চিঠির শেষে তরুণ একথাও লিখল, জানি না ইন্দ্রাণীকে পাওয়া যাবে কিনা; জানি না তাকে আর কোনোদিন দেখতে পাব কিনা তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু মনে হয় তার সঠিক খবর হয়ত এবার পাওয়া যাবে।…
এই পৃথিবীটা মহাশূন্যের মাঝে থেকেও ঠিক নিয়মমাফিক নিত্য চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরপাক খাচ্ছে। নিয়ম মত চন্দ্র-সূর্য উঠছে, অস্ত যাচ্ছে। গঙ্গায় জোয়ার-ভাটা খেলছে, অমাবস্যা-পূর্ণিমা হচ্ছে। দুনিয়াটা এমনি করেই চলছে। এই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো মানুষ ও প্রকৃতিরও একটা অদৃশ্য শক্তি আছে। পাহাড়ের কোলে জন্ম নেয় যে নদী, সে ছুটে যায় সমুদ্রের কোলে। মহাসমুদ্রের অনন্ত জলরাশির মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়াই তার সাধনা, তার ধর্ম। সমুদ্রের আকর্ষণেই নদী ছুটে আসে, ছেড়ে আসে তার শ্বেতশুভ্রূ পবিত্র হিমালয়-শৃঙ্গের আসন। যে। হিমালয় সবাইকে হাতছানি দেয়, সেই পর্বতরাজকে ত্যাগ করতে নদীর দ্বিধা নেই, কুণ্ঠা নেই। বরং আনন্দ আছে, আছে পরিতৃপ্তি। তাই তো সে ক্ষীণধারা নাচতে নাচতে নেমে আসে, হাসতে হাসতে সমতলভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়। সে ক্ষীণধারা হিমালয়তুঙ্গে বা তরাই-এর জঙ্গলে প্রায় পরিচয়হীন থাকে, সমতলভূমিতে অসংখ্য মানুষের স্পর্শে সে অনন্য হয়, সে বিরাট বিশাল হয়। সমুদ্রের মুখোমুখি সে দিগন্তবিস্তৃত হয়।
তরুণও ছুটে চলেছে সেই অনন্তবিস্তৃত অজ্ঞান ভবিষ্যতের দিকে। ইন্দ্রাণীর আকর্ষণে। হয়তো বা মিথ্যা প্রত্যাশা, মরীচিকা। জানে না। অন্ধকার ভবিষ্যৎ তার জানা নাই। তবুও এই একটু ক্ষীণ আলোয় সে যেন বিভোর হয়ে গেছে। তাই তো বন্দনাকে চিঠি লিখতে বসে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
…বন্দনা, তোমার বয়স হয়েছে, বুদ্ধি হয়েছে। তার চাইতেও বড় কথা তুমি আমাকে ভালোবাস, আমার মঙ্গল কামনা কর, আমাকে দাদা বলে প্রণাম কর। তোমাকে না বলার কিছু নেই। আর পাঁচজন মেয়ের মতো ইন্দ্রাণী ঠিক সাধারণ মেয়ে ছিল না। সে বড় বেশি স্বপ্ন দেখত। বড় বেশি প্রত্যাশা করত আমার কাছ থেকে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে বাস করে আমি ঠিক অত স্বপ্ন দেখতে পারতাম না, সাহস করতাম না, বাবা কোর্টে গেলে, মা বুড়ো শিববাড়িতে পূজা দিতে গেলে ও আসত আমার কাছে। বার বার করে বলত, বিনেকাকার মতো তুমি চমকে দিতে পারে না সবাইকে?
সেদিন কল্পনা করতে পারিনি ঢাকা বা কলকাতার বাইরে পা দেব, ভাবতে পারিনি কর্মজীবনের তাগিদে সাত-সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেব বার বার। ভাবতে পারিনি আরো অনেক কিছু। তাই তো আমি বলতাম, ভবিষ্যৎ কি আমার হাতে ইন্দ্রাণী?
