মিঃ ট্যান্ডনের মতো লোকও আর সহ্য করতে পারলেন না। বললেন, মিঃ ভোঁসলে, আপনাদের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। নিছক ভদ্রতা, সৌজন্যের খাতিরে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। দ্যাটস অল রাইট।
দেশের সুনাম বা প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তো নয়, নিছক রক্তমাংসের দেহটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্যেই কোনো অনারেবল ডেলিগেটের আগমন হয়। কিন্তু তাহলে কি হয়! ইন্ডিয়ান মিশনের জ্বালাতনের শেষ নেই।
ভীমাপ্পাসাহেব একজন মন্ত্রী ও ইন্ডিয়ার ডেলিগেশনের নেতৃত্ব করেছেন! দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে তাকে অপবাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তবুও তিনি শৰ্মাজীকে আনার আগে একটা খবর দেওয়া কর্তব্য মনে করেননি।
মিঃ ট্যান্ডন মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে বললেন, ঠিক আছে, চলে যান হোটেলে। আই হোপ দে উইল ম্যানেজ সামহাউ।
পরের দুদিন ভীমাপ্পা ও শৰ্মাজীর টিকিটি পর্যন্ত দেখা গেল না। তিন দিনের দিন দুপুরের দিকে কনসুলেটে হাজির হয়ে ট্যান্ডনকে অনুরোধ করলেন, আমি আর শর্মাজী কিছু কেনাকাটা করব। মিঃ সেনগুপ্ত যদি একটু কাইন্ডলি হেল্প করেন…?
লন্ডনে গিয়ে ভিড়ে ভর্তি পাবে গিয়ে এক জাগ বিয়ার না খেলে বিলেত যাওয়া বৃথা। প্যারিসে গিয়ে নাইট ক্লাবে যেতে হয় আর পারফিউম কিনতে হয়। রোমে গিয়ে ক্যাসিনো। তেমনি বার্লিনে গিয়ে নাইট ক্লাবে রাত কাটাতে হয়, সস্তায় ক্যামেরা কিনতে হয়। এসব নিয়ম পালন না করলে ইন্ডিয়ান ভি-আই-পি-দের ধর্মরক্ষা হয় না।
ভীমাপ্পা নিজেই বললেন, ইউ সি মিঃ ট্যান্ডন, লাস্ট দুটো নাইট রেসিতে বেশ কেটেছে।
রেসি?
হ্যাঁ, বলহাউস রেসি। বার্লিনের পৃথিবীখ্যাত নাইট ক্লাব। ডান্সিং ফ্লোরের চারপাশে ছোট ছোট কেবিন। প্রত্যেক টেবিলে আছে টেলিফোন ও ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চিঠি আদান-প্রদানের অপূর্ব ব্যবস্থা। খোলামেলা কেবিনে বসে দেখে নিন কে কোথায় বসেছে। টেবিলের উপর রাখা ম্যাপ দেখে জেনে নিন অন্যের টেবিল নম্বর। তারপর চিঠি লিখুন, দূর থেকে আপনাকে বেশ লাগছে। যদি আপত্তি না করেন তাহলে এই ভারতীয় আপনার সঙ্গে একটু নাচতে চান।
ইলেকট্রনিক্সের কৃপায় মুহূর্তের মধ্যে সে চিঠি পৌঁছে যাবে ঠিক অভীষ্ট স্থানে। উত্তর আসবে, এই শ্যাম্পেনটুকু শেষ করার ধৈর্য ধরতে পারলে বার্লিনে ভ্রমণরতা ও হ্যাঁমবুর্গবাসিনী কৃতার্থ হবে।
জার্মান মেয়েদের সম্পর্কে আমার অত্যন্ত উঁচু ধারণা ছিল, কিন্তু সামান্য এক গেলাস শ্যাম্পেনের প্রতি আপনার দুর্বলতা দেখে স্তম্ভিত না হয়ে পারছি না।
