ভাবীজি বললেন, এবার তো তোমাদের ট্যান্ডন সাহেব রিটায়ার করছেন। আর আমি তোমাদের রান্না করে দিতে পারব না। এবার বিয়ে কর, তাকে রান্না-বান্না শিখিয়ে দিয়ে আমিও রিটায়ার করি।
তাহলে আর এ জন্মে হলো না ভাবীজি।
ওসব বাজে কথা ছাড়। ফরেন সার্ভিসে থেকে আজও ইন্দ্রাণীকে খুঁজে বের করতে পারলে?
ফরেন সার্ভিসের কথা বাইরে না ছড়ালেও গোপন থাকে না। ভালো, মন্দ, কোনো খবরই। সুধীর আগরওয়ালা দিল্লিতে থাকার সময় সবাইকে চমকে দিল। ড্রিংক তো দূরের কথা, পান-সিগারেটও খেত না। মঙ্গলবার শুধু উপবাসই করত না, আরউইন রোডের হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে অফিসে এসে সবাইকে প্রসাদ দিত। সন্ধেবেলা বাসায় ফিরে কোট-প্যান্ট ছেড়ে ধুতি-চাঁদর পরে পুজো করত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
যারা ফরেন অফিসে কাজ করেও ফরেন যেতেন না, বা যেতে পারতেন না, তারা বাহবা দিতেন। কিন্তু যারা বহু ঘাটে জল খেয়ে এসেছেন, তারা মন্তব্য করতেন, প্রথম ওভারেই ক্লিন বোল্ড হয়ে যাবে। আই-এফ-এস সুধীর আগরওয়ালাকে তাই ঠাট্টা করে অনেকেই বলত আই-জি-বি-এস-ইন্ডিয়ান গুড বয় সার্ভিস।
আগরওয়ালার প্রথম ফরেন পোস্টিং হলো ম্যানিলায়। বিকৃত পশ্চিম, বিস্মৃত পূর্বের মিলনভূমি ফিলিপাইন। ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাপয়েন্টমেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত জেনেই অনেকেই মুচকি হেসেছিলেন।
দুচারজন অনভিজ্ঞ প্রবীণ প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ইউ ইউ পিপুল ডোন্ট স্পয়েল হিম, আগরওয়াল ঠিক থাকবে।
বিদেশ যাত্রার আগে সুধীর ছুটি নিয়ে বাবা মাকে দেখার জন্য শুধু কানপুরই গেল না, হরিদ্বার আর বেনারসও গেল। নিয়ে এল নির্মাল্য, গঙ্গাজল আর অসংখ্য দেবদেবীর ফটো। কনট প্লেসে শপিং করবার আগে চাঁদনী চক থেকে ডজন ডজন ভালো ধূপকাঠি কিনল। অন্যান্য সহকর্মীদের মতো সেই সঙ্গে কিনল রেকর্ড। তবে বিলায়েৎ খাঁ-রবিশঙ্করের সেতার বা লতা মঙ্গেশকারের লাইট মডার্ন সঙস্ নয়। কিনল যুথিকা রায়, শুভলক্ষ্মীর ভজন।
শুভদিনে শুভক্ষণে সুধীর আগরওয়াল রওনা হল সিঙ্গাপুর এন রুট টু ম্যানিলা।
বিদায় জানাতে আরো অনেকের সঙ্গে ইন্ডিয়ান গুড বয় সার্ভিসের মহেশ মিশ্রও গিয়েছিল। মিশ্র বার বার করে আগরওয়ালাকে বলেছিল ডোন্ট হেসিটেট, যা কিছু দরকার আমাকে লিখো। আমি পাঠিয়ে দেব।
ম্যানিলায় পৌঁছেই আগরওয়াল বহু সহকর্মীকে চিঠি দিল। মিশ্রকে লিখল, তোমাদের সবাইকে ছেড়ে এসে বড় নিঃসঙ্গ বোধ করছি। তবে আমার পরম সৌভাগ্য মিঃ ডুরাইস্বামীর ছোট্ট ফ্ল্যাটটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। মোটামুটি সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছি। দু-একজন সহকর্মী আমাকে বেশ সাহায্য করেছেন। তবে সন্ধ্যার পর নিজের ঘরে বসেই কাটিয়ে দিচ্ছি। সারা শহরটা যেন হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তুমি তো জান আমার ওসব ভালো লাগে না। তাই শুধু পড়াশুনা করছি।
