ট্যান্ডন সাহেব এসব জানেন, বোঝেন। ছোটখাটো সেবা-যত্ন পাবার লোভেই যে ভীমাপ্পাসাহেব শৰ্মাজীকে সঙ্গে রেখেছিলেন, তাও তিনি জানেন। আর জানেন যে, শৰ্মাজীও লিডার। কাঁচা লোক নন। একেবারে ফিনিশড প্রডাক্ট। সুতরাং তিনিও তার ওই টিটাগড়ের কারখানার ইংরেজ জেনারেল ম্যানেজার মারফত বিধি-ব্যবস্থা করেছেন ইউরোপ দর্শনের সুব্যবস্থার জন্যে। শ্রমিক-কল্যাণের জন্য বিদেশি মিল-মালিকের দল যে ইউরোপ ভ্রমণকারী কোনো কোনো লিডারের সেবা-যত্নের ব্যবস্থা করেন, তা শুধু মিঃ ট্যান্ডন নয়, সব ডিপ্লোম্যাটরাই জানেন।
তবুও মিঃ ট্যান্ডন জিজ্ঞাসা করলেন, হোয়াট হ্যাঁপেন্ড টু মিস্টার শর্মা? ওকে আজ দেখছি না যে?
আর বলবেন না! আমাদের কোনো কোনো লিডার এমন করাপটেড আর হোপলেস যে। কি বলব? ওঁর গার্ডেনরীচ ওয়ার্কশপের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মিঃ ব্রাউন অ্যাকসিডেন্টালি বার্লিনে এসেছিলেন। মার্টিনী খেতে খেতে একটু নিভৃতে দু-একটা ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য কয়েক দিন…।
মিঃ ট্যান্ডন বাধা দিয়ে বললেন, না-না, আমি অত কিছু জানতে চাইনি। লেট হিম মাইন্ড হিজ ওন বিজনেস!
ইন এনি কেস ভীমাপ্পাসাহেব এবার কাজের কথায় আসেন, ওই ক্যামেরা আর বাইনোকুলারটা ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে দিল্লি পাঠাতে হবে।
শৰ্মাজী অসৎ, কিন্তু ভীমাপ্পা সৎ। সৎ হয়েও ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে, মাল পাচার করার অনুরোধ করতে দ্বিধা হয় না।
কূটনৈতিক জগতের এক আশ্চর্য আবিষ্কার হচ্ছে এই ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ। কূটনৈতিক মিশনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি হচ্ছে এই ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ। ওয়াশিংটনের সি-আই-এ দপ্তর থেকে মস্কোর আমেরিকান এম্বাসী মারফত এজেন্টদের কাছে যে গোপন সংকেত ও নির্দেশ যায়, তা থাকে এই ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে। আমেরিকান এম্বাসী থেকে যে ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ ওয়াশিংটনে যায়, তাতে থাকে রাশিয়ার অনেক গুপ্ত খবর। সারা দুনিয়া থেকে ক্রেমলিনে যেসব ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ আসে, তাতেও ভর্তি থাকে অনেক রহস্য।
এই লেনদেনের কাহিনি সবাই জানে, সবাই বোঝে। তবে কেউ বাধা দেয় না। শান্তির সময় ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগের যাতায়াতে বাধা দেবার নিয়ম নেই, প্রথা নেই।
সাধারণত নিজের নিজের দেশের এয়ার লাইন্স এই ব্যাগ আনা-নেওয়া করে। ব্রিটিশ ফরেন অফিস বা ব্রিটিশ এম্বাসী প্যান অ্যামেরিকান বা এয়ার ফ্রান্সেও ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ পাঠাবে না। এয়ার ক্র্যাফটের কম্যান্ডারের ব্যক্তিগত হেপাজতে এক ব্যাগ থাকে। কোনো দেশের গোয়েন্দা, পুলিশ বা কাস্টমস-এর স্পর্শ করার অধিকার নেই।
ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে যে শুধু গোপন তথ্য যায় তা নয়। মিশনের নিত্য-নৈমিত্তিক চিঠিপত্র ও টুকিটাকি অনেক কিছু যায়। জরুরী প্রয়োজনে ডিপ্লোম্যাটদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও পাঠান হয়।
সে যাই হোক, ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগের রাজনৈতিক মূল্যের তুলনা নেই। প্রয়োজনের শেষ নেই। তাই তো বহু দেশ ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগের দেখাশোনা করার জন্য সঙ্গে দুএকজন ডিপ্লোম্যাটকেও পাঠায়।
ভারতবর্ষের অত ফালতু পয়সা নেই। তাছাড়া দুনিয়ার গোপন খবর লুঠপাট করে নেবার প্রয়োজনও তার নেই। তবুও তো ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ। ফরেন মিনিস্ট্রির অনেক গোপন খবর। ও চিঠিপত্র তাতে থাকে।
ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ এম্বাসি থেকেই যাতায়াত করে, কনসুলেট থেকে নয়। এই ব্যাগে কিছু পাঠাতে হলে কনসুলেট থেকে এম্বাসীতে পাঠাতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে তার স্থান হবে।
বার্লিন থেকে কোনও ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ সোজা দিল্লি যায় না। প্রথমে সব কিছুই বন-এ ইন্ডিয়ান এম্বাসীতে যাবে। তারপর সেখান থেকে নির্দিষ্ট দিনে ফ্রাঙ্কফুর্ট গিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার দিল্লিগামী প্লেনের কম্যান্ডারের হাতে তুলে দেওয়া হবে সেই অমূল্য ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ।
আমাদের ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে শুধু যে জরুরি নথিপত্র যায়, তা নয়। প্যারিস-ডিপ্লোম্যাটদের জন্য ধনে-জিরে-শুকনো লঙ্কাও ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে যেতে পারে। আবার দিল্লিগামী ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে জয়েন্ট সেক্রেটারির মেয়ের বিয়ের জন্য সুইস ঘড়ি বা জামাতা বাবাজীর স্কটিশ টুইডের স্যুট যায় কিনা বলা শক্ত। আরো অনেক কিছু যেতে পারে।
তবুও অপরের খেয়াল চরিতার্থ করার জন্য নিজে সেই কাজ করা সম্পূর্ণ আলাদা কথা।
একসকিউজ মী, মিঃ ভীমাপ্পা, আমাদের এখান থেকে তো কোনো ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ দিল্লি যায় না।
ঠিক আছে, বন-এ এম্বাসীতে পাঠিয়ে দিন। ওরা ওখান থেকে আপনাদের হয়েই সেক্রেটারি মিঃ নানজাপ্পার কাছে পাঠিয়ে দেবে। তাহলেই-।
বাট স্যার, আমরা তো কোনো ব্যাগ বন-এ পাঠাই না। আপনি বরং ফেরার পথে বন-এ এম্বাসীতে দিয়ে দেবেন।
এর আগে কোনো কনসুলেটে তরুণের পোস্টিং হয়নি। দিল্লির ফরেন মিনিস্ট্রি ছাড়া বিভিন্ন এম্বাসিতে কাজ করেছে। বার্লিন আসার আগে ইউনাইটেড নেশনশ-এ ছিল। তাই তো ভেবেছিল কনসুলেটে এসে ঝামেলা অনেক কমবে, কিন্তু ভীমাপ্পার মতো নিত্য নতুন ভূতের উপদ্রবে। যে জীবন অতীষ্ঠ হবে ভাবতে পারেনি।
ভীমাপ্পাকে কোনোমতে বিদায় করার পর মিঃ ট্যান্ডনও বললেন, জানো তরুণ, ভেবেছিলাম রিটায়ার করার আগে একটু শান্তিতে দিন কাটাব, কিন্তু এদের উপদ্রবে তাও হলো না।
