পৃথিবীর বহু শহরে-নগরে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট দেখা যাবে, কিন্তু বার্লিনের হান্সা কোয়ার্টারের অ্যাপার্টমেন্টে কি যেন একটু অতিরিক্ত পাওয়া যাবে। এই অতিরিক্ত পাওয়াটুকুই এক একটা জাতির বৈশিষ্ট্য। রাশিয়া রকেটের সঙ্গে সঙ্গে বলশয় থিয়েটার আর ব্যালেরিনার জন্য বিখ্যাত। জাপান শুধু ইলেকট্রনিকসে নয়, চমৎকার পুতুল তৈরি করে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছে। সুইস মেশিনারী ঘড়ির মতো সুইস চকোলেটও সবার প্রিয়। বার্লিনেও বড় বড় কলকারখানার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত বার্লিন ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রা।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে বেশ লাগছিল তরুণের। দূরের রেডিও টাওয়ারের দিকে নজর পড়তেই মনে পড়ল ফিলহারমনিক ও সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার কথা। নিউইয়র্কে গত বছরই শুনেছিল হাবার্ট ভন্ কারজনের পরিচালনায় বার্লিন ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রা। মনে পড়ল আরো অনেক কথা।
রমনার মজুমদার বাড়ির বিনয়বাবু বি-এ ফেল করার পর বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। অনেক খোঁজ-খবর করেও ফল হলো না। ফটো দিয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তবুও বিনয়বাবুর কোনো সন্ধান দিতে পারেনি কেউ। পারবে কোথা থেকে। খবরের কাগজে যখন বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে উনি তখন আরব সাগরের মাঝ দরিয়ায় ভেসে চলেছেন।
দেখতে দেখতে বছরের পর বছর কেটে গেল। ঢাকার লোক প্রায় ভুলে গেল বিনয় মজুমদারের কথা। ওয়াড়ীর মাঠে, বুড়ীগঙ্গার পাড়ের জটলাতেও বিনয় মজুমদারকে নিয়ে আলাপ-আলোচনাও ক্রমে ক্রমে বন্ধ হয়ে গেল। ইন্দ্রাণী ভুলতে পারল না তার বিনেকাকুকে। ভুলবে কেমন করে? ও যে বিনেকাকুর কোলে চড়ে প্রায়ই বেড়াতে যেত, লজেন্স খেতো। বিনেকাকু যে ওর সব আব্দার হাসিমুখে বরদাস্ত করতেন। বড় হবার পরও বিনেকাকুর দেওয়া পুতুলগুলো বেশ যত্নে সাজিয়ে রেখেছিল ইন্দ্রাণী।
দীর্ঘদিন পরে অকস্মাৎ বিনেকাকু ফিরে এলেন ঢাকায়। রমনা, ওয়াড়ী, বুড়ীগঙ্গার পাড়ে আবার চাঞ্চল্য দেখা দিল। দীর্ঘদিন জার্মানিতে থেকে অদৃষ্ট পাল্টেছেন, অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছেন জীবনে। যুদ্ধ শুরু হবার পর প্রায় বাধ্য হয়ে সুইডেনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষ হবার পর বিনয়বাবু এলেন আবার মাতৃভূমিকে দেখতে।
বিনেকাকুর কাছে যেতে ইন্দ্রাণীর দ্বিধা, সঙ্কোচ হচ্ছিল। তরুণ কিছু না বলে কলেজ যাবার পথে বিনেকাকুর ওখানে গিয়েছিল।
কাকু, আমার নাম তরুণ। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন।
তোমার বাবার নাম কি?
কানাই সেনগুপ্ত।
ওই উকিলবাড়ির কানাইদার ছেলে তুমি?
তরুণ হাসতে হাসতে বলেছিল, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন।
বিনয়বাবু আদর করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন তরুণকে। অনেক কথাবার্তার পর তরুণ। ইন্দ্রাণীর কথা বলেছিল।
ওই ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটা? যে আমাকে বিনেকাকু বলত?
