মিঃ ট্যান্ডন অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বললেন, সার্টেনলি।
একটু থেমে আবার বললেন, বেটার ডু ওয়ান থিং। তুমি আজ রাত্রে আমার ওখানে চলে এসো। ডিনারের পর দুজনে বসে ফাইনাল করে ফেলব।
তরুণ হাসতে হাসতে বলল, আপনি জানেন না আমি আজ রাত্রিরে আসছি?
তার মানে?
তার মানে আজ ভাবীজি আমার জন্য কিছু স্পেশ্যাল ডিস…।
মিঃ ট্যান্ডন হাসতে হাসতে বলেন, ডিপ্লোম্যাট হয়ে রিটায়ার করার সময়ও ডিপ্লোম্যাসিতে তোমাদের কাছে হেরে যাচ্ছি!
১৩. শুক্রবার অফিসে গিয়েই
শুক্রবার অফিসে গিয়েই তরুণ খবর পেল, ইন্দ্রাণীকে খুঁজে বার করবার জন্য ফরেন মিনিস্ট্রি যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।
খবর পাঠিয়েছেন বন এম্বাসী থেকে ফার্স্ট সেক্রেটারি মিঃ কাপুর।
মেসেজটা পেয়ে খুশিতে ভরে গেল সারা মন। বার বার পড়ল কেবগ্রামটা। ফরেন অ্যাসিওরড এভরি পসিবল অ্যাকশান, ট্রেস ইন্দ্রাণী।
বুঝতে অসুবিধা হলো না, মিঃ ট্যাভনের জন্যই এত চটপট বন থেকে আর্জেন্ট মেসেজ গেছে দিল্লিতে। অ্যাম্বাসেডরও নিশ্চয়ই বেশ ভালো করে লিখেছিলেন। তা নয়তো এত চটপট উত্তর?
ফরেন মিনিস্ট্রির অনেক অসুবিধে। সারা দুনিয়ায় পঞ্চশীল প্রচার করতে অনেকের দ্বিধা থাকলেও সহকর্মীদের এসব সাহায্য সহযোগিতা করতে কারুর দ্বিধা নেই। বরং আগ্রহই বেশি।
পাকিস্তান এক বিচিত্র দেশ। রাজনৈতিক ব্যাপারে পাকিস্তানের মতিগতি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কিন্তু অরাজনৈতিক ব্যাপারে সাধারণত সাহায্য করার চেষ্টা করে। তার অবশ্য কারণ আছে। যে কোনো পাকিস্তানীর বিপদ-আপদে ভারত সরকার সাহায্য করতে শুধু আগ্রহী নয়, উন্মুখ। দিল্পির পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে হরদম এই ধরনের অনুরোধ আসছে এবং সর্বশক্তি দিয়ে ভারত সরকার সে সব অনুরোধের মর্যাদা রাখতে চেষ্টা করে।
দেশটা দুটুকরো হলেও আত্মীয়স্বজন ছড়িয়ে রয়েছে দুদেশেই। বিয়েসাদীতে যাতায়াত করতেই হয় ওদের। লক্ষ্ণৌতে শ্বশুরের মৃত্যু হলে লাহোর থেকে ছুটে আসতে হয় মেয়ে-জামাইকে।
আরো কত কি হয়। এইতো সেবার পাকিস্তান হাইকমিশনের এক থার্ড সেক্রেটারির স্ত্রী সন্তান প্রসবের পরই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ভদ্রমহিলা তার মাকে কাছে পাবার জন্য। বড় ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। ভারত সরকারের সাহায্যে একদিনের মধ্যে তাকে আনা হয় পেশোয়ার থেকে দিল্লি। ভারত সরকারের ঔদার্যে ও তৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে কয়েকদিন পর পাকিস্তানের ফরেন সেক্রেটারি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের বহু বড় বড় অফিসারের অসংখ্য আত্মীয়স্বজন উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ছড়িয়ে আছেন। ভারত সরকারের ঔদার্যে ও সহযোগিতায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ পাকিস্তানীরাই বেশি উপকৃত হন। সেজন্য ভারত সরকার থেকে সাধারণ কোনো অনুরোধ গেলে এরাও যথাসাধ্য সাহায্য করতে চেষ্টা করেন।
