ম্যানিলা থেকে যারা অন্যত্র বদলি হতেন, তারা জানতেন আগরওয়ালের বিবর্তনের ইতিহাস। দেবদেবীর ভজন-পূজন শেষ হয়ে গেছে। মদ খেয়ে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা ছুকরীদের নিয়ে বেলেল্লাপনা করবার সময় বহুদিন আগেই ভেঙে চুরমার করেছে। এখন আর আগরওয়াল জঙ্গল বার নাইট ক্লাবে বসে ধেনো মদের মতো ফিলিপাইনের তালের রসে তৈরি তুরা মদ খেতে খেতে গার্ল ফ্রেন্ডের সঙ্গে গল্প করে খুশি হয় না। শিকার যোগাড় করেই নিজের অ্যাপার্টমেন্টে আনে!
তরুণের কাহিনিও ছড়িয়েছিল ফরেন সার্ভিসের সর্বস্তরে। মিসেস ট্যান্ডনও জানতেন ইন্দ্রাণী-হারা তরুণের দীর্ঘনিশ্বাসের কথা। তাই তো ইন্দ্রাণীর বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তরুণের নীরবতা দেখে ভাবীজি বললেন, ঠিক হ্যায়। তোমার মতো ইনকপিটেন্ট ডিপ্লোম্যাটকে দিয়ে কিছু হবে না। এবার আমিই দেখি কি করতে পারি।
তরুণ কিছু না বলে বিদায় নিল।
———
* দুটি বার্লিনের কথা ১৯৬১ সালে বার্লিন প্রাচীর ওঠার আগেকার পট ভূমিকায় লেখা। এই রচনার ঘটনাকালও তখনকার।
১১. লন্ডনের মতো ভারতীয়দের ভিড়
লন্ডনের মতো ভারতীয়দের ভিড় বা নিউইর্কের মতো ভি-আই-পি-র স্রোত নেই বার্লিনে। ভারতীয় ডিপ্লোম্যাটদের কাছে এটা শুধু শাস্তি নয়, স্বস্তিরও বটে। তবে বার্লিনে আছে ডেলিগেশনের অফুরন্ত ধারা। অতীত দিনের বাংলাদেশের মতো বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই আছে এখানে। পলিটিশিয়ানের সংখ্যা সীমিত হলেও ডিগনিটারীর অভাব নেই। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট থেকে শুরু করে ফিল্ম-স্টার, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট পর্যন্ত।
ডেলিগেশন বে-সরকারি হলে ডিপ্লোম্যাটদের দায় থাকে, দায়িত্ব থাকে না। কর্তব্য থাকে কিন্তু দুশ্চিন্তা থাকে। কন্সাল জেনারেল মিঃ ট্যান্ডন নিছক ভদ্রলোক। রিটায়ার করার মুখোমুখি কাউকেই অসন্তুষ্ট করতে চান না। তাছাড়া ফরেন অফিসের একজন প্রবীণ ডিপ্লোম্যাট বলে আলাপ আছে সারা দেশের সরকারি বে-সরকারি মানুষের সঙ্গে। সুতরাং ঝামেলার শেষ নেই।…
সেবার জেনেভায় ইন্টারন্যাশনাল লেবার কনফারেন্স ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের লিডার ছিলেন মাইশোরের লেবার ও ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টার মিঃ ভীমাপ্পা। ভীমাপ্পাসাহেবের ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য আছে। ভীমাপ্লাজনক ছিলেন মাইশোর মহারাজার ডেপুটি পলিটিক্যাল সেক্রেটারি। শৈশব, কৈশোরে দশের শোভাযাত্রায় হাতি চড়ে ঘুরেছেন গার্ডেন সিটি মাইশোরের রাজপথ। প্রথম যৌবনের সোনালি দিনগুলিতে লুকিয়ে-চুরিয়ে ঘোরাঘুরি করেছেন রাজপ্রাসাদের আনাচে-কানাচে।
