হাজার হোক একমাত্র সন্তান। শাসন করার ভাষাটাও যেন স্বতন্ত্র। ওর কথা আর বলিস না মা!
একটা যেন চোরা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে তরুণের অজ্ঞাতে। ইন্দ্রাণীকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার মতো একটা মেয়ে পেতাম! তবে ও জব্দ হতো।
মুহূর্তের জন্য দুজনে দুজনকে দেখে। দুজনের চোখগুলো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ইন্দ্রাণী যেন একটু লজ্জাবোধ করে।
তরুণ একটু মোড় ঘোরাতে চেষ্টা করে। যদি পেতাম আবার কি? তোমার পাশেই তো বসে আছে।
একটু থেমে আবার বলে, আচ্ছা মা, তুমি কি মনে কর বল তো? এই রকম একটা মেয়ে আমাকে জব্দ করবে?
হঠাৎ পটলের মার গলার আওয়াজ শোনা গেল। তরুণের মা ছেলের কথার জবাব না দিয়ে হাতের সেলাই নামিয়ে রেখে সোজা রান্নাঘরে চলে গেলেন।
তরুণ উঠে দাঁড়াল। ইন্দ্রাণীকে বলল, দেখো তো, এক কাপ চা খাওয়াতে পার কিনা!
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইন্দ্রাণী বলল, মুখ ধুয়েছ?
তোমার হাতের চা খেলেই মুখ দেওয়া হয়ে যাবে।
এ আর মাসিমা পাওনি যে একমাত্র ছেলের সব আব্দার সহ্য করবেন।
তরুণ একটু মজা করার জন্য বলে, মাসিমার একমাত্র ছেলের মতো আমিও তো তোমার একমাত্র ধ্যান-ধারণা।
ঠোঁট উল্টে একটু চাপা হাসি হাসতে হাসতে ইন্দ্রাণী বলে, তা তো বটেই! যে ছেলে মুনসেফ কোর্টে ওকালতি করার স্বপ্ন দেখে, সে ছেলে আমার ধ্যান-ধারণা!
ডান হাতে বুড়ো আঙুলটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে তরুণ উত্তর দেয়, মুনসেফ কোর্টে প্র্যাকটিশ করবো আমি?
তোমার দ্বারা তার বেশি কি হবে?
হাজার হোক বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোদিনই বিশেষ চিন্তার গরজ ছিল না। ম্যাট্রিকের পর আই-এ; আই-এ-র পর বি-এ, বি-এ-র পর এম-এ।
তারপর?
তারপর দেখা যাবে। মা আছেন, বাবা আছেন। তারপর ইন্দ্রাণী আছে। অত শত চিন্তার কি আছে।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তরুণের ঔদাসীন্যই ইন্দ্রাণীর অসহ্য। কল্পনাতীত। ছেলেবেলায় যার সঙ্গে। খেলা করেছে, যৌবনে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে সে তত শুধু ওয়াড়ির মাঠে ফুটবল খেলবে না, সে তো শুধু বুড়িগঙ্গার পাড়ে আড্ডা দেবে না, চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করবে না।
তবে?
তবে আবার কি? সে বড় হবে। অনেক বড় হবে। দশজনের মধ্যে একজন হবে। সে বিনেকাকা হবে। দেশ-বিদেশে পাড়ি দেবে, ঢাকার মানুষকে চমকে দেবে।
সেই ছোট্টকালে টফি-চকোলেট খাওয়াতে খাওয়াতে বিনেকাকা হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। শিশু ইন্দ্রাণী বিস্মিতা না হয়ে পারেনি। যত বড় হয়েছে, তত বেশি মনে পড়েছে ওই বিনেকাকাকে। ঢাকার আর সবাই তো ঠিক একই রকম আছে! গঙ্গাজলি আর ইলিশ মাছ খেয়েই ওরা খুশি, সুখী। মনের মধ্যে একটা বিরাট শূন্যতা অনুভব করত। কারও কাছে প্রকাশ করত না। তরুণের কাছেও না। বড় হবার পর সেই শূন্যতা পূর্ণ করতে চেয়েছে কাছের মানুষকে দিয়ে।
তাই তো কথায় কথায় খোঁচা দিয়েছে তরুণকে।
ইন্দ্রাণী চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।
তরুণ হাত-মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে ঢোকার পরই চা নিয়ে ইন্দ্রাণী এলো। চায়ের কাপটা ওর হাতে তুলে দিতে দিতে ইন্দ্রাণী বেশ একটা মিষ্টি হাসি কিছুটা চেপে রেখে বলল, জানো, এই সাতসকালে মাসিমা কেন ডেকেছিলেন?
