মন্ত্রমুগ্ধের মতো তরুণ কোনো কথা বলতে পারে না। কৃষ্ণপক্ষের দীর্ঘ অমাবস্যার পর এক টুকরো চাঁদের আলোয় ঝলসে ওঠে মনপ্রাণ।
আবার একটা দমকা হাওয়া কোথা থেকে উড়ে আসে। ইন্দ্রাণী লুকিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নিয়ে খেলা করার সুযোগও শেষ হয় ডিপ্লোম্যাট তরুণ সেনগুপ্তের।
কতক্ষণ ধরে টেলিফোনটা বাজছিল তা সে জানে না! খেয়াল হতেই উঠে গেল।…ইয়েস সেনগুপ্টা স্পীকিং।
অ্যাম্বাসেডর! বন থেকে? তবে কি ইন্দ্রাণীর কোনো হদিশ পাওয়া গেল? না। মাস তিনেকের জন্য বন-এ থাকতে হবে জার্মান ইলেকশন আসছে বলে। চ্যান্সেলার কোনার্দ আদ্যেনুরের জয়লাভ হবে কি? নাকি…। ইলেকশন সম্পর্কে স্পেশ্যাল পলিটিক্যাল রিপোর্ট পাঠাতে হবে। দিল্লিতে!
না বলবার কোনো অবকাশ নেই। অ্যাম্বাসেডর নিজে টেলিফোন করেছেন। সি-জিও তো রাজি। সুতরাং শুধু জানতে চাইল, হোয়েন সুড আই রিপোর্ট স্যার?
কাম বাই নেক্সট উইক-এন্ড।
ধন্যবাদ জানিয়ে তরুণ টেলিফোন নামিয়ে রাখল। কৌচে না বসে ঘরের মধ্যে ধীরে ধীরে পায়চারি করতে করতে ভাবল, ইন্দ্রাণীকে নির্বাসনে পাঠাতে হবে। চিন্তায় ভাবনায় ভাবতে হবে ওই বৃদ্ধ আদ্যেনুরের কথা। বাহাত্তর বছর বয়সে যাঁর জীবন-সূর্য পৃথিবীর মহাকাশে উঁকি দিয়েছে, যিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে ঠাণ্ডা জলে পা দুটো ডুবিয়ে রেখে মাথায় তাজা রক্ত পাঠান আর ক্যাবিনেট মিটিং-এ সভাপতিত্ব করার সময় ঘন-ঘন চকোলেট খান, দিবারাত্রি ভাবতে হবে তার কথা!
অতি দুঃখের মধ্যেও তরুণের হাসি পায় আদ্যেনুরের কথা ভেবে। ঘুরতে হবে ওই বিচিত্র বৃদ্ধের সভায় সভায়, যিনি তাঁর রোয়েনডুর্যের বাড়িতে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে ক্লান্ত হলে এক বোতল রাইন ওয়াইন খেয়ে নিজেকে তাজা করে নেন!
১৫. মাইনে ও পদমর্যাদা দিয়ে গুরুত্ব বিচার করা
মাইনে ও পদমর্যাদা দিয়ে গুরুত্ব বিচার করা যায় কল-কারখানায়, সওদাগরী অফিসে ও সাধারণ সরকারি দপ্তরে। হয়তো আরো কিছু কিছু জায়গায়। সর্বত্র নিশ্চয়ই নয়। বিশেষ করে গোয়েন্দা বিভাগ ও কূটনৈতিক দুনিয়ায় তো নয়ই। একবার পরীক্ষায় পাস করে দু-চারটে প্রমোশন পেয়ে কিছুটা উপরে উঠলেই এই দুটি দপ্তরে গুরুত্ব বাড়ে না। পুলিশের এসপি বা ডি-এস-পি-র চাইতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা বিভাগের সাব-ইনস্পেক্টর ও ইস্পেক্টরদের গুরুত্ব ও প্রাধান্য বেশি। ডিপ্লোম্যাটিক মিশনগুলিতেও ঠিক এমনি হয়।
বিগ পাওয়ারদের কথাই আলাদা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যাম্বাসেডরের চাইতে প্রায় অজ্ঞাত এক থার্ড সেক্রেটারির গুরুত্ব অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এই থার্ড সেক্রেটারির গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতেই অ্যাম্বাসেডরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। ভারতবর্ষ বিগ পাওয়ার হয়নি বলেই হয়তো এখনও কনফিডেনশিয়্যাল রিপোর্টে অ্যাম্বাসেডরের দস্তখত প্রয়োজন হয়। তবে ভারতীয় মিশনগুলিতেও শুধু মাইনে ও পদমর্যাদা দিয়েই ডিপ্লোম্যাটদের গুরুত্ব বিচার করতে গেলে অন্যায় ও ভুল হবে।
