অ্যাম্বাসেডর খুশিতে হেসে ফেললেন। দ্যাটস রাইট। আমি তো আবার পরশু দিনই জেনেভা যাচ্ছি। সুতরাং ভুলে যেও না টু টেক কেয়ার অফ দ্যাট গার্ল।
নো স্যার, নট অ্যাট অল। মিশ্র এবার একটু মুচকি হাসতে হাসতে বলেন, ইফ আই মে সে ফ্রাঙ্কলি স্যার, রীনা আপনার চাইতে আমাকে বেশি পছন্দ করে।…
অ্যাম্বাসেডর তরুণের কানে কানে বললেন, প্লিজ টেল মিশ্র যে আমি তার জন্য আনন্দিত।
আর কোনো কথা না বলে অ্যাম্বাসেডর বিদায় নিলেন। গুড় নাইট! সী ইউ টুমরো।
গুড নাইট স্যার।
০৮. কবি রবার্ট ফ্রস্ট রসিক ছিলেন
কবি রবার্ট ফ্রস্ট রসিক ছিলেন। কবির মতে ডিপ্লোম্যাটরা মহিলাদের জন্মদিন মনে রাখেন, ভুলে যান তাদের বয়স। জন্মদিনের ওই আনন্দটুকু, ওই রসটুকুই কূটনীতিবিদদের প্রয়োজন; কালের যাত্রায় বিলীয়মান যৌবনের হিসাব রাখতে তাদের আগ্রহ নেই।
ডিপ্লোম্যাট হয়েও অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি মহিলাদের জন্মদিনই মনে রাখেন না, স্মরণ রাখেন তাদের বয়স। বিলীয়মান যৌবনের হিসাব। শুধু আনন্দ, শুধু রস, শুধু মধু পান করেই উনি নিজের মনকে খুশি রাখতে পারেন না। বেদনাবিধুর আবছা অন্ধকার মনের কথাও তিনি জানতে চান।
হঠাৎ দেখলে ঠিক টপ কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট বলে মেনে নিতে মন চায় না। আর পাঁচজন ডিপ্লোম্যাটের মতো চাকচিক্য স্মার্টনেস, গ্ল্যামার একেবারেই নেই। মাথায় টপ হ্যাঁট বা হাতে লম্বা সরু ছাতা না থাকলেও পরনে পুরনো কালের ইংরেজদের মতো ঢিলেঢালা থ্রি-পিস্ স্যুট। সিলভার চেন-এর সঙ্গে মোটা পকেট ওয়াছ না ব্যবহার করলেও অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জিকে অনেকটা কেম্ব্রিজের বিখ্যাত সেলউইন কলেজের ওরিয়েন্টাল অধ্যাপক মনে হয়।
সবাই যে অ্যাম্বাসেডর রঘুবীর হবেন তার কি মনে আছে? ভরা যৌবনে আই. সি. এস. হয়ে দেশে ফেরার বছরখানেকের মধ্যেই রঘুবীর দেরাদুনের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হলেন। মাস ছয়েক ঘুরতে না ঘুরতে লাহোরের স্যার বীরেন্দ্রবীরের পুত্র রঘুবীর প্রভুভক্তির অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। গান্ধীজি ও সঙ্গীদের টিল দি কোর্ট রাইজ পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন।
ঘটনাটা নেহাতই সামান্য। তবু এমন সুযোগ তো বার বার আসে না! মীরাট থেকে মজঃফরনগর, রুরকি, দেরাদুন হয়ে গান্ধীজি মোটরে মুসৌরী যাচ্ছিলেন। মীরাট আর মজঃফরনগরে মিটিং ছিল কিন্তু রুরকি বা দেরাদুনে কোনো প্রোগ্রাম ছিল না। তবে অভ্যর্থনার জন্য দেরাদুন শহরের ধারে বেশ ভিড় হয়েছিল।
রঘুবীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রিপোর্ট পাঠালেন, দেরাদুন শহরে মিলিটারি অ্যাকাডেমির ছেলেরা হরদম ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাইচান্স গান্ধীজি যদি ক্লক টাওয়ারের পাশ দিয়ে যাবার সময় বক্তৃতা দিতে শুরু করেন তবে মিলিটারি অ্যাকাডেমির ছাত্ররাও নিশ্চয়ই…। তাছাড়া যেমন অভ্যর্থনার উদ্যোগ আয়োজন হচ্ছে তাতে রিস্ক না নেওয়াই ঠিক হবে।
সুতরাং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টম জোনস্ সাহেবের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রঘুবীর আদেশ জারী করলেন, মিঃ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ইজ হিয়ারবাই নোটিফায়েড দ্যাট ইন দি ইন্টারেস্ট অফ সিকিউরিটি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যান্ড ল অ্যান্ড অর্ডার ইন দি রিজিয়ন, আপনি ও আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা দেরাদুন শহরে যাবেন না।
দেরাদুন শহরের প্রান্তে কয়েকশো দেশি-বিদেশি সিপাহি নিয়ে রঘুবীর মহাত্মাজীকে অভ্যর্থনা জানালেন।
গাড়ি থেকে নেমে একটু মুচকি হেসে গান্ধীজি বললেন, কত দিনের জন্য অতিথি হতে হবে?