ও প্রতিবাদ করত, পুরুষমানুষ হয়ে এমন কথা বলতে তোমার লজ্জা করে না?
ওই কটা কথা বলতেই বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ত। এলো করে বাঁধা খোঁপাটা আরো ঢিলে হয়ে যেত।
খোঁপার কাঁটাগুলি ঠিক করতে করতে বলত, তুমি এবার বি-এ পরীক্ষা দেবে, আমিও কলেজে ভর্তি হলাম। এখনও কি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটু সচেতন হবার সময় আসেনি?
কত কথা আর লিখব? আমাকে নিয়ে যার বুকভরা আশা ছিল সে যদি বেঁচে থাকে তবে কিভাবে যে দিন কাটাচ্ছে, তা চিন্তা করতেও কষ্ট লাগে।
বন্দনাকে আর কিছু লিখল না। লিখতে পারল না। লেখা সম্ভবও নয়। সব মেয়েই স্বপ্ন দেখে। কেউ বেশি, কেউ কম। কিন্তু ইন্দ্রাণী যেন অসম্ভবকে প্রত্যাশা করত।
ঢাকা থেকে অনেক দূরে বার্লিনের ইন্ডিয়ান কনসুলেটে বসেও তরুণের মন উড়ে যায় সেই সোনালি দিনগুলিতে।…
বেশ বেলা হয়েছিল। তরুণ তবুও শুয়েছিল। টেস্ট পরীক্ষা যখন শেষ হয়েছে, তখন একটু বেলা করে উঠলেই বা কি? ওপাশের বড় জানলা দিয়ে রোদ্দুর আসছিল বলে পাশ ফিরে শুয়ে আর একবার চাঁদর মুড়ি দিল। তাছাড়া বাবা যখন ঢাকায় নেই, তখন চিন্তার কি?
কে যেন দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল? এক গোছা কাঁচের চুড়ির আওয়াজ হলো না? শুয়ে শুয়েই মুচকি হাসে তরুণ। এসেছে তাহলে ডাকাত মেয়েটা!
মুহূর্তের মধ্যেই কানে ভেসে এলো, মাসিমা।
কোণার ঘর থেকে তরুণের মা জবাব দিলেন, আমি এই কোণার ঘরে।
পরের কয়েক মিনিট আর কিছু শোনা গেল না ওদের কথাবার্তা। একবার পাশ ফিরে বারান্দার দিকে তাকাল। নাঃ, এখনও এদিকে আসার সময় হয়নি।
আরো কিছুক্ষণ কেটে গেল। তবুও ইন্দ্রাণীর কথা শুনতে পায় না। তবে কি চলে গেল?, তা কেমন করে হয়! একবার দেখা না করে কি যেতে পারে?
এতক্ষণ পর তরুণের হুশ হলো, বেশ রোদ্দুর উঠেছে। চাঁদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে বিশ্রী লাগল।
দুচার মিনিট আরো কেটে গেল। না, আর দেরি করে না। উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। গায়ে চাঁদরটা জড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে একবার এপাশ-ওপাশ দেখল। পটলের মাকে না দেখে বুঝল সে রান্নাঘরে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল কোণার ঘরের দোরগোড়ায়। তরুণ বেশ বুঝল, হঠাৎ দুজনের কথাবার্তা থেমে গেল।
কি ব্যাপার? সকালবেলাতেই তোমরা ফিসফিস করছ? চোখ রগড়াতে রগড়াতে তরুণ জানতে চায়।
মাথাটা দুলিয়ে বিনুনীটা ঘুরিয়ে ইন্দ্রাণী ঘাড় বেঁকিয়ে তরুণকে দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, একি মাসিমা খোকনদা এখন উঠল?
ইন্দ্রাণীর কথা শেষ হতে না হতেই তরুণ ভিতরে ঢুকে চেয়ারটা টেনে নেয়। ভাগ্যবান মাত্রেই বেলা করে ওঠে; তাতে এত অবাক হবার কি আছে? নির্বিকারভাবে উত্তর দেয় তরুণ।
