মিশ্রের কথা শুনে মিসেস ব্যানার্জিও হেসে ফেলেন। তাহলে ভাই একটু দেখুন না। আবার তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে রীনাকে আনতে…।
তাতে ব্যানার্জি সাহেবের কি? সে তো আমার আর আপনার চিন্তা।
মিশ্র টেলিফোন নামিয়ে রেখে আর দেরি করলেন না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজির হলেন। ইউ এন-এ। গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে দেখলেন দুটি পরিচিত গাড়ি প্রায় পাশাপাশি রয়েছে। অ্যাম্বাসেডর সাহেবের ড্রাইভারটাও কোথাও আড্ডা দিতে গেছে। মিশ্র দুষ্টুমি করে এমনভাবে নিজের গাড়িটা পার্ক করলেন যে ওই দুটি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব! লিফট দিয়ে। উঠতে উঠতে যদি ওই দুজন সেন্টিমেন্টাল বাঙালি নেমে আসেন, তাহলে বুঝবেন, যার সুখ-দুঃখের ব্যালান্সসীট তৈরি করতে ওরা এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন সে এসে গেছে।
অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির ঘরের সামনে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে দাঁড়ালেন মিঃ মিশ্র। একবার ভাবলেন নক করবেন; আবার ভাবলেন, না-না, ওসব ফর্মালিটির কি দরকার।
আস্তে দরজাটা ঠেলে মিশ্র ভিতরে ঢুকতে দুজনেই অবাক!
অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি আর তরুণ প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, মিশ্র, ইউ আর হিয়ার?
হাসিমুখে মিশ্র জবাব দেয়, হোয়াট এলস কুড আই ডু?
একবার নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিশ্র অ্যাম্বাসেডর সাহেবকে বললেন, স্যার, মিসেস ব্যানার্জি বলছিলেন আপনাকে খাইয়ে-দাইয়ে তবে উনি এয়ারপোর্ট…।
ও, তাই তো!
তাড়াহুড়ো করে সবাই উঠে পড়লেন। নিচে এসে গাড়িতে উঠবার সময় মিঃ ব্যানার্জি বললেন, তোমরাও বরং আমার ওখানেই চল। হোয়াট এভার ইজ দেয়ার, উই উইল শেয়ার ইট।
মিশ্র হাসতে হাসতে বলেন, স্যার, রীনাকে যখন প্রায় আমাকেই দিয়ে দিয়েছেন তখন আর খাওয়া-দাওয়া শেয়ার করতে লজ্জা কি?
মিশ্র আর মিসেস ব্যানার্জি এয়ারপোর্টে হাজির হবার পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে অ্যানাউন্সমেন্ট হলো, বি-ও-এ-সি অ্যানাউসেস দি অ্যারাইভাল অফ ফ্লাইট সিক্স-জিরো-ওয়ান ফ্রম লন্ডন।
রীনা টিপ করে মাকে একটা প্রণাম করেই মিঃ মিশ্রকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি জানতাম আংকল, তুমি আসবেই!
রীনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মিশ্র উত্তর দিলেন, তোমরা যা এক-একটা বিচিত্র শত্রু! তোমাদের কি চোখের আড়ালে রাখা যায়?
রীনা আংকলের মাথাটা মুখের কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে কি যেন বলছে। মিশ্র একগাল হাসি হেসে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। ডোন্ট ওরি ডিয়ার ডার্লিং মামি!
মিসেস ব্যানার্জির মুখ খুশির আলোয় ভরে গেলেও একটু যেন বিরক্তির সুরে বললেন, আংকলকে বিরক্ত করা শুরু হলো, তাই না?
আংকল মনে মনে হাসেন। ভাবেন পৃথিবীর সব রীনারাই যদি ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে অমন আব্দার করত, তাহলে হয়তো অমলাকে…!
সেদিন রাতে মিশ্রের থার্টিটু স্ট্রিট ও ইস্টের ফ্ল্যাটে বিরাট উৎসবের আয়োজন হলে রীনার আনারে। অ্যাম্বাসেডর ও মিসেস ব্যানার্জি ছাড়াও ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের প্রায় সবাই এলেন।
নবাগত ইনফরমেশন অ্যাটাচি ভার্মা তরুণকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার, মিঃ মিশ্রর এমন ডিনারে কোনো ড্রিংকস নেই?
রীনার সামনে ড্রিংক করেন না।
কেন?
বলেন মেয়েদের সামনে ড্রিংক করা উচিত না তাছাড়া…।
তাছাড়া কি?
তাছাড়া বলেন, রীনাকে কাছে পেলে ওঁর কোনো দুঃখ থাকে না, সুতরাং ড্রিংক করবেন কেন?
এত বিরাট ব্যাপক আয়োজন। তরুণ খাবে কি? শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখে মিশ্রকে। কপালের সেই চিন্তার রেখাগুলো কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে, ক্লান্ত মানুষটির বিষণ্ণ শূন্য দৃষ্টি যেন আর নেই। কাজকর্মের পর যে মিশ্র রোজ সন্ধ্যার পর নিজেকে ভুলে যান, স্থবির হয়ে বসে বসে শুধু বোতল বোতল মদ গেলেন, তিনি যেন নবযৌবন ফিরে পেয়েছেন। কত চঞ্চল, কত প্রাণবন্ত! কত সুন্দর, কত প্রিয়।
তরুণ এগিয়ে গেল অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির কাছে। স্যার, আপনি বাড়ি যাবেন না? রাত্রেই তো সব পেপার্স ঠিকঠাক করে রাখতে হবে, নয়তো কাল যাবেন কি করে?
যাব কি, এখনও খাওয়াই হয়নি।
সে কি?
আজ কি আমাকে দেখার সময় আছে মিশ্রের? অ্যাম্বাসেডর হাসতে হাসতেই বললেন।
তরুণও হাসে। তা ঠিকই বলেছেন স্যার। রীনাকে কাছে পেলে উনি প্রায় পাগল হয়ে ওঠেন।
একটা ছোট্ট চাপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন অ্যাম্বাসেডর। তারপর বললেন, রীনাকে নিয়ে ওঁর মাতামাতি দেখতে বেশ লাগে। জান তরুণ, নিজের স্ত্রীকে, নিজের সন্তানকে তো সবাই ভালোবাসে। কিন্তু যখন আর পাঁচজনে ওদের ভালোবাসে তখনই তো সত্যিকার সার্থকতা।
তরুণ কোনো জবাব দেয় না। অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির হৃদয়বত্তা মুগ্ধ করে ওকে।
তাছাড়া আর একটা দিক আছে। যারা অন্যের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে ভক্তি করে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, স্নেহ করে, তাদের মহত্ত্বের কি তুলনা হয়?
ডিসআর্মামেন্ট কন্ট্রোল কমিশনের অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য মিঃ ব্যানার্জি পরের দিন জেনেভা চলে গেলেন।
রীনার পনের দিনের ছুটি ফুরোতেও সময় লাগল না। মিশ্র আবার ফিরে পেলেন তার পুরনো দিনের যন্ত্রণা আর মদের বোতল। তরুণ ফিরে পেল তার ছন্দহীন জীবন।
পনেরটা দিন তরুণ শুধু দেখেছে মিশ্রের পাগলামি, আত্মভোলা মানুষটির অন্ধ স্নেহ। মনে মনে ভক্তি করেছে, শ্রদ্ধা করেছে ওই মাতালটিকে, যাকে একদল ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস বলে ডিবচ, স্কাউড্রেল এবং আরো কত কি!