রঘুবীর জানালেন, না না, ওসব কিছু না। তবে স্যার, দেরাদুন শহরটা এড়িয়ে যান।
গান্ধীজি আইনজীবীর মতো পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনার মহামান্য সরকার মুসৌরী যাবার জন্য নতুন কোনো রাস্তা তৈরি করছেন নাকি?
নো স্যার, দিস ইজ দি ওনলি রোড টু মুসৌরী।
তবে কি আমি উড়োজাহাজ…।
গান্ধীজি দলবল নিয়ে এগিয়ে যেতেই রঘুবীর গ্রেপ্তার করে কোর্টে নিয়ে গেলেন। বিচারে টিল দি কোর্ট রাইজ…
সেই রঘুবীর স্বাধীন ভারতবর্ষের অ্যাম্বাসেডর হয়ে আমেরিকায় গিয়ে বললেন, তোমাদের আব্রাহাম লিঙ্কন আর আমাদের গান্ধীজি বিশ্বমানব-সমাজের মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত। ইতালীতে অ্যাম্বাসেডর হবার পর ভ্যাটিকান-প্রধান পোপের কাছে পরিচয়পত্র দেবার সময়। বললেন, ত্রাণকর্তা যীশুকে আমি দেখিনি। কিন্তু ভারত-ত্রাণকর্তা মহাত্মা গান্ধীকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এই মহামানবের জীবন ও বাণীর মধ্য দিয়ে আমি মহাপ্রাণ যীশুকে উপলব্ধি করেছি।
রঘুবীর সাহেব অ্যাম্বাসেডর হয়ে নানাভাবে দেশসেবা করেছেন। পশ্চিম জার্মানীর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। আমরা বাঙালিরা বড়বাজার-পোস্তার হোলসেলার দেখেই কুপোকাৎ। সুতরাং জার্মান-ভারতের সে বাণিজ্য চুক্তির হিসেব রাখাই আমাদের পক্ষে দায়। একশো পঁয়ত্রিশ বেসিকের কেরানী বা একশো পঁচাত্তরের লেকচারার হয়েই মাটির পৃথিবী থেকে যাদের উদাস দৃষ্টি নীল আকাশের কোলে উড়ে যায়, তাদের পক্ষে কি শত শত সহস্র কোটি টাকার বিজনেসের অনুমান করা সম্ভব? ওঁরা বলেন মিলিয়ন, বিলিয়ন। বাঙালি ইন্টেলেকচুয়ালরা খবরের কাগজের প্রথম পাতা পড়েই গরম হন। কিন্তু যাঁরা ওই মিলিয়নের-বিলিয়নের প্রসাদ পান তারা খবরের কাগজের প্রথম পাতার চাইতে ভিতরের পাতার স্টক এক্সচেঞ্জ ও কোম্পানি মিটিং-এর রিপোর্ট বেশি পড়েন।
