প্রথম দুটো দিন হোবনের ওদের ফ্ল্যাটের বাইরেই বেরুতে পারল না তরুণ। কতবার বলল, চলো বেড়িয়ে আসি। মার্বেল আর্চের পাশে বসে একটু গল্প-গুজব করে পিকাডিলিতে খাওয়া-দাওয়া করি।
বন্দনা বলল, মার্বেল আর্চ আর বন্ড স্ট্রিট দেখে কি হবে বল? তাছাড়া বাইরে যাবে কেন? আমার রান্না কি তোমার ভালো লাগছে না?
এ-কথার কি জবাব দেবে তরুণ। কিছু বলে না। শুধু মুখ টিপে টিপে হাসে।
বিকাশ দুদিন অফিসে যায়নি। অফিসে এখন ভীষণ কাজের চাপ। তাই আর ছুটি পায়নি। বন্দনা তো দশ দিনের ছুটি নিয়ে বসে আছে।
সেদিন দুপুরের লাঞ্চের পর তরুণ আর বন্দনা গল্প করছিল। আমেরিকার কথা, ইউনাইটেড নেশনস-এর কথা। কখনও আবার ব্যক্তিগত, পারিবারিক। সাধারণ, মামুলি কথাবার্তা বলতে বলতে হঠাৎ বন্দনা উত্তেজিত হয়ে বলল, আচ্ছা দাদা, তুমি মনসুর আলি বলে কাউকে চেন?
তরুণ একটু চিন্তিত হয়ে জানতে চাইল, কোন মনসুর আলি?
উনি বললেন, তুমি নাকি ঢাকাতে ওদেরই বাড়ির কাছে…।
এবার তরুণ নিজেই চঞ্চল হয়ে উঠল। জানতে চাইল, চোখ দুটো কটা-কটা?
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
খুব হাসতে পারে?
ঠিক ধরেছ।
আর শুয়ে থাকতে পারে না। এবার উঠে বসে। কোথায় দেখা হলো হতচ্ছাড়ার সঙ্গে?
বন্দনা বড় খুশি হলো, একটু যেন আশার আলো দেখল। তরুণ কোনোদিন তাকে ইন্দ্রাণীর কথা বলেনি। বলবার সম্পর্ক নয়। তাছাড়া তরুণ জানে নিজের মান, মর্যাদা সম্রম রক্ষা করে অন্যের সঙ্গে মিশতে। প্রত্যক্ষভাবে কিছু না শুনলেও বন্দনা অনুমান করতে পেরেছিল। তাছাড়া ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে বুঝতে পেরেছিল তরুণ এই দুনিয়ায় ওই একজনকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। মনসুর আলির সঙ্গে আলাপ করার পর আরো অনেক কিছু জানতে পারল।
তরুণের কথায় বন্দনাও তাই একটু চঞ্চল না হয়ে পারে না। বলল, এবার আমাদের নববর্ষের ফাংশানে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হলো। কথায় কথায় তোমার কথা উঠল।
হতচ্ছাড়া হঠাৎ আমার কথা জিজ্ঞাসা করল?
আমাদের পাশেই মিঃ সরকার বলে ঢাকার এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। মিঃ আলি ওকে তোমার নাম করে বলেছিলেন যে তোমরা নাকি একই পাড়ায় থাকতে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। শুধু এক পাড়ায় নয় একই স্কুলে একই সঙ্গে পড়তাম!
তাই নাকি?
তবে কি, ওকে তো আমরা কোনোদিন মনসুর আলি বলতাম না।
তবে?
বলতাম মুসুর। ভারি মজার ছেলে। ওকে মুসুর বললেই ও বলতো, কি বলছ শ্বশুর?
