দল হিন্দু সভ্যতা-সংস্কৃতি এনেছিলেন এই দেশে, তার চিহ্ন আজও সযত্নে সসম্মানে দেখতে পাওয়া যাবে। কীর্তন ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড আর বান্ডিল ধূপকাঠি নিয়ে যে সন্তোষ চ্যাটার্জি একদিন ভোরবেলায় বোম্বে থেকে পি-অ্যাভ-ও কোম্পানির জাহাজে চড়ে ইন্দোনেশিয়া রওনা হয়েছিল, সে সন্তোষ আর ফিরে আসেনি। হোটেল ইন্দোনেশিয়ার জাভা রুমে আর কেবাজোরান মডেল টাউনের ওই ছোট্ট কটেজের বেডরুমে অসংখ্য ক্ষণিক বান্ধবীদের উষ্ণ সান্নিধ্যে সে চ্যাটার্জির মৃত্যু হয়েছে।
রাইন নদীর শোভা না দেখে রোমান্টিকাতে বসে বসে সেই সর্বনাশা নোংরা কাহিনি শুনতে শুনতে বিরক্তবোধ করে তরুণ। হাতে দিন তিনেক মাত্র সময় ছিল, কিন্তু তবুও সেকেন্ড সেক্রেটারি হাবিবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ব্ল্যাক ফরেস্টের দিকে।
নির্বাচনের পরিশ্রম আর চ্যাটার্জির সান্নিধ্যে বড় ক্লান্তবোধ করছিল তরুণ। ব্ল্যাক ফরেস্টের নির্জন কটেজে বেশ লাগল দুটি দিন। তাছাড়া অনেক দিন পর হাবিবের গান শুনতে আরো ভালো লাগল। নিজে গান শেখেনি, তবে বাড়িতে গানের চর্চা ছিল। হাজার হোক রামপুরের খানদানি বংশের ছেলে তো! হাবিদের দরবারী কানাড়া শুনতে রাত জাগতে হতো না। সন্ধ্যার পর সাপার শেষ করে কটেজের বারান্দায় বসেই শোনা যেত। ঘড়ির কাটায় মাত্র আটটা বাজলেও মধ্যরাত্রির গাম্ভীর্যভরা ব্ল্যাক ফরেস্টের মধ্যে তরুণ যেন ফেলে আসা বাংলাদেশের স্মৃতি খুঁজে পেতো।
সঙ্গে সঙ্গে মনটা ভয়ানক ভাবে হাহাকার করে উঠত। দরবারী কানাড়ার মিষ্টি সুর কানে ভেসে এলেও বুকটা বড় বেশি জ্বালা করত।
হাবিবের গান থামত কিন্তু তরুণ যেন তখনও বিভোর হয়ে থাকত। আত্মমগ্ন থাকত।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর হাবিব একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করত, কিয়া দাদা, কোনো কষ্ট হচ্ছে?
একটা চাপা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়েই আসত। মুখে বলত, না না, কষ্ট হবে কেন?
ব্ল্যাক ফরেস্টের নির্জনতা আবার দুজনকে ঘিরে ধরে। বেশ কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলে না।
হাবিব পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে এগিয়ে দেয়, দাদা, হ্যাভ এ সিগারেট।
সিগারেট?
নিজেই যেন নিজেকে প্রশ্ন করে। মাথাটা হেঁট করে একবার নিজেকেই নিজে দেখে নেয়। আবার একটা চোরা দীর্ঘনিশ্বাস! হাবিব! বেটার গিভ মি সাম ড্রিংক!
তরুণ সেনগুপ্ত ড্রিংকস চাইছে? হাবিব স্তম্ভিত হয়ে যায়। পার্টিতে, রিসেপশনে বা ককটেলে দু এক পেগ খেলেও ড্রিংকের প্রতি কোনো আগ্রহ বা দুর্বলতা নেই ওর। একথা ফরেন সার্ভিসের সবাই জানেন। হাবিবও জানে।
ইউ ওয়ান্ট ড্রিংক?
কেন, ফুরিয়ে গেছে নাকি?
না না, ফুরোবে কেন, বাট…।
তবে আবার দ্বিধা করছ কেন?
হাবিব একটু হাসতে হাসতেই বলে, আপনাকে তো কোনোদিন ড্রিংক চাইতে দেখিনি, তাই…।
ওই আবছা অন্ধকারের মধ্যেই তরুণ একবার হাসে। আগে কোনোদিন যা করিনি, ভবিষ্যতে কি তা করা যায় না?
ইন্দ্রাণী সম্পর্কে অ্যাম্বাসেডর যে মেসেজটা দিল্লিতে পাঠিয়েছিলেন তা হাবিবের হাত দিয়েই গিয়েছিল। তাছাড়া কপাল জেনারেল বন-এ এলেও সব শুনেছিল। তাই তো অযথা তর্ক করতে চায় না সে।
ঘর থেকে ওয়াইনের বোতলটা এনে দুটো গেলাসে ঢালে।
চিয়ার্স।
চিয়ার্স।
আবার কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থাকার পর তরুণ জানতে চায়, আচ্ছা হাবিব, তোমার বাড়িতে সবাই আছেন তাই না।
হ্যাঁ, বাবা-মা ভাই-বোন…!
তুমি বিয়ে করবে না?
হ্যাঁ, করাচি যাবার আগেই বিয়ে করে যাব। অনায়াসে জবাব দেয় হাবিব।
পাকিস্তানের নাম শুনেই তরুণ চঞ্চল হয়ে ওঠে। তুমি করাচি যাচ্ছ?
