কি কি কিনতে চান তার একটা লিস্ট আর সেগুলোর দাম রেখে যান। আই উইল ট্রাই টু হেল্প ইউ। ট্যান্ডন সাহেব আর কি বলবেন!
সঙ্গে সঙ্গে দুজনে পকেট থেকে ক্যাটলগ, প্রাইস লিস্ট বের করলেন। দুজনে মিলে কত আলোচনা-সমালোচনার পর একটা লম্বা লিস্ট তৈরি করলেন।
আই অ্যাম আফ্রেড, এতগুলো কেনা সম্ভব হবে না।
শৰ্মাজী বললেন, আমরা তো রোজ আসব না। আর তাছাড়া ভীমাঞ্জার ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট আছে। বোম্বে বা দিল্লিতে কাস্টমসের ঝামেলা থাকবে না। তাই…।
কিন্তু আপনার মতো অনেকেই তো আসছেন।
ভীমাপ্পা অত্যন্ত বিবেচকের মতো বললেন, ঠিক আছে। লিস্ট রেখে গেলাম, যা পারেন তাই কিনবেন।
ভি-আই-পি-দ্বয় বিদায় নিলেন। ট্যান্ডন সঙ্গে সঙ্গে ডেকে পাঠালেন তরুণকে।
তরুণ ঘরে ঢুকতেই ওই লিস্ট আর এক বান্ডিল দ্যবেস্তা মার্ক এগিয়ে দিয়ে বললেন, আমার পুরস্কার দেখেছ?
তরুণ হাসতে হাসতে বলল, উনি যে ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টার! তাই তো দেশের কিছুই ওঁর পছন্দ হবে না। ইমপোর্টেড জিনিসে ঘর ভর্তি না থাকলে কি ওঁদের প্রেস্টিজ থাকে?
একটু থেমে তরুণ আবার বলে, মাঝে মাঝে মনে হয় ট্রানজিস্টার টেরিলিন ক্যামেরা হুইস্কীর জন্য ইংরেজ যদি কিছু ব্যয় করত, তবে বোধহয় ওরা আবার ভারতবর্ষে রাজত্ব করতে পারত।
ট্যান্ডন সাহেব বললেন, বোধহয় তোমার কথাই সত্যি।
১২. ভীমাপ্লাসাহেব যেদিন কনসুলেটে এলেন
এরপর ভীমাপ্লাসাহেব যেদিন কনসুলেটে এলেন, সেদিন আর শর্মাজীকে দেখা গেল না। ট্যান্ডন সাহেব একটু বিস্মিত হলেন। দীর্ঘদিন ফরেন সার্ভিসে কাজ করে তার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে একটু চালু মন্ত্রীরা ঠিক একলা দেশভ্রমণ পছন্দ করেন না।
কারণ?
কারণ একটা নয়, একাধিক। তবে শুধু উমেদারি, তাবেদারি বা খিদমতগারির জন্য নয়, নিজেদের রসনা আর বাসনা পরিতৃপ্তির জন্য।
নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে মন্ত্রীদের পক্ষে বেহিসেবী হওয়া যায় না। মোটা খদ্দরের তলায় মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে বাধ্য হয়ে চাপা রাখতে হয়। এত পরিচিত সমাজে খেয়াল-খুশি চরিতার্থ করা অসম্ভব। একটু এদিক-ওদিক হলেই বিধানসভা-লোকসভায় মে আই নো স্যার বলে না জানি কে প্রশ্ন করবেন। এরপর লোক্যাল কাগজের রিপোর্টারগুলো তো আছেই।
বিহারের ভূতপূর্ব মন্ত্রী দিব্যেন্দুবিকাশ চৌধুরি মিঃ ট্যান্ডনকে এবার বলেছিলেন, আচ্ছা বলুন
তো মিঃ ট্যান্ডন, মন্ত্রী হয়েছি বলে কি আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ নই?
সহানুভূতি জানিয়ে মিঃ ট্যান্ডন বলেছিলেন, তা তো বটেই!