চেয়ারের উপর পা দুটো তুলে বসতে বসতে তরুণ বলল, কেন?
মা বুঝি মাসিমাকে বলেছেন যে, ময়মনসিংহের কোনো এক ডাক্তারের ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে…।
ভ্রূ দুটো কুঁচকে তরুণ বলে, কই, সে কথা তো আমাকে বলোনি।
আমিও ঠিক জানতাম না। মাসিমার কাছেই শুনলাম।
মা কি বললেন?
জানো, আমার বিয়ের সম্বন্ধের কথা শুনে মাসিমার ভীষণ রাগ।
কেন?
তা জানি না। তবে বেশ বুঝলাম যে আমি অন্য কোথাও চলে যাই, তা উনি চান না।
এবার পরম পরিতৃপ্তিতে চায়ের কাপে চুমুক দেয় তরুণ, আঃ! ফার্স্ট ক্লাস!
প্রায় মুখোমুখি টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ইন্দ্রাণী জানতে চায়, কি ফার্স্ট ক্লাস?
মুখ না তুলেই জবাব দেয়, তুমি, মা, চা-সবাই ফার্স্ট ক্লাস!
বন্দনাকে চিঠি লেখার পর আপন মনে বসে থাকতে থাকতে এসব মনে পড়ছিল তরুণের। মনে পড়ছিল মার কথা। বড় ভালোবাসতেন ইন্দ্রাণীকে। নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। বড় ইচ্ছা ছিল মেয়েটাকে কাছে রাখার।
দু চারটে আজেবাজে বিয়ের সম্বন্ধ আসার পর আর থাকতে না পেরে শেষে ইন্দ্রাণীর বাবাকেই বলেছিলেন, দেখুন ঠাকুরপো, আমাকে না জানিয়ে মেয়েটাকে যেখানে সেখানে পার করবেন না!
আপনাকে না জানিয়ে কোথায় মেয়ের বিয়ে দেব।
তা জানি না। তবে ওইসব আজেবাজে ছেলের খবর পেয়েই আপনারা যা মাতামাতি করছেন!
তা আপনার ছেলের মতো ছেলে পাব কোথায়?
সে পরে দেখা যাবে। মোট কথা আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ কোথাও!
সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দুনিয়াটা ওলট-পালট হয়ে গেল। শাঁখা-সিঁদুর, মুখের হাসি, চোখের স্বপ্ন-সব কিছু একসঙ্গে হারিয়ে গেল।
তারপর কত কি হলো! ভেড়ার পালের মতো সর্বহারাদের সঙ্গে এলেন এপারে।
রানাঘাট, শেয়ালদা, পটলডাঙা। পিসতুতো ননদের বাড়ি, মামাতো দেওরের বাড়ি। আরো কত কি!
সুদীর্ঘ অন্ধকার রাত্রি! নবীন কুণ্ডু লেনের ওই অন্ধকার ঘর একদিন হঠাৎ সূর্যের আলোয় ভরে গেল! তরুণ আই-এফ-এস হলো।
যে সূর্য প্রায় দুপুরবেলাতেই অস্ত গিয়েছিল, সেই তার জন্য মা খুব খানিকটা কেঁদেছিলেন সেদিন। খোকার এই কৃতিত্বে সবচাইতে উনিই তো খুশি হতেন!
