একটু থেমে ট্যান্ডন সাহেব আবার বললেন, সারা জীবন কোনো না কোনো অফিসার বা অ্যাম্বাসেডরের আন্ডারে কাজ করেছি। তাদের খেয়াল-খুশি চরিতার্থ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। তাই তো বার্লিনে ইন্ডিপেনডেন্ট চার্জ নিলাম, কিন্তু এখন দেখছি আগেই ভালো ছিলাম।
কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন বার্লিনের ইন্ডিয়ান কন্সাল জেনারেল মিঃ ট্যান্ডন।
এবার তরুণ বলে, আপনি তো সামনের সপ্তাহে কনসালটেশনের জন্য বন যাচ্ছেন, তখন আমার কি দুর্গতি হবে বলুন তো?
মিঃ ট্যান্ডন হাসতে হাসতে বললেন, নার্ভাস হবার তো কিছু নেই! নেক্সট উইকে তো ডান্সার প্রীতিকুমারী ছাড়া কোনো পলিটিশিয়ান আসছেন বলে শুনিনি। সো ইউ উইল হ্যাভ এ প্লেজান্ট টাইম, আই হোপ।
হোপ তো অনেকেই অনেক কিছু করেন কিন্তু বাস্তব যে সম্পূর্ণ আলাদা।
আমাদের পিসফুল কো-একজিসটেন্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কো-অপারেশন বিদেশে যত বেশি অচল হচ্ছে ইন্ডিয়ান ডান্স আর বাজনা তত বেশি পপুলার হচ্ছে বলে শোনা যায়। ইন্ডিয়ান খবরের কাগজগুলো পড়লে মনে হয় আমাদের বাজনা আর ডান্সের ঠেলায় হলিউডে ফিল্ম তৈরি বন্ধ হয়েছে, প্যারিসের নাইট ক্লাবে খদ্দের হচ্ছে না।
ওস্তাদ সাহেবের দল সাকসেসফুল ফরেন ট্যুরের পর খুশিতে ডগমগ হয়ে বেনারসী পান-জর্দা চিবুতে চিবুতে প্রেস কনফারেন্সে বলেন, বাজনা? আহাহা, ওরা কি ভালোই বাসে! হল প্যাকড! অটোগ্রাফ দিতে হাত ব্যথা হয়ে যায়।
কোনো সাংবাদিক অবশ্য প্রশ্ন করেন না, কত ফরেন এক্সচেঞ্জ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন? তাহলেই ঝোলা থেকে বেড়াল ছানা বেরিয়ে পড়ত!
এই প্রেস কনফারেন্সের পর কলকাতার মিউজিক কনফারেন্সগুলোতে ওস্তাদ সাহেবের রেট শেয়ার বাজারের ফাটকাকে হার মানিয়ে চড় চড় করে বাড়ে।
সুন্দরী যুবতী ডান্সারদের পয়সা খরচা করে প্রেস কনফারেন্স করতে হয় না। রিপোর্টার-ক্যামেরাম্যানরাই সুন্দরীদের দোরগোড়ায় ভিড় করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্না দেবার পর মুহূর্তের জন্য সেই অমৃতলোকবাসিনী সুন্দরী দর্শনে তার ধন্য হল। আর কাগজে ছাপা মিস পদ্মাবতীর নাচ দেখার জন্য প্যারিসে ট্রাফিক জ্যাম হয়, রাশিয়ায় বলশয় থিয়েটারের টিকিট বিক্রি হয় না।
আর রোমে?