হঠাৎ হাসিতে তরুণের সারা মুখটা ভরে উঠল। জানলা দিয়ে দৃষ্টিটা লন্ডনের ঘোলাটে আকাশের কোলে নিয়ে গেল কিন্তু পরিষ্কার দেখতে পেল সেই ফেলে আসা অতীতের দিনগুলো।
পেটুক মনসুরকে নিয়ে কি মজাটাই না করত ওরা! তবে হ্যাঁ, যে কাজ আর কোনো ছেলেকে দিয়ে করানো সম্ভব হতো না, মনসুর হাসতে হাসতে সে কাজ করে দিতে পারত! তরুণের মা তাই তো মনসুরকে খুব ভালোবাসতেন। রমনার বিলাস উঁকিলের মেয়ের বিয়ের সময় মনসুর না থাকলে কি কাণ্ডটাই হতো! শেষ রাত্তিরে লগ্ন। বিলাসবাবুর সঙ্গে কি তর্কাতর্কি হওয়ায় নাপিত চলে গেল। লগ্ন বয়ে যায় অথচ নাপিতের পাত্তা নেই। হঠাৎ মনসুর ওই নাপিতেরই যোল-সতের বছরের ছেলেকে হাজির করে মহা অপমানের হাত থেকে রক্ষা করল সবাইকে। সেই মনসুর লন্ডনে এসেছিল?
উনি তো এখন রেডিও পাকিস্তানে আছেন। বি-বি-সি-তে কি একটা ট্রেনিং নিতে এসেছিলেন।
ও জানল কেমন করে আমি লন্ডনে ছিলাম?
তা তো জানি না। হয়তো কোনো পাকিস্তানী ডিপ্লোম্যাটের কাছে তোমার কথা শুনেছে।
কথাবার্তা চলতে থাকে। একটু দ্বিধা, একটু সঙ্কোচ বোধ করে বন্দনা। তবুও আর চুপ করে থাকতে পারে না।
আচ্ছা দাদা, তোমাদের ওখানে চিকাটোলা বলে কোনো…?
চিকাটোলা নয়, টিকাটুলি।
মিঃ আলি ওই টিকাটুলির এক রায়বাড়ির কথাও বলছিলেন।
টিকাটুলির রায়বাড়ি শুনতেই যেন তরুণের হৃৎপিণ্ডটা স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘাবড়ে গিয়ে সারা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে শুধু জানতে চাইল, রায়বাড়ির কথা কি বলল!
বিশেষ কিছু না। তবে খুব দুঃখ করলেন দাঙ্গায় ওদের সর্বনাশ হবার জন্য। আর বললেন, ও বাড়ির মেয়ে ইন্দ্রাণী নাকি…!
ভ্রূ দুটো কুঁচকে উঠল, গলার স্বরটা কেঁপে উঠল তরুণের। কি? কি হয়েছিল ইন্দ্রাণীর? মারা গিয়েছে তো?
বন্দনা তরুণের হাত দুটো চেপে ধরে বলল, না না দাদা, উনি বেঁচে আছেন।
কি বললে বন্দনা?
উনি মারা যাননি।
তরুণ আপন মনে বার বার আবৃত্তি করল, ইন্দ্রাণী বেঁচে আছে–?
মাথাটা নিচু করে কত কি ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন তলিয়ে গেল তরুণ। হয়তো মহা দুর্যোগের রাত্রে মহাসাগরের মাঝে দিগভ্রান্ত নাবিকের মতো কোথায় যেন দূরে একটু আলোর ইঙ্গিত পেল।
কয়েকটা মিনিট কেউই কথা বলতে পারল না। শেষে বন্দনাই বলল, হ্যাঁ দাদা, উনি বেঁচে আছেন। তুমি একবার ঢাকায় বদলি হয়ে যাও না!
মুখটা তুলে মাথাটা নাড়াতে নাড়াতে তরুণ বলল, না না, বন্দনা, ঢাকায় আমি যাব না। ওখানে গিয়ে আমি টিকতে পারব না।
তুমি একটু চেষ্টা করলে ওকে খুঁজে বার করতে পারবে।
তরুণ একটা বিরাট দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। ওর খোঁজ করা বড় কঠিন।
তুমি মনসুর আলি সাহেবকে একটা চিঠি দাও না।
না না, তা হয় না।
কেন হয় না?
ফরেন সার্ভিসের লোক হয়ে পাকিস্তান গভর্নমেন্ট অফিসারকে চিঠিপত্র দেওয়া ঠিক নয়!
