তরুণ কোনো সান্ত্বনা জানাতে পারেনি। এত বড় কৃতিত্বের পরও কেমন যেন পরাজিত মনে হচ্ছিল নিজেকে। চৌকির উপর মাথা নিচু করে বসে চুপচাপ ভাবছিল।
হঠাৎ একটা বিরাট দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন তরুণের মা। আপন মনেই যেন বললেন, হতচ্ছাড়ি মেয়েটাও যদি কাছে থাকত।
এসব কথা, স্মৃতি, ভাবতে ভাবতে তরুণের চোখটা কেমন ঝাঁপসা হয়ে উঠেছিল সেদিন। ভুলে গিয়েছিল সে বার্লিনে বসে আছে, ভুলে গিয়েছিল অফিসের কথা।
মিঃ দিবাকর হঠাৎ ঘরে ঢুকে বললেন, স্যার! প্রায় ছটা বাজে। আমরা কি যাব?
তরুণ লজ্জিত বোধ করে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সার্টেনলি যাবেন। চলুন চলুন, আমিও যাচ্ছি।
১৪. উড়ে উড়ে ফুলে ফুলে মধু খাওয়া
উড়ে উড়ে ফুলে ফুলে মধু খাওয়াই মৌমাছির কাজ। মৌমাছির ধর্ম। শীত, বসন্ত, শরৎ, হেমন্তে কত বিচিত্র ফুলের মেলায় মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু যার মধু নেই, যার মধুর ভাণ্ডার শূন্য হয়েছে, সেখানে মৌমাছি নেই।
অনেক মানুষও উড়ে উড়ে মধু খায়। শীতের মরসুমী ফুলের মেলায় বসেও এদের নজর থাকে বসন্তের প্রতি। স্মৃতির ভাণ্ডারে এদের জমা হয় না কিছু। এদের হৃৎপিণ্ড আছে কিন্তু হৃদয় নেই, মন আছে কিন্তু অন্তর নেই।
ভালোবাসাই তো জীবনের ধর্ম। যৌবনে তার প্রথম পূর্ণ অনুভূতি। জীবন সন্ধিক্ষণের সেই অপূর্ব মুহূর্তে মানুষ ভালোবাসবেই। তাই তো যৌবনে কতজনই প্রেমে পড়ে, কিন্তু ভালোবাসা? সবাই কি ভালোবাসতে পারে? দেহ-মনের প্রতিটি গ্রন্থিতে কি সবাই অনুভব করে অব্যক্ত বেদনা?
না। তাই তো প্রেমে পড়লেই ভালোবাসা হয় না। প্রেম একটা রোগ। আসল না হলেও জল বসন্তে সবাই একবার ভুগবেই। সারা অঙ্গে কিছু ক্ষত রেখে যায়, কিন্তু তার স্থায়িত্ব নেই। একদিন মুছে যায় সে ক্ষতের চিহ্ন। আর ভালোবাসা? সে হচ্ছে অন্তরের ধর্ম, মনের বিশ্বাস। সে স্থায়ী, চিরস্থায়ী, চিরন্তন। সে অনন্ত।
দুনিয়ার মানুষ বার্লিনে এসে ভুলে যায় তার সুখ-দুঃখ ব্যথাবেদনা। গোল্ডেন সিটি বার, এল প্যানোরামা বা বলহাউস রেসিতে ক্ষণস্থায়ী বসতে অনেকে আরো কিছু ভুলে যায়। হাঙ্গা। কোয়ার্টারে থেকেও ভোলা যায় অনেক কিছু। কিন্তু তরুণ ভুলতে পারে না ইন্দ্রাণীর কথা।
অফিস থেকে ফিরে লিভিং রুমে চুপচাপ বসে বসে পরপর কতকগুলো সিগারেট খেতে খেতে তরুণ কি যেন ভাবছিল। বিভোর হয়ে ভাবছিল। অন্যদিন গাড়ি থেকে নেমেই প্রতিবেশী ডাঃ রিটারের ছোট ছেলেটিকে খোঁজে। তরুণকে দেখলে ছোট্ট রিটারও টলতে টলতে এগিয়ে আসে একটা মিল্ক চকোলেটের লোভে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পকেটে চকোলেট ছিল কিন্তু গাড়ি থেকে অন্যমনস্কভাবে সোজা চলে এসেছে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। অন্যদিনের মতো সোজা প্যানট্রিতে গিয়ে চা তৈরি করতেও যায়নি। যাবে কেন? রোজ রোজ কি ভালো লাগে? শুধু নিজের জন্য এত ঝামেলা পোহাতে কার ইচ্ছে করে?