হ্যাঁ।
বিনয়বাবু একটু যেন উদাস হলেন। হারিয়ে যাওয়া অতীতের ভিড়ের মধ্যে মনটাকে নিয়ে গেলেন। একটু পরে বললেন, ও কি এখনও সেই রকম আদুরে আছে?
তরুণ কি জবাব দেবে? চুপ করে থাকে। বিনয়বাবু আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, জান তরুণ, প্রথম প্রথম বিদেশে গিয়ে ছোট্ট বাচ্চাদের টফি খেতে দেখলেই মনে পড়ত ওর কথা। বড় ইচ্ছে হতো ওর একটা ছবি কাছে রাখি কিন্তু তা আর মনে হয়নি।
তরুণ জিজ্ঞাসা করল, কেন কাকু?
বিনয়বাবু হেসে বললেন, বাড়ি থেকে যে পালিয়ে গিয়েছিলাম, তাই ঢাকার কাউকেই চিঠি দিতে পারতাম না।
ইন্দ্রাণীকে আসতে হয়নি, বিনয়বাবুই গিয়েছিলেন। পকেট ভর্তি টফি নিতে ভুলে যাননি।
বার্লিনের হান্স কোয়ার্টারের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তরুণের সে সব কথা পরিষ্কার মনে পড়ল। আর মনে পড়ল বিনেকাকু শেষে বলেছিলেন, ঢাকায় থেকে ইলিশ আর গঙ্গাজলি খেয়ে কিছু হবে না। একদিন টুপ করে পালিয়ে জার্মান যাও, বার্লিনে এসো।
ঢাকার সেই বিনেকাকু জার্মান নাগরিক হয়েই বার্লিনে থাকেন বলেই তরুণ জানত। স্থির করল খুঁজে বের করতেই হবে সেই পরম শুভাকাঙ্ক্ষীকে।
বিনেকাকুর কথা মনে হতেই ইন্দ্রাণীর স্মৃতিটা একটু বেশি সচেতন হয়ে পড়ল মনের মধ্যে। এই ওপাশের ব্যালকনির ডেক-চেয়ারে বসে যদি ইন্দ্রাণী গুনগুন করে গান
হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল।
তরুণ স্পিকিং?
হ্যাঁ। আমি তরুণ বলছি।…নমস্কার মিঃ ট্যান্ডন, হাউ আর ইউ?
আই অ্যাম সরি, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছুতেই এয়ারপোর্টে যেতে পারলাম না।
না না, তাতে কি হয়েছে…
আর দেরি করতে পারল না।
ট্যান্ডন সাহেব সরকারি চাকুরি থেকে প্রায় বিদায় নিতে চলেছেন। বার্লিনেই তার লাস্ট পোস্টিং। ফরেন সার্ভিসের অনেক অফিসারই ট্যান্ডন সাহেবের অধীনে কোনো না কোনো ডেস্কে কাজ করেছেন। তরুণও করেছে! মিসেস ট্যান্ডনকে ভাবীজি বললেও ফরেন সার্ভিসের জুনিয়র অফিসাররা তাকে মাতৃতুল্য সম্মান দেন। কেউ একটু সম্মান দিলে, কেউ একটু মর্যাদা দিলে মিসেস ট্যান্ডন ক্ষমতার অতিরিক্ত না করে শান্তি পান না।
এর অবশ্য একটা কারণ আছে। ট্যান্ডন সাহেব কর্মজীবন শুরু করেন অধ্যাপনা করে। কনিষ্ঠদের আজও তাই ছাত্ৰজ্ঞান করেন।
খাওয়া-দাওয়ার পর তরুণ বলল, জানেন ভাবীজি, ইউনাইটেড নেশনস ছাড়তে মনটা বড় খারাপ লাগছিল। কিন্তু যেই মনে পড়ল আপনার রান্নার কথা, তখন আর এক মুহূর্তও নিউইয়র্কে থাকতে মন চাইল না।
