পশ্চিমের অনেক দেশে ডিপ্লোম্যাটদের অনেক রকম টুকটাক সুবিধে দেওয়া যায়। ডিপ্লোম্যাট হিসেবে কেনাকাটা করলে অনেক সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যায়। ডিপ্লোম্যাটিক মিশন থেকে বুক করলে বহু হোটেলেও চার্জ কম লাগে। ভীমাপ্পাসাহেবের মতো যাঁরা ঘন ঘন বিদেশে যান ও ইন্ডিয়ান মিশনের সঙ্গে খাতির আছে, তাদের হোটেলে বুকিং হয় ইন্ডিয়ান মিশনের মারফৎ। সুতরাং মিঃ ভীমার জন্য হোটেল আম জুতেই অ্যাকোমডেশন বুক করা হল। কনসুলেটের একটা গাড়িও রাখা হল মাঝে মাঝে ভীম্পাসাহেবকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করার জন্য। সরকারিভাবে নয়, বেসরকারিভাবে। দিনকাল বদলে যাচ্ছে। কোথা থেকে কিভাবে যে খবর বেরিয়ে যায় তার ঠিক নেই। এসব খবর অপোজিশন এম-পি-দের হাতে পড়লে রক্ষা নেই। সুতরাং আইন-কানুন বাঁচিয়েই গাড়ির ব্যবস্থা করা হল।
মিঃ ট্যান্ডন নিজেই এয়ারপোর্ট গেলেন ভীমাপ্লাসাহেবকে রিসিভ করতে। তবে এয়ারপোর্টে রিসিভ করার পর হোটেলে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব দিলেন কনসুলেটের একজন সাধারণ কর্মীকে।
এয়ার ফ্রান্সের প্লেন ঠিক সময়েই এল। কথামতো ভীমাপ্পা এলেন। পিছনে এলেন মিঃ শর্মা। হাসিমুখে মিঃ ট্যাভনের সঙ্গে করমর্দন করার পর ভীমাম্পাসাহেব বললেন, মীট মাই ফ্রেন্ড মিঃ শর্মা…
স্বভাবসুলভ খুশি মনেই মিঃ ট্যান্ডন হ্যাঁন্ডসেক করে বললেন, গ্ল্যাড টু মিট ইউ, মিঃ শর্মা।
এরপর ভীমাপ্পাসাহেব শৰ্মাজীর পরিচয় দিলেন।… জানেন মিঃ ট্যান্ডন, শৰ্মাজী একজন ফেমাস ট্রেড ইউনিয়ন লিডার। এবার আমাদের ডেলিগেশনের একজন মেম্বারও ছিলেন! র্যাদার হি ওয়াজ দি মোস্ট অ্যাকটিভ মেম্বার অফ অল দেম।
ভীমাপ্পা শৰ্মাজীর আরো অনেক গুণের কথা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে অতক্ষণ বকবক করা ভালো দেখায় না বলে মিঃ ট্যান্ডন বললেন, কয়েক দিন থাকছেন তো? পরে ভালোভাবে কথাবার্তা বলা যাবে।
মিঃ ভীমাপ্পার সঙ্গেই আবার চলে যাব। আপনি কোথায় থাকছেন?
ভীমাল্লাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, একসঙ্গে এসেছি একসঙ্গেই থাকব।
ট্যাভন সাহেব চিন্তিত না হয়ে পারলেন না। এক্সকিউজ মী মিঃ ভীমাল্লা, আপনি কি ওর বিষয়ে কিছু জানিয়েছিলেন?
