এবার ইন্দ্রাণীও হাসে। তুমি কি মনে কর আজও তোমাকে আমি বুঝতে পারলাম না?
কথায় কথায় কত কথা হয়।
আচ্ছা, আমার যদি ভীষণ অসুখ করে? ইন্দ্রাণী মজা করেই প্রশ্ন করে।
ভালো ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা হবে।
কিন্তু তুমি কি কিছু করবে? নাকি এমনি করে বসে বসে ভাববে?
কয়েকদিনের মধ্যেই মা ভালো হলেন। বাবাও কলকাতা থেকে ফিরে এলেন। মাঝখান থেকে তরুণের একটা নতুন উপলব্ধি হলো।
সেটা হলো ইন্দ্রাণীর ভালোবাসা। দুঃখের দিনে, বিষাদের দিনে একটা নিশ্চিত নির্ভয় আশ্রয়ের স্থির ইঙ্গিত।
অনেক দিন বাদে তরুণের মনে পড়েছিল সেদিনের স্মৃতি। ঘরবাড়ি থেকে অনেক দূরে মার মৃত্যু হলে তরুণ ইন্দ্রাণীর অনুপস্থিতি নিদারুণভাবে অনুভব করেছিল। বহুদিন পরে সেদিন। হালা কোয়ার্টারে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে একলা বসে থাকতে থাকতে ইন্দ্রাণীর অভাব নতুন করে বড় বেশি মনে পড়ল।
ডিপ্লোম্যাটের নিজের জীবনের কথা ভাবার অবকাশ বড় কম। ডিপ্লোম্যাট অনেক কিছু পায়, পায় না শুধু নিজের কাছে নিজেকে পাবার সুযোগ। কখনও কখনও প্রকাশ্যে, নিভৃতে, তাকে। নিরন্তর রাজনৈতিক সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হয়। দিন অফিস, রাতে পার্টি। সেখানেও ছুটি নেই। মদ খেতে হয় গেলাস গেলাস। কখনও নিজের ইচ্ছায়, কখনও অন্যের আগ্রহে। তবুও মাতাল হতে পারে না ওরা। ভুলতে পারে না নিজের দেশের স্বার্থ।
তাই তো মুহূর্তের জন্যও মুক্তি নেই। কিন্তু যদি কদাচিৎ কখনও কর্তব্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পায় ডিপ্লোম্যাট, তখন তার বড় বেশি মনে পড়ে নিজের কথা। অধুনা বিশ্ব রাজনীতির প্রতিটি পাতায় বার্লিনের উল্লেখ হলেও লন্ডন-নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটন-মস্কোর মতো কূটনৈতিক চাঞ্চল্য নেই এখানে। মাঝে মাঝে একটা দমকা হাওয়া আসে অবশ্য, তবে সে মাঝে মাঝেই। তাই তো বার্লিনে এসে তরুণ একটু বেশি যেন নিজেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের বেদনা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার এমন কোরাস শোনার অবকাশ যেন এই প্রথম এল তার জীবনে।
ঘরের চারপাশে দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিতেই রাইটিং ডেস্কের পাশে মিঃ মিশ্রের একটা ছবি নজরে পড়ল। তরুণ বড় ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে এই মাতাল লোকটিকে। দেশে দেশে কত মানুষ দেখেছে তরুণ, কিন্তু গ্লানিহীন, কালিমামুক্ত এমন স্বচ্ছ অন্তঃকরণ আর কারুর দেখেনি। ওই একই ডেস্কের আরেক পাশে ছিল ইন্দ্রাণীর একটি ছবি। ছবি দুটো অমন করে পাশাপাশি রাখার একটা কাহিনি ছিল।
ইউনাইটেড নেশনস-এ থাকার সময় তরুণের ফ্ল্যাটে এসে মিশ্র যেদিন প্রথম ইন্দ্রাণীর ফটোটা দেখলেন, সেদিন উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইজ দিস দি ইনোসেন্ট গার্ল ইউ লাভ?
ও যে ইনোসেন্ট তা আপনি জানলেন কি করে?