বিভোর হয়ে তাই তো ভাবছিল, যখন সবাই ছিল; সব কিছু ছিল, তখন সে কাছে ছিল। সুখে-দুঃখে অহরহ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেবার ঠিক পুজোর আগে আগে যখন তরুণের মার ডবল নিউমোনিয়া হলো তখন তরুণের বাবা গিয়েছিলেন কলকাতা। তরুণের সে কি ভয়। হাজার হোক একমাত্র ছেলে। সংসারের ঝুট-ঝামেলা বলতে যা বোঝায়, তা কোনোদিনই সহ্য করতে হয়নি। তাইতো বাবার অনুপস্থিতিতে মার অসুখে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিল। এপাড়া ওপাড়া থেকে অনেকেই এসেছিলেন। চিকিৎসা বা সেবাযত্নের কোনো ত্রুটি হয়নি ওদের সাহায্য সহযোগিতায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডাঃ ঘোষালও বলেছিলেন, ভয় নেই। কয়েকদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবেন।
মার অসুখের জন্য প্রত্যক্ষভাবে তরুণকে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছিল না। মহুরী মদনবাবুই ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। ঔষধ-পত্র দেবার জন্য ও-বাড়ির জ্যাঠাইমা সারাদিনই থাকতেন এ-বাড়িতে। এছাড়াও ঘোষালবাড়ির পিসিমা কতবার যে আসা-যাওয়া করতেন তার ঠিক-ঠিকানা নেই।
ইন্দ্রাণী তো ছিলই। মাসিমার বিছানার একপাশে বসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত সারাদিন। সন্ধ্যার পর সংসারের কাজকর্ম সেরে ইন্দ্রাণীর মা আসতেন। রাত্রি নটা-সাড়ে নটা নাগাদ ইন্দ্রাণীর বাবাও আসতেন। তিনজনে মিলে ফিরে যেতেন সাড়ে দশটা-এগারটার পরে।
তবু তরুণ ভয় পেয়েছিল। বাবাকে টেলিগ্রাম করেছিল, কাজ হলেই তাড়াতাড়ি চলে আসবেন।
বাবার লাইব্রেরি ঘরে টেবিলের উপর মাথা রেখে তরুণ আকাশ-পাতাল ভাবছিল। হঠাৎ কে যেন এসে আস্তে মাথায় হাত দিল। অন্য সময় হলে চমকে উঠত, কিন্তু মনটা বড়ই ভারাক্রান্ত ছিল। একটুও নড়া-চড়া করল না। তবে বড় ভালো লাগল। সমস্ত অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করল
আরেকজনের সমবেদনা। অনুভব করল ভালোবাসার নির্ভরযোগ্য স্পর্শ।
কি এত ভাবছ? মৃদু গলায় ইন্দ্রাণী জানতে চাইল।
তরুণ কিছু উত্তর দিল না। আগের মতোই টেবিলের উপর মাথা রেখে ভাবছিল কত কি।
বল না কি এত ভাবছ?
না, তেমন কিছু না। এবার তরুণ ছোট্ট উত্তর দেয়।
তবে এমন করে একলা একলা বসে আছ কেন?
এমনি-
আমাকেও সত্যি কথা বলবে না?
তরুণ টেবিলের উপর থেকে মুখ তুলে একবার ইন্দ্রাণীকে দেখে। মুখে একটু হাসির রেখা ফোঁটাবার চেষ্টা করে বলে, এমনি চুপচাপ বসেছিলাম।