পাগল ইতালীয়নরা এয়ারপোর্টে এমন ভিড় করেছিল যে চারটে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলেড হয়ে যায়।
ভালো কথা। অনেক দেশের ফিল্ম প্রডিউসার ডাইরেকটাররা আমাকে তাদের ফিল্মে নাচতে ইনভাইট করেছেন।
ব্যস! রেসের মাঠে ট্রিপল টোট! চার লাখ কালো, এক লাখ সাদা দিয়েও প্রডিউসার পদ্মাবতীর কনট্রাকট পান না।
লেক মার্কেটের পটলদা বা দর্জিপাড়ার বিধুবাবু এসব কাহিনি বিশ্বাস করলেও তরুণের মতো ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটরা শুনলে হাসি চাপতে পারে না। নেক্সট উইকে প্রীতিকুমারীর আগমনবার্তা শুনে তাই তো তরুণ খুব বেশি সুখী হতে পারল না।
তাছাড়া তরুণ একটু ভিন্ন প্রকৃতির। কিছু কিছু ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাট আছেন যাঁরা প্রীতিকুমারীর মতো ডান্সারদের সেবা করে ধন্যবোধ করেন। প্রোগ্রামের শেষে হোটেলের নিভৃত কক্ষে দুচার। রাউন্ড ড্রিংক করার পর এদের ভাগ্যে কখনও কখনও উপরি পাওনাও জুটে যায়। তরুণদের সহকর্মী সাবারওয়াল এমনি এক নৃত্যপটীয়সীর সেবা করে ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি করে। তাড়াহুড়ো করে অফিস যাবার সময় লেডিস জুতো পরে এম্বাসী গিয়েছিলেন, সে কথা ফরেন সার্ভিসের কে না জানে?
তরুণ এসব উপরি পাওনার স্বপ্ন কোনোদিন দেখেনি জীবনে। শুধু একজনেরই স্বপ্ন দেখেছে সে সারাজীবন ধরে। মনের সমস্ত সত্তা দিয়ে, মাধুরী দিয়ে যাকে সে ভালোবেসেছে, সেই ইন্দ্রাণী। ছাড়া আর কোনো নারীর স্থান নেই তরুণের জীবনে।
জীবনের ধূসর মরু-প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে বন্দনার কাছে বিরাট সম্ভাবনাপূর্ণ ইঙ্গিত পেয়েছিল তরুণ। অনেক আশা নিয়ে এসেছিল বার্লিনে। মনসুর আলির সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য করাচিতে সেকেন্ড সেক্রেটারি বড়ুয়াকে চিঠি দিয়েছিল। বড়ুয়া ছুটিতে থাকায় উত্তর এসেছে মাত্র কদিন আগে। পাকিস্তান সরকারের কোনো অফিসারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে গেলে বিপদের সম্ভাবনা আছে বলে বড়ুয়া জানিয়েছে। বড়ুয়া লিখেছে, আমার ক্ষতির চাইতে মিঃ আলির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। কারণ পাকিস্তান সরকার ভাবতে পারে। ওর সঙ্গে আমাদের কোনো গোপন সম্পর্ক আছে। করাচির আবহাওয়া বড়ই খারাপ। সেজন্য মিনিস্ট্রির লেভেলেই যোগাযোগ হওয়া ভালো।
বড়ুয়া চিঠির শেষে লিখেছে, আমাদের মিনিস্ট্রি থেকে পাকিস্তান ফরেন মিনিস্ট্রিতে চিঠি এলে কাজের অনেক সুবিধে হবে। প্রথম কথা হাই-কমিশনও সরকারিভাবে তদ্বির করতে পারবে। তাছাড়া সব চাইতে বড় কথা, এখন এখানে যিনি ইন্ডিয়া ডেস্কের এসব দেখাশুনা করেন, তিনি পূর্ব বাংলারই একজন মুসলমান। খুব সম্ভব ঢাকারই লোক। প্রায়ই ঢাকা যান। আমার স্থির বিশ্বাস উনি নিশ্চয়ই খুব সাহায্য করবেন।
কটা দিন এমন বিশ্রী ঝামেলার মধ্যে কাটছে যে তরুণ মিনিস্ট্রিতে একটা ফর্মাল কমিউনিকেশন পাঠাতে পারল না। ট্যান্ডন সাহেবের অনুপস্থিতিতে নিশ্চয়ই সময় পাবে না।
তরুণ বলল, ওসব ডালারের চিন্তা পরে করা যাবে। আপনি কনসালটেশনের জন্য বন-এ যাবার আগে আমার ওই চিঠির ড্রাফটটা দেখে ফাইনাল করে দেবেন, অ্যান্ড ইউ শুড সী দ্যাট ইট ইজ ইমিডিয়েটলি ডেসপ্যাঁচড টু ফরেন অফিস।