না, তবে যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে।
কথাটা শুনে মনে মনে ট্যান্ডন বিরক্ত বোধ করলেন। হরিদ্বার-লছমনঝোলা বা কাশী-গয়ার ধর্মশালায় এক ঘরে পাঁচ-দশজনকে থাকতে দিতে পারে কিন্তু বার্লিনে যে তা সম্ভব নয়, ভীমাপ্পা ভালোভাবেই জানেন। একটু খবর দিলেই সবকিছু ব্যবস্থা ঠিক থাকত। কিন্তু অধিকাংশই ভীমার্গার দলে। কেউ সোমবার বলে মঙ্গলবার, সকাল বলে বিকেলে আসেন; আবার কখনও তিনজন বলে একজন অথবা একজন বলে তিনজন।
এই তো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ইন্ডিয়ান ডেলিগেশন নিয়ে কি কাণ্ডটাই হয়ে গেল। দুটি ফিচার ফিল্ম, একটি ডকুমেন্টারী ইন্ডিয়ার অফিসিয়াল এনট্রি ছিল। এইসব ফিল্মর প্রডিউসার, ডিরেক্টার, অভিনেতা ও অভিনেত্রীর দলে এগারোজন থাকার কথা। এ ছাড়া ফেস্টিভ্যাল কমিটি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতীয় ফিল্ম দুনিয়ার চারজনকে। এরা সবাই আসবেন বলে কলকাতা, দিল্লি, বোম্বে থেকে চিঠি এল। চিঠি পাবার পর হোটেল বুক করা হল।
আবার চিঠি এল, টেলিগ্রাম এল। কেউ জানালেন সোমবার আসছেন, কেউ জানালেন মঙ্গলবার আসছেন, কেউ সকালে, কেউ বিকেলে।
চিঠি আসা বন্ধ হল, শুরু হল টেলিগ্রাম আসা। ফরেন একচেঞ্জ নট ইয়েট স্যাংশান। ডিপারচার ডিলেড-বলে জানালেন কলকাতা থেকে মিঃ গুপ্ত। ফেস্টিভ্যাল কমিটির আমন্ত্রণে যে চারজনের আসার কথা তাদের দুজন বোধহয় ধার-দেনা করেও প্লেন ভাড়া জোগাড় করতে পারেননি, তাই শেষ মুহূর্তে দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন! সরি, ক্যান্ট অ্যাটেন্ড, সিরিয়াসলি ইল বলে জানালেন কলকাতার এক বিখ্যাত ফিল্ম জার্নালিস্ট। বোম্বের ভদ্রলোক হিন্দী ফিল্মের মতো টেলিগ্রাম করে জানালেন, এয়ারপোর্টে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। সুতরাং সরি, ভেরী সরি। সামনের বছর নিশ্চয়ই আসব।
আরো কত টেলিগ্রাম এল। বোম্বের প্রডিউসার ভোসলে জানালেন, নায়িকা কুমারী সুন্দরীকে নিয়ে বুধবার আসছি। নায়ক দুর্লভকুমার রিচিং থার্সডে। কিন্তু কখন? বার্লিনে কি একটাই ফ্লাইট? একদিনে তিনটি টেলিগ্রাম এল কলকাতা থেকে। কোনোটাতেই স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই।
কি বিভ্রাটেই না কনসুলেটকে পড়তে হয়েছিল। ফেস্টিভ্যাল কমিটি থেকে বার বার করে ফোন আসে কন্সাল জেনারেলের কাছে। অথচ তিনি কিছুই বলতে পারেন না। বলবেন কী? নিজেদের সরকারের অকর্মণ্যতার কথা বাইরে বলা যায়, বলা যায় না, বিশ্বের সব চাইতে অস্পষ্ট মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষগুলিই ফরেন একচেঞ্জ ডিপার্টমেন্টের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেন।
শেষ পর্যন্ত তিন দিন ধরে চারটে আলাদা আলাদা ফ্লাইটে এলেন সাতজন। হোটেলে পৌঁছে প্রডিউসার ভোসলে অবাক হলেন সিঙ্গল রুম অ্যাকোমোডেশন দেখে। প্রথমে অনুরোধ, পরে দাবি জানালেন ডবল রুমের জন্য। ইউরোপের নানাদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ এসেছেন বার্লিন ফেস্টিভ্যাল দেখতে। তিল ধারণের জায়গা নেই কোনো হোটেলে। হোটেল কর্তৃপক্ষ অক্ষমতা জানালেন। ভোসলে সাহেব ক্ষেপে লাল!
মুখে বললেন না, তবে বেশ স্পষ্টভাবেই কন্সাল জেনারেলকে বুঝিয়ে দিলেন, আপনাদের মতো সত্যমেব জয়তের তিলক পরে আমাকে গোলামি করতে হয় না। হাজার হাজার টাকা খরচা করে হিরোইনকে নিয়ে এসেছি শুধু ফিল্ম জার্নালে দুচারটে ছবি ছাপাবার জন্য নয়, নিজের প্রয়োজনে।