মাই ডিয়ার জেন্টলম্যান, কি করব বলুন? শুধু নাচতেই নেমন্তন্ন করলেন। শ্যাম্পেনের অফার তো পেলাম না।
ভীমাপ্পাসাহেব নিশ্চয়ই ভাবলেন, বিদেশ বিভূঁইতে তোমার মতো ডাগর-ডোগর জার্মান বান্ধবী পেলে এক গেলাস কেন, বোতল বোতল শ্যাম্পেন দিতে পারি।
যাই হোক উত্তর গেল, ইউ আর ওয়েলকাম টু ডান্স অ্যান্ড ড্রিংক।
এমনি করে খেলা চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শ্যাম্পেন খেয়ে নাচতে নাচতে মদির হয়ে অনেকে দেখতে বসেন রেসি ওয়াটার শো। সে আর এক অপূর্ব দৃশ্য। প্রতি মিনিটে নহাজার জেট আট হাজার লিটার জল ছড়াচ্ছে এক লক্ষ আলোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে।
রেসির গল্প করতে করতে আনন্দে, খুশিতে ভীমাপ্লাসাহেবের মুখোনা হাসিতে ভরে গেল, চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। জানেন মিঃ ট্যান্ডন, রেসিতে গেলে ভুলে যেতে হয় এই মাটির পৃথিবীর কথা।
ভীমাপ্পাসাহেব এত আগ্রহ করে সব বলেছিলেন যে মিঃ ট্যান্ডন তাকে একেবারে দমিয়ে দিতে পারলেন না। এরা আনন্দ করতে জানে।
এবার ভীমাঞ্জাসাহেব লিডারের মতো কথা বলতে শুরু করলেন, যে জাত আনন্দ করতে জানে না, সে পরিশ্রম করতেও জানে না। কাজ করতে হলে আনন্দ করার, ফুর্তি করার স্কোপ চাই। কিন্তু ইন্ডিয়াতে কোথায় সেই আনন্দ করার স্কোপ?
দ্যাটস রাইট মিঃ ভীমাল্লা।
মিঃ ট্যান্ডন প্রবীণ হলেও ফরেন সার্ভিসের লোক। খুব বেশি না বুঝলেও একটু বুঝলেন, রেসিতে নাচতে নাচতে মিঃ ভীমাপ্পা কোনো শিকার ধরেছিলেন নিশ্চয়ই।
শর্মাজী এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। রেসির স্মৃতি মনের মধ্যে টগবগ করে ফুটছিল। আর সামলাতে পারলেন না, ডু ইউ নো মিঃ ট্যান্ডন, ওই যে মেয়েটি-মিস রিটারের সঙ্গে দুদিন কাটিয়ে কিছু কিছু জার্মান কথাও শিখেছি।
মিঃ ট্যান্ডন ইংরেজিতে ধন্যবাদ না জানিয়ে বললেন, ডাংকেসন! শৰ্মাজী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, বিটুসেন।
ভীমাপ্পা আবার কেনাকাটার কথা শুরু করলেন, টুমরো উই আর ফ্রি। তারপর কিছু ইন্ডাস্ট্রি দেখব। দু একটা পার্টির সঙ্গে কথাবার্তা আছে। ওরা হয়তো কোলাবরেশন করে মাইশোরে কিছু স্টার্ট করতে পারে।
অর্থাৎ আগামী কালই শপিং করতে চান? ট্যান্ডন জানতে চাইলেন।
দ্যাট উড বি ফাইন।
ট্যান্ডন সাহেব তরুণ সেনগুপ্তকে ভালোভাবেই জানেন। এক বোতল বিয়ার বা একটা ডিনারের লোভে সে ইন্ডিয়ান ভি আই-পি-দের ল্যাংবোট করে ঘুরতে আদৌ পছন্দ করে না। তাছাড়া নিজের নামে কিনে ভীমাপ্পাকে দিতে তার আপত্তি থাকবেই। অথচ।
অথচ আবার কি? ফরেন সার্ভিসে এসব হজম করতেই হয়। কতজনের মেয়ের বিয়ের সময় হাজার হাজার টাকার মালপত্র কিনে ডিপ্লোম্যাট বা ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ মারফত পাঠাতে হয়।