মিশ্র সাহেবের কথা বলার ঢং-ই ছিল আলাদা।…লুক হিয়ার ইডিয়ট ইয়ংম্যান! চোখ দুটো ভালো করে দেখ!
একটু হাসতে হাসতেই তরুণ এক ঝলক দেখে নেয় ইন্দ্রাণীর চোখ দুটো। …কিন্তু কই, ইনোসেন্স তো দেখতে পাচ্ছি না।
পাবে কোথা থেকে? মনটা বোধহয় পুরোপুরি বিষাক্ত হয়ে গেছে।
তরুণ আরো কি যেন বলতে গিয়েছিল কিন্তু পারেনি। মিশ্র চিৎকার করে বলেছিলেন, আর বাজে বকালে পুরো এক বোতল স্কচ খাওয়ালেও আমাকে ঠান্ডা করতে পারবে না!
দু এক রাউন্ড ড্রিংক আর কিছু গল্প-গুজবের পর মিঃ মিশ্র বলেছিলেন, দেখ তরুণ, আই অ্যাম এ ফাদার, বাট আই হ্যাভ মাদার্স মাইন্ড। মাদার্স ফিলিংস!
ঢক করে প্রায় আধ গেলাস হুইস্কী গলায় ঢেলে দিয়ে বললেন, তাছাড়া ওই হতচ্ছাড়ি মেয়েটা লুকিয়ে পড়বার পর আমি যেন ওদের মতো মেয়েদের সব কিছু জানতে পারি, অনুভব করতে পারি। ওই হোপলেস মেয়েটা আমাকে ঠকালেও আর কোনো মেয়ে তা পারবে না।
তরুণ গেলাসটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
অনেক দিন পর আজ হান্স কোয়ার্টারের অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গ তরুণের বড় বেশি মনে পড়ছে সে রাত্রির কথা।
…চোখ দুটো দেখেই আমি বুঝতে পারছি এ মেয়ে কাউকে ফাঁকি দেবে না, দিতে পারে না। সী মাস্ট বী ওয়েটিং ফর ইউ।
নিজের একমাত্র মেয়েকে হারাবার স্মৃতিতে, ব্যথায়-বেদনায় সে রাত্রে বিভোর হয়েছিলেন মিঃ মিশ্র…আমার ওই হোপলেস মেয়েটার মতো এই দুনিয়ায় কিছু কিছু মেয়ে আছে যারা শুধু দপ করে জ্বলে উঠেই নিভে যায়। তোমার এই ইন্দ্রাণী, আমার এই ইন্দ্রাণী মা সে জাতের নয়। ও বহুদিন ধরে বহু অন্ধকার মনে আলো ছড়াবে।
রাইটিং ডেস্কের দুপাশে ওই দুটো ছবি দেখে তরুণের মনে ছোট ছোট টুকরো টুকরো স্বপ্নের মেঘ জমতে আরম্ভ করে। মেঘে মেঘে মেঘালয়ের প্রাসাদ গড়ে ওঠে মনের মধ্যে। একটা দমকা হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ে। তরুণ যেন হঠাৎ ইন্দ্রাণীকে দেখতে পায়। কটি মুহূর্তের জন্য অসহ্য নিঃসঙ্গতার যবনিকাপাত হয়।…
…কি এত ভাবছ?
চমকে ওঠে তরুণ। কে? ইন্দ্রাণী!
ইন্দ্রাণী মুখে কিছু বলে না। কোনো কালেই তো ও বেশি কথা বলে না। কৃষ্ণচূড়ার মতো মাথা উঁচু করে নিজের প্রচার সে চায় না, সূর্যমুখীর ঔদ্ধত্যও নেই তার। রজনীগন্ধার বিনম্র মাধুর্য দিয়েই তো সে তরুণকে মুগ্ধ করেছে। আজও সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আলতো করে তরুণের হাত দুটো জড়িয়ে ধরল। মুখে কোনো জবাব দিল না, তবে যে চোখ দুটো হালা কোয়ার্টার ছাড়িয়ে, রেডিও টাওয়ার পেরিয়ে ওই দূরের সীমাহীন আকাশের কোলে ঘোরাঘুরি করছিল, তাতে মিষ্টি তৃপ্তির ইঙ্গিত।
