টেলিভিশনের পর্দায় বেসবল খেলা নিয়ে অতগুলো লোকের হৈ-চৈ শুনতে বড় বেসুরো লাগল। সুইচটা অফ করে কোণার সিঙ্গল সোফাটায় চুপ করে বসে পড়ল তরুণ।
আকাশ-পাতাল চিন্তা এল মনে। আস্তে আস্তে চোখের স্বচ্ছ দৃষ্টিটা ঝাঁপসা হয়ে গেল। দুনিয়াটা ধোয়াটে, ঘোলাটে মনে হলো। ভাবতে ভাবতে কোথায় তলিয়ে হারিয়ে গেল ডিপ্লোম্যাট তরুণ সেনগুপ্ত। আস্তে আস্তে মনের পর্দায় কতকগুলো আবছা মূর্তি এসে ভিড় করল। কখন যে ভিড় সরিয়ে ইন্দ্রাণীর মূর্তিটা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল, তরুণ তা বুঝতে পারল না।
নিঃসঙ্গ তরুণ মাঝে মাঝেই এমনি দেখা পায় ইন্দ্রাণীর। মনে মনে কত কথা বলে, ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে ওর ফাঁকা ফ্ল্যাটে এমন চিৎকার করে যে পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস রজার্স না ছুটে এসে পারেন না।
সেনগুপ্টা! অয়ার ইউ শাউটিং টু সামবডি?
লজ্জিত তরুণ বলে, আই অ্যাম সরি মিসেস রজার্স। সরি হবার কিছু নেই, তবে তুমি তো ভীষণ চুপচাপ থাকো। তাই হঠাৎ তোমার চেঁচামেচি শুনে…
সেদিন বোধহয় রজার্স পরিবার কোথাও বাইরে গিয়েছিলেন তাই মিসেস রজার্স ছুটে এলেন না। বাজারের আওয়াজ শুনে তরুণের চিৎকার থেমে গেল। তারপর দরজা খুলে যাকে দেখল, তিনি মিঃ মিশ্র।
তুমি ইন্দ্রাণীকে এত ভালোবাস?
তরুণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মিঃ মিশ্রের প্রশ্নের কি জবাব দেবে সে? চুপ করে রইল।
মিঃ মিশ্র তরুণের কাঁধে দুটি হাত রেখে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, এত ভালোবাসা তোমার মধ্যে চাপা আছে? আমি তো বোতল বোতল মদ খেয়েও ওই অমলার মুখোনা ভুলতে পারি না। তুমি তো আমার মতো মাতাল নও কিন্তু কি করে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত এই জ্বালাকে চেপে রাখ তরুণ?
তরুণ এবার মুখ তুলে জানতে চায়, আমি কি খুব বেশি চিৎকার করছিলাম?
মিশ্রের মুখেও হাসির রেখা ফুটে ওঠে। চল, চল, ভিতরে গিয়ে বসা যাক।
তরুণের পিছনে পিছনে প্যাসেজ দিয়ে ড্রইংরুমের দিকে এগুতে এগুতে মিশ্র বলেন, আমি মাঝে মাঝে একলা থাকলে চিৎকার করে অমলাকে কত কথা বলি।
তাই বুঝি?
ড্রইংরুমে বসার পর মিশ্র বললেন, অমলা মারা গেলেও হারিয়ে যায়নি আমার জীবন থেকে, মন থেকে। কথা না বলে থাকব কেমন করে বলো?
হঠাৎ মিশ্র পাল্টে গেলেন। যাকগে, ওই হতচ্ছাড়ী বোকা মেয়েটার কথা বলতে গেলেও আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাদ দাও ওসব। গিভ মী এ গ্লাস অফ স্কচ।
দু গেলাস স্কচ নিয়ে এলো তরুণ।
মিশ্র স্কচের গেলাসটা তুলে ধরে বললেন, ফর অ্যান আর্লি অ্যান্ড হ্যাপি রি-ইউনিয়ন অফ। টরুণ উইথ হিজ ইট্যারনল লাভার ইন্দ্রাণী!
হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল। সেন্টার টেবিলে গেলাসটা নামিয়ে রেখে তরুণ এগিয়ে গিয়ে টেলিফোনটা তুলে ধরে বলল, সেনগুপ্টা হিয়ার।…কে? মালকানী? ইয়েস, খবর কি?
মালকানীর কথা শুনে তরুণ বলল, এক্ষুনি মেসেজ এলো? দ্যাটস অল? থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।
টেলিফোন নামিয়ে রেখেই তরুণ মিশ্রকে জানাল, মালকানী জানাল এক্ষুনি মেসেজ এসেছে আমাকে বার্লিনে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
মিশ্রও গেলাসটা নামিয়ে রাখলেন। তাহলে তুমি চললে!
তরুণ দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে কি যেন ভাবছিল।
এমার্সনের Conduct of Life পড়েছে তো নিশ্চয়ই। মনে পড়ে সেই লাইনটা?
তরুণ জবাব দেয় না, চুপ করে বসেই রইল।
মিশ্রও উত্তরের অপেক্ষা না করে আপন মনে আবৃত্তি করল,
He who has a thousand friends
has not a friend to spare.
একটু চুপ করে স্কচের গেলাসে এক চুমুক দিল! আমারও হয়েছে তাই।
এবার তরুণ একটু হেসে গেলাসটা তুলে নিল। এক চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল। এমার্সন তো ওমর খৈয়ামকে বেস করেই ওই কথা লিখেছেন। ওমর খৈয়ামের আরো কটা লাইন মনে পড়ছে–
মিশ্র কোনো কথা না বলে আবার এক চুমুক খেয়ে চেয়ে রইল তরুণের দিকে।
তরুণ আবৃত্তি করল :
The moving finger writes; and having writ
Moves on : not all our Piety nor Wit
Shall lure back to cancel half a line.
Nor, all our Tears wash our a Word of it.
ঠিক বলেছ তরুণ, ডিপ্লোম্যাট হয়েও স্বীকার করতে বাধ্য হই যে সব কিছুই যেন বিধির বিধান।
০৯. মেয়েদের বিয়ে ঠিক হবার পর
মেয়েদের বিয়ে ঠিক হবার পর আইবুড়ো ভাত খাওয়ান হয় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে। ইংরেজিতে যাকে বলে ফেয়ারওয়েল ডিনার আর কি! ডিপ্লোম্যাটদের আগমন ও নির্গমন উপলক্ষে অনেকটা আইবুড়ো ভাত অর্থাৎ নেমন্তন্ন খাওয়াবার প্রথা আছে। সহকর্মী ছাড়াও অন্যান্য মিশনের বন্ধুদের বাড়িতে খেতে হয় ও খাওয়াতে হয়। সমস্ত দেশের ফরেন। সার্ভিসেই এই প্রথা। ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসও কোনো ব্যতিক্রম নয়। সিনিয়র, জুনিয়র-কোনো লেভেলেই নয়।
আমাদের দেশের আই-এ-এস বা আই-পি-এস অফিসারদের মধ্যে এসব সৌজন্যের বালাই নেই। ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টরা বদলি হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওঁদের সহকর্মীরা। খুশি হন। সুতরাং ফেয়ারওয়েল ডিনারের প্রশ্ন নেই। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের বিতাড়িত বা পদত্যাগী মন্ত্রীকে বা কলকাতায় বিদায়ী পুলিশ কমিশনারকে কেউ ভালোবেসে ফেয়ারওয়েল ডিনার খাইয়েছেন বলে আজও শোনা যায়নি। আর যত ত্রুটি-বিচ্যুতিই থাক, ফরেন সার্ভিসে এই সৌজন্যের দৈন্য নেই। অ্যাম্বাসেডরকে রি-কল বা তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও সৌজন্যমূলক ফেয়ারওয়েল ডিনারের ব্যবস্থা হয়।
