শছয়েক টাকায় যারা ফরেন সার্ভিসে নতুন জীবন শুরু করেন, প্রথমে ফরেন পোস্টিং-এর সময় তো ফেয়ারওয়েল ডিনারের ঠেলায় তাদের প্রাণান্তকর অবস্থা হয়। কৈ বাত নেই! তবুও নিদেনপক্ষে শতখানেক নেমন্তন্ন খেতে হয়, খাওয়াতে হয়, ছমাসের মাইনে অ্যাডভান্স নিয়েও তাল সামলান যায় না। হাই স্ট্যান্ডার্ড ও এইসব সৌজন্য রক্ষা করতে অনেক তরুণ আই-এফ-এসকেই দেনায় ডুবে থাকতে হয়। পরে অবশ্য ক্যামেরা, বাইনোকুলার, ট্রানজিস্টার, টেপ-রেকর্ডার বিক্রি করে অবস্থা বেশ পাল্টে যায়।
নিউইয়র্ক ত্যাগের আগে তরুণকেও ফেয়ারওয়েল ডিনার খেতে হলো, খাওয়াতে হলো। আসা-যাওয়ার নিত্য খেলাঘর হচ্ছে ডিপ্লোম্যাটিক মিশনের চাকরি। এখানে যেন কিছুই নিত্য নয়, সবই অনিত্য। তবুও মানুষ তো। তরুণের মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। একটু কষ্ট করেই মুখে হাসি ফুটিয়ে সবার সঙ্গে হ্যাঁন্ডশেক করে প্লেনে চড়ল।
প্লেনটা আকাশে উড়তেই তরুণের মন ভাসতে ভাসতে মুহূর্তের মধ্যে চলে গেল লন্ডনে। মনে পড়ল বন্দনার কথা, বিকাশের কথা।
ইচ্ছা ছিল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বন্দনার বিয়ে দেবে। হয়নি। ইউনাইটেড নেশনস-এ তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ছুটি নেওয়া অসম্ভব ছিল। তবুও তরুণের অমতে কিছুই হয়নি। বন্দনা চিঠি লিখেছিল, দাদা, খবরের কাগজ দেখেই বুঝতে পারছি কি নিদারুণ ব্যস্ততার মধ্যে তোমার দিন কাটছে। সারা রাত্রি কিভাবে তোমরা মিটিং কর, কনফারেন্স কর, আমি ভেবে পাই না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তুমি ভুলতে পার না আমার কথা। তোমার চিঠিতে দুতিন রকমের বল-পেন ও কালি দেখেই বুঝি একসঙ্গে একটা চিঠি লেখারও সময় তোমার নেই।…তোমার কথামতো। এবার নিশ্চয়ই আমি বিয়ে করব। তবে টোপর মাথায় দিয়ে বিয়ে করার জন্য কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে কলকাতা যাওয়া কি সম্ভব? নাকি উচিত?
পরের চিঠিতে বন্দনা লিখল, বিকাশকে তো তুমি ভালোভাবেই চেন, জান। আমাদের হাই-কমিশনেই তো কাজ করে। সুতরাং তোমাকে আর কি বলব! সারাদিন অফিস করে রিজেন্ট স্ট্রিট পলিটেকনিকে অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ে বেশ ভালোভাবে পাস করেছে। মনে হয় এবার একটা ভালো চাকরি পাবে।
বন্দনা জানত সব কথা খুলে না লিখলে দাদার অনুমতি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই চিঠির শেষে লিখেছিল, ভগবানের নামে শপথ করে বলতে পারি লুকিয়ে-চুরিয়ে ভালোবাসার খেলা আমরা খেলিনি। যে অধিকার পাবার নয়, সে অধিকার ও চায়নি, আমিও নিইনি। তবে মনে হয় আমার মতো দুঃখী মেয়েকে ও প্রাণ দিয়ে সুখী করতে চেষ্টা করবে।
ওসব কথা ভাবতে ভাবতে আপন মনেই হেসে উঠল তরুণ। প্লেনের জানলা দিয়ে একবার নিচের দিকে তাকাল, দেখতে পেল না সীমাহারা অ্যাটলান্টিক। কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পেল বন্দনা আর বিকাশকে। রান্নাবান্না শেষ করে সাজা-গোজা হয়ে গেছে। সিথিতে, কপালে টকটকে লাল সিঁদুর পরাও হয়ে গেছে। বিকাশকে বকাবকি করছে, তোমার নড়তে-চড়তে বছর কাবার হবার উপক্রম। গিয়ে হয়তো দেখব দাদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে…।
বিকাশ মজা করার জন্যে বলছে, তোমার দাদা হলে কি হয়! আমার তো শালা। অত খাতির করার কি আছে?