ভীমাপ্লাসাহেবের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের এই শেষ নয়, শুরু। পড়াশুনা করেছেন ব্যাঙ্গালোরের মিশনারী কলেজে, হৃদ্যতা হয়েছে ডজন ডজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ের সঙ্গে। সন্ধ্যাবেলায় তাদের সান্নিধ্য উপভোগ করেছেন চমরাজ সাগর-লেকের ধারে। ছুটির দিনে ছোট মেল চড়ে দল বেঁধে গিয়েছেন নন্দী পাহাড়ে। কখনও বা শিবাসমুদ্রমে গিয়ে কাবেরীর জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।
আরো কত কি করেছেন এই ভীমাপ্লাসাহেব। দক্ষিণ ভারতীয়দের মতো সুর করে ইংরেজি ইনি বলেন না। অসোনিয়ন ইংলিশ না বললেও ইংরেজি বেশ বলেন।
আরো পরের কথা। এম-এল-এ হবার পর চুড়িদার শেরওয়ানী পরে ঘোরাঘুরি শুরু করলেন দিল্লির রাজনৈতিক মহলে। গোটা দুয়েক ডেলিগেশনের সদস্য হয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার প্যাসেঞ্জার হবার পর একদিন শুভক্ষণে মন্ত্রী। লেবার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টার। অদৃষ্টের সিংহদ্বার খুলে গেল।
একবার নয়, দুবার নয়, সরকারি-বেসরকারি ডেলিগেশনের সদস্য হয়ে বহুবার বহু কারণে গিয়েছেন পৃথিবীর নানা দেশে। মিঃ ট্যান্ডনের সঙ্গে সেই সূত্রেই আলাপ। একবার একটা গুড উইল ডেলিগেশনে ওরা দুজনেই গিয়েছিলেন ইস্ট ইউরোপের কয়েকটি দেশে।
ভীমাপ্পা যে জেনেভায় ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের লিডার হয়ে গিয়েছেন, সে খবর পৌঁছেছিল বার্লিনে। কিছুদিন পরে ওঁর একটা চিঠিও এলো মিঃ ট্যাভনের কাছে।…কি নিদারুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে, তা বোঝাতে পারব না। এত মতভেদ ও মতবিরোধ যে দেখা দেবে আমাদের ডেলিগেশনের মধ্যে, তা আগে ভাবতে পারিনি। যাই হোক কনফারেন্স শেষ হলে কয়েক সপ্তাহের জন্য একটু ঘুরেফিরে বেড়াব। বার্লিনে নিশ্চয়ই যাব। কয়েকটা দিন একটু আনন্দ করা যাবে।
সেদিন কনসুলেটে যেতেই মিঃ ট্যান্ডন তলব করলেন তরুণকে। বললেন, আই হোপ ইউ ননা মিঃ ভীমাপ্পা? ওই যে মাইশোরের লেবার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টার।
তরুণের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় না থাকলেও ভীমাপ্পাসাহেবের কথা সে শুনেছে। বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনেছি ওঁর কথা। তাছাড়া উনি তো আই-এল-ও কনফারেন্সে আমাদের ডেলিগেশনের লিডার।
মিঃ ট্যান্ডন খুশি হয়ে বললেন, দ্যাটস্ রাইট। তুমি দেখছি কারুর কথাই ভুলে যাও না।
হাসতে হাসতে তরুণ বলে, ভারতবর্ষের এসব স্মরণীয় ব্যক্তিদের ভুললে কি আর চাকরি করতে পারি?
ট্যান্ডনও একটু না হেসে পারলেন না। তা তুমি ঠিকই বলেছ। স্মরণীয়ই বটে।
একটু থেমে একটু মুচকি হেসে বললেন, তুমি কিছু জান নাকি ওর সম্পর্কে?
বিশেষ কিছু না, তবে শুনেছি জলি গুড ফেলো।
ঠিক শুনেছ। যাই হোক, উনি আসছেন কয়েকদিনের জন্য। যদিও প্রাইভেট ভিজিটে আসছেন, তবুও মিনিস্টার তো, কিছু ব্যবস্থা কিছু দেখাশুনা করতেই হবে।