বন-এ ইন্ডিয়ান এম্বাসীর পলিটিক্যাল কাউন্সিলার হয়েও রাজনৈতিক ব্যাপারে মিঃ আহুজার বিশেষ কোনো গুরুত্ব বা প্রাধান্য নেই। যখন প্রায় রাতারাতি ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের জন্ম হয়, তখন মিঃ আহুজা ডি-এ-ভি কলেজের দর্শনশাস্ত্র অধ্যাপনার কাজে হঠাৎ ইতি দিয়ে ডিপ্লোম্যাট হন! প্লটো, সক্রেটিস বা ভগবান বুদ্ধের সংস্পর্শ ত্যাগ করেও আহুজা সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েনি। বরং বছর বছর মাইনে বেড়েছে ও কয়েক বছর পর নিয়মিত প্রমোশনও পেয়েছেন। তবুও ওঁর ওপর ঠিক নির্ভর করা যায় না এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্ভর করাও হয় না।
প্রত্যেক শুক্রবার আহুজা সাহেব তার পলিটিক্যাল রিপোর্ট অ্যাম্বাসেডরকে দেন এবং অ্যাম্বাসেডর একটু চোখ বুলিয়েই তা বন্দী করে রাখেন নিজের ড্রয়ারে। সেকেন্ড সেক্রেটারির রিপোর্টটাই কেটেকুটে পাঠিয়ে দেন দিল্লি।
এবার পশ্চিম জার্মানীর নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। উনপঞ্চাশ থেকে প্রতি নির্বাচনে যা হয়েছে এবার ঠিক তা হবে কিনা কেউ জানে না! অনেকের মনেই অনেক রকম সন্দেহ। বার্লিন নিয়ে দুটি সুপার-পাওয়ারের ঠান্ডা লড়াই নেহাত হঠাৎই জমে উঠেছে বলে এই নির্বাচন আরো বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাই তো অ্যাম্বাসেডর তলব করেছেন তরুণকে।
তরুণকে টেলিফোন করার পরদিন সেকালের কনফারেন্সে অ্যাম্বাসেডর নিজেই বললেন, আওয়ার ওয়েস্ট ইউরোপীয়ান ডেস্ক ওয়ান্ট ডিফারেন্ট স্টাডিজ অ্যাবাউট ইলেকশন এবং সেইজন্যই আমি বার্লিন থেকে তরুণকেও আসতে বলেছি।
এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু কোনার্দ আদ্যেনুর। ডিপ্লোম্যাট তরুণ সেনগুপ্তের কাছে আদ্যেনুর অপরিচিত নাম হয়। বরং সে জানে রসিক কূটনীতিবিদরা আদর করে এর নাম রেখেছেন জন ফস্টার আদ্যেনুর!
অরণ্যেও দিন-রাত্রি হয় কিন্তু আদ্যেনুরের কাছে নয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা হবার পরও এই মহাপুরুষ রাশিয়াকেও ঠিক স্বীকৃতি দিতে রাজি নন! ইন্দ্রাণীর সব স্মৃতি, সব কথা দূরে সরিয়ে রেখে তরুণ আদ্যেনুরের চিন্তায় ডুবে গেল।
উনিশশো চোদ্দয় যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন আদ্যেনুরের বয়স একত্রিশ। কোলোনের লর্ড মেয়র হন আরো দশ বছর পর। নাজীদের সময় এঁকে বনবাসে যেতে হয়। যুদ্ধের পর আমেরিকানরা আবার একে মেয়র করলেও ইংরেজ সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান, অকর্মণ্যতার জন্য একে পদচ্যুত করেন। চাকা ঘুরে গেল। তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ হলেন পশ্চিম জার্মানির সর্বেসর্বা-চ্যান্সেলার! তারপর এক যুগ ধরে চলেছে দাদুর রাজত্ব। একচ্ছত্র আধিপত্য! এবারও কি তার পুনরাবৃত্তি হবে?