বন্দনা নিশ্চয়ই চুপ করে সহ্য করছে না।…ভুলে যেও না–দাদার জন্যই আমাকে পেয়েছ। আর যত মাতব্বরী তো আমার সামনে। দাদাকে দেখলে তো ব্যস!
মহাকাশের কোলে ভাসতে ভাসতে কত কথাই মনে পড়ে।
নিউইয়র্ক থেকে বার্লিনে যাবার পথে সরকারিভাবে তিন দিন লন্ডনে স্টপ-ওভার করা যাবে। শপিং-এর জন্য। বিচিত্র ভারত সরকারের নিয়মাবলী। ইংরেজ চলে গেছে। লাল কেল্লায় তেরঙ্গা উড়ছে, কিন্তু লন্ডন আজও স্বর্গ! দিল্লি থেকে আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, ঘানা যেতে হলেও ভায়া লন্ডন! শপিং-এর জন্য লন্ডনে স্টপ-ওভারের কথা ভাবলে অনেকেই হাসবেন। বন্ড স্ট্রিট-অক্সফোর্ড স্ট্রিটে কিছু রেডিমেড জামা-কাপড় ছাড়া লন্ডনে আর কিছু কেনার নেই। আই-সি-এসদের পলিটিক্যাল বাইবেলে বোধ করি লন্ডন ছাড়া আর কোনো জায়গার উল্লেখ। নেই।
লন্ডনে শপিং করার মতলব নেই তরুণের। তিন দিন ছুটি নিয়ে লন্ডনে ছদিন কাটাবে বলে ঠিক করেছে। বন্দনা-বিকাশদের সঙ্গে কদিন কাটাবার পর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে একটু দেখা-সাক্ষাৎ করবে। বন্ধু-বান্ধবদের জানিয়েছে, লন্ডন হয়ে বার্লিন যাচ্ছে; জানায়নি করে লন্ডন পৌঁছেছে। বন্দনাকেই শুধু একটা কেবল পাঠিয়েছে। রিচিং লন্ডন, এ-আই ফ্লাইট, ফাইভ-জিরো-ওয়ান, ফ্রাইডে।
এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং প্রায় বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলেছে লন্ডনের দিকে তবুও, যেন তরুণের আর ধৈর্য ধরে না। ধৈর্যের সঙ্গে বোয়িং-এর প্রতিযোগিতা চলতে চলতেই হঠাৎ কানে এলো, মে আই হ্যাভ ইওর অ্যাটেনশন প্লীজ! উই উইল বী ল্যান্ডিং অ্যাট লন্ডন হিথরো এয়ারপোর্ট ইন এ ফিউ মিনিটস ফ্রম নাউ। কাইন্ডলি ফ্যাসেন ইওর সীট বেল্ট অ্যান্ড…!
প্লেন থেকে বেরিয়ে টার্মিনাল বিল্ডিং-এ ঢুকতে গিয়েই উপরের দিকে ভিজিটার্স গ্যালারি না দেখে পারল না তরুণ। হ্যাঁ, ঠিক যা আশা করেছিল! বন্দনা আর বিকাশ আনন্দে উচ্ছ্বাসে হাত নাড়ছিল। পরম পরিতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল ওদের দুজনের সারা মুখে।
বেশ লাগল তরুণের। মনটা যেন মুহূর্তের জন্য উড়ে গেল। কাছের মানুষের ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব হলো না জীবনে। রিক্ত নিঃস্ব হয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিল। ইন্দ্রাণী-বিহীন জীবনে কোনোদিন মুহূর্তের জন্য শান্তি পাবে, ভাবতে পারেনি। ইন্দ্রাণীর ব্যথা আজও আছে, একই রকম আছে। বুড়ীগঙ্গার পাড়ে যাকে নিয়ে প্রথম যৌবনের দিনগুলিতে জীবনসূর্যের ইঙ্গিত দেখেছিল, আজও তাকে নিয়েই ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখে। জীবনের এত বড় ট্র্যাজেডির মধ্যেও তৃপ্তি আছে, আনন্দ আছে তরুণের জীবনে! আছে বন্দনা এবং আরো কত কে!