আর কারুর কাছে না হোক, মিশ্রের কাছে প্রতি সপ্তাহে ম্যানিলা থেকে চিঠি আসত। কখনও লিখত, ভাই আরো দুচারটে ভালো ভালো ভজন বা ক্লাসিক্যাল গানের রেকর্ড পাঠিয়ে দাও। আবার লিখত, বইপত্তর যা এনেছিলাম তা যে কতবার করে পড়লাম তার ঠিকঠিকানা নেই। এখানে আমার মনের মতো বই পাওয়া অসম্ভব। তাই তুমি যদি একটু কষ্ট করে ভারতীয় বিদ্যাভবনের কয়েকটা বই পাঠাও তবে বড়ো ভালো হয়।
আরও কত কি লিখত আগরওয়াল।-এদের ন্যাশনাল মিউজিয়াম দেখলাম। সত্যি দেখবার মতো অনেক কিছু আছে। কয়েক শতাব্দীর অস্ত্রশস্ত্রের যে কালেকশন আছে, শুধু তাকে নিয়েই পৃথিবীর এদিককার মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস লেখা সম্ভব। আর আছে পোশাক-এর কালেকশান। এক কথায় অপূর্ব। মানব সভ্যতার প্রগতির অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে তার পোশাক। মানুষের সৃজনী শক্তি কি সুন্দরভাবে, ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছে তার মধ্যে যে ছন্দ আছে, আনন্দআত্মতৃপ্তি আছে তা এদের মিউজিয়ামের পোশাকের কালেকশান দেখলে বেশ অনুভব করা যায়। আমাদের দেশে কত বিচিত্র ধরনের পোশাক ব্যবহার হয়েছে ও হচ্ছে কিন্তু দুঃখের বিষয় এসব পোশাকের কোনো সংগ্রহশালা নেই।
নিঃসঙ্গ আগরওয়াল সন্ধ্যাবেলায় হয় পড়াশুনা করত, নয়তো চিঠিপত্র লিখত। লিখত সহকর্মীদের কথা, শহরের কথা।-দিনের বেলা সবই যেন ক্যাজুয়াল। কাজকর্ম, পোশাক-আশাক, সব কিছু। একটা শর্ট স্লিভের সার্ট পরেও ফরেন মিনিস্টারের কাছে যাওয়া যাবে। কাজকর্ম সবাই করছে, তবে মনটা পড়ে থাকে সন্ধ্যার দিকে। রাত্রির নেশাতেই দিনের বেলা যা কিছু করা সম্ভব আর কি! শুধু হোটেল, রেস্তোরাঁ, নাইট ক্লাবে নয়, জনে জনের বাড়িতেও রসের মজলিশ বসে। মানুষগুলো হঠাৎ চলে যায় যুগ যুগ পিছনে। আদিম মানুষের মতো সে হিংস্র হয়ে ওঠে-নারী পুরুষ সবাই।…এই যে আমাদেরই সহকর্মী মিঃ চাচ্ছা! কিভাবেই জীবন কাটাচ্ছেন। রোজ সন্ধ্যায় কোথা থেকে যে এক একটা মেয়েকে শিকার করে নিজের ফ্ল্যাটে আনেন, ভাবলেও অবাক লাগে, ঘেন্না করে।
ফরেন সার্ভিসের সর্বত্র ছড়িয়েছিল আগরওয়ালের অভিজ্ঞতার কাহিনি। পরে যখন ওর চিঠিপত্র আসা কমতে থাকল, সে খবরও মুখে মুখে, ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগের কৃপায় অথবা ডিপ্লোম্যাটদের নিত্য আনাগোনার ফলে ছড়িয়ে পড়ত পৃথিবীর প্রায় সব ইন্ডিয়ান মিশনেই
কয়েক মাসের মধ্যেই আরো অনেক কাহিনি ছড়িয়েছিল।
