যে সমস্যার কথা কাউকে বলা যায় না, মিশ্র সাহেবকে হাসিমুখে সে কথা বলা যায়; যে সমস্যার সমাধান করতে আর কেউ পারবেন না, তাও মিশ্র সাহেব হাসতে হাসতে ঠিক করে দেবেন। সন্ধ্যার পর হুইস্কি না খেয়ে যেমন তিনি থাকতে পারেন না, তেমনি সহকর্মী ও বন্ধুদের উপকার না করেও স্থির থাকতে পারেন না।
লাঞ্চের পর অফিসে এসেই মিশ্র টেলিফোনের বাজার বাজিয়ে হীরালালকে তলব করলেন, চলে আসুন।
মিশ্র তখনও সিগারেট খাচ্ছেন। তিন-চারটে ফাইল নিয়ে হীরালাল ঘরে ঢুকতেই কেমন যেন খটকা লাগল।–কুঁচকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখতেই বুঝলেন হীরালাল বেশ চিন্তিত।
হীরালাল মিশ্র সাহেবের সামনে ফাইলগুলো নামিয়ে রাখলেন।
মিঃ মিশ্র সিগারেটের শেষ টানটা দিতে দিতে বাঁকা চোখে আরেকবার হীরালালকে দেখে নিয়ে বললেন, কি হয়েছে তোমার?
না স্যার, তেমন কিছু না।
দেখ হীরালাল, আমার কাছে বলতেও তোমার দ্বিধা হয়?
সকৃতজ্ঞ হীরালাল বলে, আপনার কাছে আর কি দ্বিধা করব। তবে…।
তবে আবার কি? টেল মি ফ্র্যাঙ্কলি হোয়া রং উইথ ইউ?
হীরালাল আর চেপে রাখতে সাহস করে না। জানে এবার না বললে বকুনি খাবে।
কালকেই চিঠি পেয়েছি আবার মেয়েটার শরীর খারাপ হয়েছে, অথচ…।
আপনি তো জানেন আমার ডিক্সনারিতে ইফস্ অ্যান্ড বাট লেখা নেই।
ড্রয়ার থেকে বার্কলে ব্যাঙ্কের চেক বই বের করে একশো পাউন্ডের একটা চেক দিলেন হীরালালকে। পাতিয়ালার ওই অপদার্থ শ্বশুরবাড়িতে মেয়েটাকে আর ফেলে না রেখে এখানেই নিয়ে আসুন।
আপনি আবার…।
ফরেন সার্ভিসে কাজ করে বড় বেশি ফরম্যালিটি করতে শুরু করেছেন। আচ্ছা, আজ যদি আমারই দুতিনটে মেয়ে থাকত?
এরপর কি আর কিছু বলা যায়? না। হীরালাল টেবিলের ওপর ফাইলগুলো রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল!…
কি বললে? ব্যাভেরিয়ান বিয়ার খেতে ইচ্ছা করছে?