কলেজের ছেলেরা মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে পারে, অধ্যাপকরা ছাত্রীদের আদর করতে পারেন চাকুরিয়া সহকর্মী মেয়েদের নিয়ে ডায়মন্ডহারবার বা পুরী যেতে পারেন, মার্কেন্টাইল ফার্মের অফিসার ইয়ং মেয়ে স্টেনোদের নিয়ে মুসৌরী-নৈনীতাল কনফারেন্স বা সেমিনারে যেতে পারেন…।
ঝড়ের বেগে দিব্যেন্দুবিকাশের দুঃখের ইতিহাস বেরিয়ে আসে।
বেইরুটের ইন্ডিয়ান এম্বাসীর চান্সেরী বিল্ডিং-এর তিনতলায় ওই কোণার ঘরে বসেই মিঃ ট্যান্ডন ভূমধ্যসাগরের মাতাল হাওয়ার স্পর্শ অনুভব করেন। জানালা দিয়ে একবার বাইরের আকাশটা দেখেন। তারপর সান্ত্বনা দিয়ে মাঝপথে মন্তব্য করলেন, আমি আপনার কথা কোয়াইট রিয়ালাইজ করি।
একটু আস্তে হলেও উত্তেজনায় টেবিল না চাপড়ে পারলেন না দিব্যেন্দু-বিকাশ। রিয়ালাইজ কেন, অ্যাপ্রিসিয়েট করবেন আমার কথা-কারণ দেয়ার ইজ লজিক ইন মাই আর্গুমেন্ট।
দ্যাটস রাইট।
ছোটখাটো মন্ত্রীরা ছোটখাটো শিকার ধরেন। কেউ শপিং করে দেয়, কেউ ট্যাকসির বিল মেটায় আর কেউ বা বেইরুটের পৃথিবী খ্যাত নাইট ক্লাব কিটক্যাটে নিয়ে যায়।
বড় বড় কর্তাব্যক্তিরা চুনোপুঁটি শিকার করেন না।…
একজন অতি সাধারণ বিদেশযাত্রীর মতো অশোক আগরওয়ালা নামে এক ভদ্রলোক দমদম থেকে কোয়ান্টাস ফ্লাইটে ইউরোপ গেলেন। বাইরের দুনিয়ার কেউ জানল না, খেয়াল করল না। পরিচিতরা জানল, দুর্গাপুরের এক কারখানার কোলাবরেশনের জন্য অশোকবাবু বিলাইত গেলেন।
কোলাবরেশনের মকরধ্বজ খেয়ে ভারতবাসীরা স্বর্গে যাবে বলে যেসব দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন নেতৃবৃন্দের ধারণা, তারা অশোকবাবুর পকেট ভর্তি করে ফরেন এক্সচেঞ্জ দিয়েছেন। এছাড়া
এছাড়া আবার কি?
এছাড়া এ-বি-সি অ্যান্ড একস-ওয়াই-জেড ইন্টারন্যাশনাল কনসট্রাকশন কোম্পানির ওভারসিজ ম্যানেজারের অ্যাকাউন্টে তো মাসে মাসে পাঁচশো ডলার জমছে।
তার মানে?
অশোক আগরওয়ালা আর তার বন্ধুরা হয়তো ভাবেন কেউ কিছু বোঝে না। ট্যান্ডন সাহেব মনে মনে হাসতেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে বলা হল, ওভারসীজ ম্যানেজারকে মাইনে দশ হাজার টাকা প্লাস কার অ্যালাউন্স প্লাস অফিস অ্যালাউন্স প্লাস এন্টারটেনমেন্ট অ্যালাউন্স প্লাস…। ওভারসিজ ম্যানেজারকে বলা আছে, শ্রীমানজী! মাসে মাসে পাঁচশো ডলার ব্যাঙ্কে জমা রাখবে। কর্তাব্যক্তিরা বা তাদের বন্ধু-বান্ধব-হিতাকাক্ষীরা এলেই ওই ডলার খরচ হবে।
সুতরাং পকেট ভর্তি ভরেন এক্সচেঞ্জ ছাড়াও অশোকবাবুর আরো কিছু সম্ভব ছিল। একমাস ধরে ইউরোপের দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়ে বন্ধুদের সেবার জন্য ফুলপ্রপ ব্যবস্থা করলেন অশোকবাবু।
এক মাস পরে বন্ধুবর যেদিন ভারতের কোনো এয়ারপোর্ট থেকে বি-ও-এ-সি প্লেনে চাপলেন, সেদিন লোকে-লোকারণ্য। যেদিন ফিরে এলেন সেদিনও শত-সহস্র মানুষের ভিড়। কেউ জানল না কার নিঃস্বার্থ সেবায় তার যাত্রা সফল হল।
