দুটি জার্মানি, দুটি বার্লিন দিন-রাত্তিরের মতো সত্য হলেও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে শুধু পশ্চিম জার্মানির। পশ্চিম বার্লিনে আছে কন্সাল জেনারেলের অফিস। সেই কাল জেনারেল অফিসে পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রধান হতে চলেছে তরুণ।
সাধারণত কন্সাল জেনারেলের অফিসের দুটি কাজ। কনসুলার ও কমার্শিয়াল। অর্থাৎ পাসপোর্ট-ভিসা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে সাহায্য-সহযোগিতা করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে থাকে প্রচার বিভাগ। বার্লিন যদি সানফ্রান্সিসকোর মতো একটা বিরাট শহর ও ব্যবসা কেন্দ্র হতো, তাহলে ওই দুটি-তিনটিই কন্সাল জেনারেল অফিসের কাজ হতো। কিন্তু বার্লিন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীর দুটি বিবাদমান শক্তি এখানে মুখোমুখি। তাই তো শুধু পাসপোর্ট-ভিসা আর এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের কাজই নয়, কন্সাল জেনারেলের অফিসে কুটনৈতিক বিভাগটি অন্যতম প্রধান অংশ। তরুণ সেই গুরুত্বপূর্ণ পলিটিক্যাল ডিভিশনের প্রধান হতে চলেছে।
পূর্ব জার্মানিতে ভারতীয় কুটনৈতিক মিশন নেই, বার্লিনে নেই আমাদের দূতাবাস বা কাল-জেনারেল। বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিল্পসমৃদ্ধ দেশ পূর্ব জার্মানির সঙ্গে ভারতের শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক। তাই তো আছে ট্রেড মিশন।
দ্বিধাবিভক্ত বাংলার কাছে দ্বিখণ্ডিত বার্লিনের কাহিনি হাসির খোরাক যোগাবে। পশ্চিম বার্লিন পশ্চিম জার্মানির অন্তর্গত নয়। তবে রাজধানী বনের চাইতে পশ্চিম জার্মানির অনেক বেশি সরকারি কর্মচারী পশ্চিম বার্লিনে কাজ করেন। বার্লিন দু টুকরো হলেও মিউনিসিপ্যালিটির কাজকর্ম একইভাবে চলছিল। মাটির উপরের রেল ইউ-বান চালাত পূর্ব জার্মানি, মাটির তলার রেল ইউ-বান চালাত পশ্চিম জার্মানি। প্রায় পঞ্চাশ হাজার পূর্ব বার্লিনবাসী প্রতিদিন চাকরি করতে আসত পশ্চিমে, কয়েক হাজার পশ্চিমের বাসিন্দাও নিত্য যায় পূর্বে চাকরি করতে।
বার্লিনের মজার কাহিনি আরো আছে। পশ্চিম বার্লিন থেকে যে বাইশ জন ডেপুটি বনে প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের একজন তো পূর্ব বার্লিনেই থাকতেন। ভাবতে পারেন খুলনা বা বরিশালে বাস করে, কলকাতা থেকে নির্বাচিত হয়ে দিল্লির পার্লামেন্টের সদস্য হওয়া? কলকাতার মতো পূর্ব জার্মানির থিয়েটারের মানে বেশ উঁচু। পশ্চিম বার্লিনের বনেদি ও ধনী বা থিয়েটার রসিকের দল তাই রোজ সন্ধ্যায় পূর্ব বার্লিনে গিয়ে থিয়েটার দেখেন। আবার আমেরিকান খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিন পড়ার জন্য আমেরিকান প্রচার দপ্তরের পৃথিবীর বৃহত্তম। লাইব্রেরি-পশ্চিম বার্লিনের ইউ-এস-আই-এ-তে পূর্ব বার্লিনের হাজার হাজার কর্মী নিত্য আসেন।
এই বার্লিনে-পশ্চিম বার্লিনে এলো তরুণ। পশ্চিম বার্লিনের টেমপেলহ এয়ারপোর্টটি একেবারে শহরের মধ্যে। কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মতো না হলেও পার্ক সার্কাস আর কি! এয়ারপোর্টটিও বেশ অভিনব। মাঠের মধ্যে রানওয়ের ধারে বা টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে মাইলখানেক দূরে প্লেনে ওঠা-নামা করতে হয় না। প্লেন একেবারে টার্মিনাল বিল্ডিং-এর বিরাট হল ঘরের মধ্যে থামে। প্লেনে ওঠা-নামার সময় এয়ার হোস্টেসের কৃত্রিম হাসি দেখার আগে বা পরে রোদ-জল ঝড় সহ্য করতে হয় না যাত্রীদের।*
কন্সাল জেনারেল একটু জরুরি কাজে আটকে থাকায় নিজে এয়ারপোর্ট যেতে পারেননি তরুণকে অভ্যর্থনা জানাতে। সহকর্মী মিঃ সুরী ও মিঃ দিবাকরকে পাঠিয়েছিলেন।
তরুণ বলল, আপনারা দুজনে কেন কষ্ট করলেন? আই অ্যাম সরি, আমার জন্য আপনাদের বেশ কষ্ট হলো।
মিঃ দিবাকর বললেন, কি যে বলেন স্যার! আপনাদের দেখাশুনা করা ছাড়া আমাদের আর কি কাজ?