তারপর ওই তাজ-এ একটু সিম্পল চিকেন রাইস-এর লাঞ্চ, ছোঁকরা ডিপ্লোম্যাট বড়ুয়া আর্জি পেশ করে।
দ্যাখ ছোঁকরা, তুমি তো জান আমি ডিসআর্মামেন্ট-সামিট-বিগ পাওয়ার রিলেশান্স ডিল করি। সুতরাং এত ছোটখাটো সামান্য বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে আমার কাছে এসো না।
প্রাইমিনিস্টার, ফরেন মিনিস্টার, ফরেন সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ক্লার্ক বেয়ারারা পর্যন্ত মিশ্রকে ভালোবাসে। ভালো না বেসে যে উপায় নেই।
সেই মিশ্র সাহেবের আদুরে দুলালী অমলা আত্মহত্যা করেছে শুনে সবাই মর্মাহত হলেন।
বছর খানেক পরে তরুণ মিঃ মিশ্রকে দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না। সন্ধ্যার পর বোতল বোতল মদ গেলেন আর ইয়ং ইন্ডিয়ান মেয়ে দেখলেই বলেন, মনে হয় অমলাও ওদের মতো কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক্ষুনি দৌড়তে দৌড়তে ফিরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে।
অমলা তখন আট-ন বছরের হবে আর কি। মিসেস মিশ্র মারা গেলেন ক্যান্সারে। বহুদিন ধরেই ভুগছিলেন। বিশেষ করে শেষের বছর দুয়েক অমলার সব কিছুই মিশ্র সাহেব করতেন। স্ত্রী মারা যাবার পর মুষড়ে পড়লেও অমলাকে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।
দেখতে দেখতে অমলা বড় হলো। সেই ছোট্ট কিশোরী অবলা অমলা প্রাণ-চঞ্চলা হয়ে উঠল। দিগন্তবিস্তৃত অতল সমুদ্রের এই ছোট্ট দ্বীপে স্বপ্নের প্রাসাদ গড়ে তুললেন মিশ্র সাহেব।
ঘরে কোনো ভাইবোন-মাকে না পেয়ে সাহচর্যের জন্য অমলা বাইরের দুনিয়ায় তাকিয়েছিল। কত ছেলে, কত মেয়ে ছিল তার বন্ধু। মিঃ মিশ্র বাধা দেননি, বরং উৎসাহ দিতেন। কিন্তু সাহচর্য, বন্ধুত্বের সুযোগ এমন সর্বনাশ!
হ্যাঁ হ্যাঁ তরুণ, ওই ছোঁকরাগুলো দেহের আগুন, যৌবনের জ্বালা, চোখের নেশা চরিতার্থ করার জন্য যদি অমলার মতো ওই যশোদারও চরম সর্বনাশ করে? যদি নিজের লজ্জা লুকোবার জন্য অমলার মতো যশোদাও যদি…।
আর বলতে পারেন না। কাঁপা কাঁপা হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরেন তরুণকে। ছলছল চোখ দুটো জলে ভরে যায়।
একটা বিরাট দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেন, এই বিশ-বাইশ বছরের মেয়েগুলোকে সুন্দর শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ঘুরতে দেখলেই কেবল অমলার কথা মনে হয়।
তরুণ কি জবাব দেবে? কিচ্ছু বলতে পারে না। একটু সন্তানম্নেহ দেবার জন্য এমন কাঙালকে কি বলবে সে? মায়ের কোল খালি করে শিশু সন্তান চলে গেলে সে মা উন্মাদিনী হয়ে ওঠে। মিশ্র সাহেবের মনের মধ্যে অমনি জ্বালা করে দিন-রাত্তির চব্বিশ ঘণ্টা।
আচ্ছা তরুণ, অনেকে তো অন্যের মাকে মা বলে ডাকে, অন্যের বাবাকে বাবা ডাকা যায় না?
এবার তরুণের দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে। আর যেন সে সহ্য করতে পারছে না। শুধু বলে, নিশ্চয়ই ডাকা যায়।
হাসিতে লুটিয়ে পড়েন মিশ্র। ডোন্ট টক ননসেন্স তরুণ। তুমি কি ভেবেছ আমি মাতাল হয়েছি? যা বোঝাবে তাই বুঝব?
ইউ-টু ফ্লাইট, প্যারিস সামিট ও তারপর ইউনাইটেড নেশনস নিয়ে এতদিন ব্যস্ত থাকায় বেশ ভালো ছিলেন মিঃ মিশ্র। একটু অবসর পেয়ে আবার সব অতীত ভিড় করছে ওর কাছে।
পার্টি শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। প্রায় সবাই চলে গেছেন। এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিশ্র তরুণের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন।
ধীরে ধীরে অ্যাম্বাসেডর এসে পাশে দাঁড়ালেন। মিশ্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন, কাল কত তারিখ মনে আছে?
টুমরো ইজ টোয়েন্টি সেকেন্ড।
কাল আমার মেয়ে আসছে, তা জান?
সিওর স্যার। বি-ও-এ-সি ফ্লাইট সিক্স-জিরো-ওয়ান।
