খবরটা এত অপ্রত্যাশিত যে স্থিরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা ছিল না তরুণের। বন্দনাই কি যেন ভেবে বলল, এক কাজ কর না দাদা। করাচিতে তোমাদের হাইকমিশনে কাউকে বলল মনসুর আলি সাহেবের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করতে।
বন্দনার প্রস্তাবে তরুণ যেন বাস্তব জ্ঞান ফিরে পায়। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ! মনসুর কি করাচিতেই পোস্টেড?
তাই তো বলেছিলেন।
একটু চুপচাপ থাকে দুজনে। বন্দনাই আবার বলে, আচ্ছা দাদা, তুমি একবার ঢাকায় তোমাদের ডেপুটি হাই-কমিশনের কাউকে বলো না ওই টিকাটুলিতে খোঁজ-খবর নিতে। হয়তো কেউ না কেউ খবরটা জানতেও পারেন!
চাপা গলায় তরুণ বলে, হ্যাঁ, তাও নিতে পারি।
বন্দনার কিছু কেনাকাটার ছিল। তাই এবার উঠে পড়ল।
কোথায় চললে?
এই একটু দোকানে যাব।
কেন?
আজ তিনদিন তো বাড়ির বাইরে যাইনি। কিছু কেনাকাটা…!
হাসি-খুশিভরা তরুণ বলল, আর দোকানে যেতে হবে না। বিকাশ এলে আমরা তিনজনেই বেরিয়ে পড়ব, বাইরেই খাওয়া-দাওয়া করব!
অনেকদিন পর হঠাৎ একটু আশার আলো দেখতে পাবার পর তরুণের মনটা খুশিতে ঝলমল করে উঠেছিল। বন্দনা তাই আর বাধ্য দিতে পারল না। ঠিক আছে। আজ খুব মজা করা যাবে। তুমি একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি।
কিছু আনতে হবে?
হ্যাঁ দাদা, একটু কফি আনতে হবে। না না, আর দোকানে যেতে হবে না। তার চাইতে আমি বিকাশকে ফোন করে দিচ্ছি যে আমরাই আসছি, ও যেন ওয়েট করে।
একটু কফি খেয়ে বেরুব না?
কি দরকার? বেরিয়ে পড়ি। তারপর তিনজনে একসঙ্গে কোথাও কফি খেয়ে নেব।
গুরুগম্ভীর ধীর-নম্ন তরুণ হঠাৎ যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। অনেক দিনের জমাট বাঁধা বরফ যেন প্রভাতী সূর্যের রাঙা আলোয় একটু একটু করে নরম হতে শুরু করল।
রাত্রে শোবার পর বন্দনা বিকাশকে বলল, খবরটা শোনার পর থেকে দাদা কেমন পাল্টে গেছেন দেখেছ?
হ্যাঁ। দুনিয়ায় তো আর কেউ নেই। সুতরাং খবরটা শোনার পর আনন্দ হওয়া তো স্বাভাবিক।
ওরা দুজনে যেদিন মিলতে পারবে, সেদিন কি হবে বলো তো?
বিকাশ মজা করে বলে, আমরা যেদিন প্রথম মিলেছিলাম, সেদিনকার আনন্দের চাইতে বেশি কিছু হবে কি?
বিকাশকে ছোট্ট একটা চড় মেরে বন্দনা বলল, তোমার মতো অসভ্য ছাড়া একথা আর কে বলবে?