তরুণ এসব জানে। দিল্লিতে থাকতে ওর কাছেই কত অনুরোধ এসেছে। তাই তো বন থেকে মেসেজটা পেয়ে মনে হলো, বোধহয় অন্ধকার রাত্রির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে, নতুন দিনের আলো আত্মপ্রকাশ করার সময় সমাগত।
মিঃ দিবাকর কতকগুলো ফাইল নিয়ে এলেন কিন্তু তরুণের ইচ্ছা করল না ওগুলোয় হাত দিতে।
এক্সকিউজ মি মিঃ দিবাকর, আজ এগুলো রেখে দিন। সোমবার দেখব। আজ আমি উইকলি রিপোর্টটা রেডি করে দিচ্ছি। আপনি ওটা আজই পাঠিয়ে দিন।
সব দেশের সব ডিপ্লোম্যাটিক মিশনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে উইকলি পলিটিক্যাল ডেসপ্যাঁচ পাঠানো। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, ডিপ্লোম্যাট মরুক বাঁচুক, উইকলি রিপোর্ট ঠিক সময়ে যাবেই। তাছাড়া বার্লিনের গুরুত্বই আলাদা। বন-এ এম্বাসী এই রিপোর্টের ভিত্তিতে দিল্লিতে রিপোর্ট পাঠাবে এবং তার ভিত্তিতেই দিল্লি তার নীতি ও কার্যধারা ঠিক করবে। সুতরাং ইন্দ্রাণীর স্বপ্নে মশগুল হয়েও তরুণ পলিটিক্যাল রিপোর্ট পাঠাতে দেরি করল না।
রিপোর্টটা ফাইনাল চেক আপ করে নিজে হাতে সিল করে তরুণ তুলে দিল মিঃ দিবাকরের হাতে। হাসতে হাসতে বলল, এই নিন। আই হোপ আই উইল নট সী ইউ বিফোর মনডে!
দিবাকর বিদায় নেবার পর তরুণ আবার কেবগ্রামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ কি মনে হলো। চিঠি লিখতে বসল বন্দনাকে।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তোমার চিঠি পেয়েও জবাব দিতে পারিনি। প্রিয়জনের চিঠির উত্তর আমি চটপট দিই না, তা তুমি জান। যাদের ভালোবাসি অথচ কাছে পাই না, তাদের চিঠি পেলে বড় ভালো লাগে। বার বার পড়ি সে সব চিঠি। একদিন নয়, পর পর কয়েকদিন ধরে। পড়ি। তোমার চিঠিটাও পড়েছি বেশ কয়েকদিন ধরে। উত্তর দিলেই তো সব শেষ! যতক্ষণ উত্তর না দিই ততক্ষণে মনে হয় চিঠির মধ্য দিয়ে তোমাদের দেখতে পাচ্ছি, কথা শুনতে পাচ্ছি। আমি উত্তর দিলেই তো তোমাদের আর দেখতে পাব না, কথা শুনতে পাব না! তাই, সেই ভয়ে উত্তর দিতে দেরি করি।
তবুও এত দেরি হওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু এমন কতকগুলো আজেবাজে লোকের উৎপাতে বিব্রত ছিলাম যে অফিসের কাজকর্মও ঠিক করতে পারিনি। তবে আজ আর চিঠি না লিখে পারলাম না। আজই এম্বাসি থেকে খবর পেলাম ফরেন মিনিস্ট্রি ইন্দ্রাণীর খোঁজ নেবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে রাজি হয়েছে। খবরটা পেলে তুমি অনেকটা আশ্বস্ত হবে, খুশি হবে, তাই আর দেরি করলাম না।