মিঃ সুরী শুধু বললেন, দ্যাটস্ রাইট স্যার। হান্স কোয়ার্টারে তরুণের ফ্ল্যাট ঠিক করা ছিল। দিবাকর আর সুরী ফ্ল্যাটের সব কিছু দেখিয়ে দেবার পর বললেন, স্যার আপনি একবার সি-জি-র (কন্সাল জেনারেল) ওয়াইফকে টেলিফোন করুন।
কেন? এনিথিং স্পেশ্যাল?
সি-জি বার বার করে বলেছেন?
তরুণ হাসে। দিবাকর আর সুরী মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন।
তরুণ বলল, টেলিফোন করার দরকার নেই। আপনারা কাইন্ডলি মিসেস ট্যান্ডনকে বলে যান আমি একটু পরেই আসছি।
দিবাকর আর সুরী বিদায় নিলেন। বলে গেলেন, একটু পরেই গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার।
দ্যাটস অল রাইট।
ওঁরা বিদায় নেবার পর তরুণ একটু ঘুরে ফিরে ফ্ল্যাটটা দেখল। ছোট্ট ফ্ল্যাট। ছোট্ট ফ্ল্যাটই সে চেয়েছিল। একটা বড় লিভিং রুম, একটা মাঝারি সাইজের বেডরুম, ছোট্ট একটা স্টাডি আর কিচেন, টয়লেট ইত্যাদি। এ ছাড়া দুটি বারান্দা-একটি ছোট, একটি বড়। বড়টি লিভিং রুমের সঙ্গে, ছোটটি বেডরুমের সঙ্গে। দুটি বারান্দাতেই অ্যালুমিনিয়াম ডেকচেয়ার রয়েছে। হান্স কোয়ার্টারের অ্যাপার্টমেন্টে ক্রটি কিছু নেই। ফার্নিচার, বিছানাপত্তর, লাইট স্ট্যান্ড-সব কিছুই ঝকঝ তক্ত করছে।
পৃথিবীর কিছু কিছু দেশ আছে যেখানে শিল্পীর সঙ্গে শিল্পের সমন্বয় হয়েছে। মুষ্টিমেয় এই কটি দেশে সব কিছুতেই একটা শিল্পীসুলভ মনোবৃত্তি, রুচির পরিচয় পাওয়া যাবে। রাইফেল সব দেশেই তৈরি হচ্ছে। আমেরিকা-রাশিয়া থেকে শুরু করে আমাদের ইছাপুর, কাশীপুরে পর্যন্ত। কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়াই একমাত্র দেশ যে দেশের রাইফেলেও চমৎকার শিল্পীমনের পরিচয় পাওয়া যাবে। লোহার তৈরি পুল তো সব দেশেই আছে। কলকাতা-লন্ডন-নিউইয়র্কে। কিন্তু প্যারিসের ওই প্রাণহীন লোহার পুলগুলির মধ্যেও সমগ্র ফরাসি জাতির যে শিল্পীমনের পরিচয়। পাওয়া যায়, তা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। জাপান, জার্মানিও অনুরূপ। সব কিছুতেই প্রয়োজনের সঙ্গে রুচির সমন্বয়।