আর মাত্র একটা দিন। তরুণ সারাদিন ঘোরাঘুরি করে পুরনো সহকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে এলো। টুকটাক কিছু কাজকর্ম ছিল, তাও সেরে ফেলল।
রাত্রে বন্দনা নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াল। তারপর বেশ খানিকটা গল্প-গুজব করে সবাই শুয়ে পড়ল।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়েই এয়ারপোর্ট রওনা দিল। যথারীতি বন্দনার চোখ দুটো ছলছল করছিল। তরুণ সান্ত্বনা দিয়ে বলল, এবার আর দুঃখ কি? বছরে একবার তোমরাও যেতে পারবে, আমিও আসতে পারব।
বি-ই-এ-র প্লেনে তরুণ রওনা হলো বার্লিন।
কলকাতার বৌবাজারে-বৈঠকখানার সঙ্গে রাসবিহারী-সাদার্ন অ্যাভিনিউর আশ্চর্য পার্থক্য থাকলেও তুলনা হতে পারে, কিন্তু লন্ডনের সঙ্গে বার্লিনের তুলনা? অসম্ভব, অবাস্তব, অকল্পনীয়। বরানগর-কাশীপুরের পুরনো জমিদার বাড়ির গেটে সিমেন্টের সিংহমূর্তি দেখে শিশুদের কৌতূহল জাগতে পারে, সহায়-সম্বলহীন অধস্তন কর্মচারীদের ভক্তি বা ভয় হতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর সমাজের কাছে আজ সেটা কৌতুকের উপকরণ মাত্র। ওইসব জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য থাকলেও ওদের দারিদ্র্য কারুর দৃষ্টি এড়াবে না। লন্ডন যেন ওই কাশীপুর-বরানগরের
জমিদারবাড়িগুলির বৃহত্তর সংস্করণ মাত্র। তাই তো লন্ডনের সঙ্গে বার্লিনের কোনো তুলনাই হয় না।
লন্ডন কেন, নিউইয়র্কের সঙ্গেও বার্লিনের কোনো তুলনা হয় না। পৃথিবীর সব চাইতে ধনীর দেশ আমেরিকা। নিউইয়র্ক তার মাথার মণি-শো উইন্ডো। তবুও সেখানকার ডাউন টাউনের মানুষের দারিদ্র্য, জৌলুসভরা টাইমস স্কোয়ারে ভিখারি দেখলে চমকে উঠতে হয়। কেন বেকারি? আমেরিকার কত অজস্র নাগরিক আজও অন্ন-বস্ত্রের জন্য হাহাকার করছে।
তাই তো বার্লিনের সঙ্গে নিউইয়র্কেরও তুলনা হয় না, হতে পারে না; বার্লিনে বেকার? ভিখারি? নিশ্চয়ই মানুষটা উন্মাদ। তা না হলে ওখানে কেউ বেকার থাকে না, ভিখারি হয় না।
এসব তরুণ আগেই জানত। পোস্টিং না হলেও আসা-যাওয়া করতে হয়েছে কয়েকবার। সেই বার্লিনে চলেছে তরুণ।
১০. বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো জার্মানিও
বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো জার্মানিও দু টুকরো হয়েছে কিন্তু কলকাতা বা লাহোরের মতো বার্লিন আর সেই আগের মতো নেই। একটা নয়, দুটো নয়, চার চারটে টুকরো হয়েছে বার্লিন ব্রিটিশ সেকটর, ফ্রেঞ্চ সেকটর, আমেরিকান সেকটর ও রাশিয়ান সেকটর। অ্যালায়েড ফোর্সেস-এর তিনটি সেকটর নিয়েই আজকের পশ্চিম বার্লিন ও রাশিয়ান সেকটর হচ্ছে পূর্ব বার্লিন। পশ্চিম বার্লিন বাহ্যত ও কার্যত মুক্ত হলেও আইনত আজও ইংরেজ-ফরাসি আমেরিকা অধীন। শহরটাকে চক্কর দিতে গিয়ে বার বার নজরে পড়বে, ইউ আর লিভিং ব্রিটিশ সেকটর, ইউ আর এস্টারিং ফ্রেঞ্চ সেকটর অথবা আমেরিকান সেকটর।
বিরাট ও বিচিত্র শহর হচ্ছে বার্লিন। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বার বার এর উল্লেখ। আয়তনে পূর্ব বার্লিনের চাইতে পশ্চিম বার্লিন কিছুটা বড়। দুটি বার্লিন একত্রে ওয়াশিংটনের সাড়ে তিনগুণ। আজকের পশ্চিম বার্লিনের আমেরিকান সেকটরই প্যারিসের চাইতে বড়।
