অ্যাম্বাসেডর রঘুবীরের জীবন-সঙ্গিনীর আদরের ছোট ভাইও খবরের কাগজের ওই ভিতরের পাতার পাঠক ছিলেন। ভাগ্যবান ছোট শালাবাবু জিজাজীর কাছে একবার আব্দার করেছিলেন, ইন্দো-জার্মান ট্রেডের কিছু একটা পাওয়া যায় না?
হোয়াই নট? একটু মনে করিয়ে দেবার জন্য দিদিকে বলে দিও।
রাইন নদীর জলে ওয়াটার জেট লঞ্চে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে দূরের কারখানার চিমনিগুলো চোখে পড়তেই মিসেস রঘুবীর স্বামীকে বলেছিলেন, তোমার মনে আছে আমার ওই ছোট্ট ভাইয়ের কথা?
হাঁ জী।
কদিন বাদেই বিখ্যাত এক জার্মান ফার্ম থেকে কোয়েরি এলো, মিলিয়ন মিলিয়ন মার্ক-এর মেসিনারী ইন্ডিয়াতে পাঠাতে হবে কিন্তু আমরা অফিস খুলব না, রেসিডেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভ ও এজেন্সী দিতে চাই।
এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে পাইপটা নামিয়ে রাখলেন রঘুবীর। তারপর বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন, এত বড় ব্যাপার, আমাকে একটু ভাবতে হবে।
বেশ তো ভাবুন না। তবে দেখবেন ওই ফার্ম যেন আর কোনো ফেমাস ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের কাজ না করে।
অ্যাম্বাসেডর হাসতে হাসতে বললেন, ইউ আর মেকিং মাই টাস্ক মোর ডিফিকাল্ট? ইওর এক্সেলেন্সি অ্যাম্বাসেডর্স আর নট ফর অর্ডিনারী…। এক সপ্তাহ পরে তাগিদ এলো অ্যাম্বাসেডরের কাছে। জবাব গেল ইন্ডিয়াতে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।
তিন সপ্তাহ পরে অ্যাম্বাসেডর রঘুবীর রেকমেন্ড করলেন জলন্ধরের ছোট শালার ফার্মকে।
ফরেন সার্ভিসের দুচারজন বিশ্বনিন্দুক বলেন, ছোট শালাবাবু গুরু দক্ষিণাস্বরূপ জামাইবাবুকে দিল্লিতে ফ্রেন্ডস কলোনীর একটা আড়াই লাখ টাকার কটেজ উপহার দিয়েছেন।
রঘুবীরের মতো আরো অনেক আদর্শহীন বীর আছেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসে। অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি একটু ভিন্ন ধাতুতে গড়া। টেবিলে যদি ফাইলের স্তূপ না থাকে তবে সহকর্মীদের নিয়ে বৈঠক জমান নিজের ঘরে। নানা কথার পর থার্ড সেক্রেটারি হঠাৎ বলে ওঠেন, স্যার, আপনার মতো সহজ সরল মানুষ ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাসিতে যে কিভাবে সাকসেসফুল হলেন, তাই ভেবে অবাক হই।
হাসতে হাসতে অ্যাম্বাসেডর জবাব দেন, ভেরী সিম্পল রঙ্গস্বামী।
To Thomas Moore-এ ব্যায়রন বলেছেন,
Heres a sigh to those who love me,
And a smile to those who hate,
And, whatever skys above me,
Heres a heart for any fate.
আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–
নিজেরে করিতে গৌরবদান
নিজেরে কেবলই করি অপমান
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।
এই হচ্ছে ব্যানার্জি সাহেবের জীবন দর্শন। দৃষ্টিটা একটু সুদূরপ্রসারী! তাই তো মিশ্র সাহেবের মাতলামীর পিছনে তার অশান্ত স্নেহকাতর পিতৃ হৃদয়টাই ওঁর চোখে পড়ে।
জান তরুণ, এর চাইতে বড় সর্বনাশ, বড় ট্র্যাজেডি মানুষের জীবনে আর নেই। শিশুর জন্মের পর মায়ের বুক স্তন্যরসে ভরে যায়। কিন্তু ভাগ্যের দুর্বিপাকে যদি সে শিশু মায়ের কোল খালি করে হঠাৎ চিরকালের জন্য লুকিয়ে পড়ে তবে ওই বুকের যন্ত্রণায় মা পাগল হয়ে ওঠেন।
এবার মুখটা উঁচু করে মিঃ ব্যানার্জি বলেন, ওটা শুধু দেহের যন্ত্রণা নয়, ওর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যর্থ মাতৃত্বের বেদনা।
তরুণ কথা বলতে পারে না। শুধু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির দিকে। ইস্টার-সেশন পিরিয়ডে নেশনস্ হেড কোয়ার্টাসে বেশি ভিড় থাকে না। এমন কি ওই ছোট্ট ক্যাফেটেরিয়াটাও যেন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যায়। অধিকাংশ দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি-অ্যাম্বাসেডররা হয় ছুটিতে না হয় বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। জুনিয়র ডিপ্লোম্যাটরাও একটু ঢিলে দেন কাজকর্মে।
সেদিন সকালে ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলের একটা ছোট্ট সাব-কমিটির মিটিং ছিল। আধ ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে অত বিরাট ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টারটা প্রায় খালি হয়ে গেল। আট তলায় ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের ঘরে মিঃ ব্যানার্জি আর তরুণ বসে কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নোংরামি থেকে হঠাৎ যেন। ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টার্স একেবারে মুক্ত হয়ে গেছে। তাই তো মনের কথা, প্রাণের ভাষা বলতে পারছিলেন অ্যাম্বাসেডর সাহেব।
দৃষ্টিটা হাডসন নদীর এপার-ওপার দিয়ে ঘুরিয়ে এনে নীল আকাশের কোলে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন মিঃ ব্যানার্জি। রিভলভিং চেয়ারটা নাড়তে নাড়তে বললেন, মিশ্রকে দেখলে বড় কষ্ট হয়। রীনাকে কাছে পেলে ওর মনের শূন্যতা, ব্যর্থ পিতৃত্বের জ্বালা যেন আমাকে আরো বেশি আপসেট করে দেয়।
মিসেস ব্যানার্জি ভাবতে পারেননি ব্যানার্জি সাহেব এখনও ইউ এন-এ আছেন। তরুণের ফ্ল্যাটে ফোন করে জবাব না পেয়ে ভাবলেন নিশ্চয়ই ওরা দুজনে কোনো জরুরী কাজে আটকে পড়েছেন। ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়েই এয়ারপোর্ট রওনা হতে হবে। তাই তো মিশ্রকে ফোন করলেন। ভাইসাব, ব্যানার্জি সাহেবের কি খবর বলো তো?
কেন এখনও ফেরেননি?
না। কোনো জরুরী কাজে গিয়েছেন কি?
তেমন কোনো জরুরী কাজের কথা তো আমি জানি না। আচ্ছা একবার তরুণকে ফোন করছি।
তরুণও বাড়িতে নেই…। মিসেস ব্যানার্জির কথা শেষ হবার আগেই মিঃ মিশ্র বললেন, দেন ডোন্ট ওরি। দুজন সেন্টিমেন্টাল বেঙ্গলী ঠিক কোথাও বসে আকাশ দেখছেন, না হয় আমার দুঃখের ব্যালান্স-সীট মেলাচ্ছেন।
