তারপর সত্যি একদিন এরোফ্লোটের ইলুসিন চড়ে কুশ্চভ এলেন নিউইয়র্ক, এলেন এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাতিন আমেরিকা থেকে আরো অনেকে। মার্কিন ডিপ্লোম্যাসির রাহুর দশা যেন শেষ হয় না।
ডিপ্লোম্যাট ও সাংবাদিকদের অনেক বিনিদ্র রজনী যাপনের পর এরোফ্লোটের ইসিন আবার জুশ্চভকে নিয়ে নিউইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের মাটি ছেড়ে আকাশে উড়ল। উড়ল আরো অনেক বিমান। বিদায় নিলেন এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাতিন আমেরিকান নেতৃবৃন্দ।
অনেক দিন পর ডিপ্লোম্যাটরা একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন।
মিশ্র, আর খেও না!
প্লিজ ডোন্ট স্টপ মি টু-নাইট। আই মাস্ট ড্রিংক লাইক ফিস।
ইন্ডিয়ান মিশনের তিন তলার রিসেপশন হলের জানলা দিয়ে মিশ্র একবার বাইরের আকাশটা দেখে নিয়ে তরুণকে বলল, ইজিপশিয়ান গার্ডেনে নাচ দেখতে যাবে?
এত ড্রিংক করার পর কি ইজিপশিয়ান গার্ডেনের বেলি ড্যান্সারদের বেলি দেখার অবস্থা থাকবে?
আই অ্যাম নট এ পিউরিটান লাইক ইউ।
তবু…।
ওই তবু টুব ছেড়ে দাও। আমি তো তুমি নই যে কবে কোনোকালে এক মেয়ের প্রেমে পড়েছি বলে আর কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাব না?
অ্যাম্বাসেডর এদিকে ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে মিশ্রের পাশে এসে হাজির হয়ে প্রশ্ন করলেন, মিশ্র আর ইউ হ্যাপি?
গেলাসের বাকি স্কচটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে মিশ্র জবাব দিলেন, সো কাইন্ড অফ ইউ স্যার! লাইফে আপনার মতো বস আর স্কচ হুইস্কি পেলে আমি আর কিছু চাই না।
ইন্ডিয়া শো-রুমের মিস মাজিথিয়াকে প্রায় পাশে আবিষ্কার করতেই অ্যাম্বাসেডর সরে গেলেন।
মিশ্র এগিয়ে এলেন, হাউ আর ইউ ডিয়ার ডার্লিং সুইটহার্ট?
বাঁ চোখটা একটু ছোট করে, ডান চোখে একটু ঈষৎ দুষ্টু ইঙ্গিত ফুটিয়ে মিস মাজিথিয়া বললেন, ডোন্ট বি সিলি ইউ নটি বয়!
সুইট ডার্লিং, স্কচ পেলে দুনিয়া ভুলে যাই, আর তোমাকে পেলে স্কচও ভুলে যাই।
মিস মাজিথিয়া তরুণকে বললেন, ডু ইউ বিলিভ হিম, মিস্টার সেনগুপ্ত?
সার্টেনলি আই বিলিভ মাই কলিগ। তরুণ হাসতে হাসতে উত্তর দেয়।
এত বিশ্বাস করবেন না, বিপদে পড়বেন।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় তরুণ, যেমন আপনি বিপদে পড়েছেন, তাই না?
হাসতে হাসতে বললেও বিদ্রূপটা কাজে লাগে। মিস মাজিথিয়া স্কচ হুইস্কির গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ভিড়ের মধ্যে মিশে যান।
মিস মাজিথিয়াকে অমনভাবে পালিয়ে যেতে দেখে তরুণ না হেসে পারে না। মিশ্রকে নিয়ে নেপথ্যে অনেক আলোচনা, সমালোচনা হয়। কোনো আড্ডাখানায় নিউইয়র্কবাসী দুপাঁচজন ভারতীয় এক হলেই মিশ্রের নিন্দা হবেই। কিছু হাফ বেকার-হাফ এমপ্লয়েড ছোঁকরা তো রেগে বলেই ফেলে, স্কাউড্রেল, ডিবচ, ড্রাংকার্ড।
বলবে না? মিশ্র যে মেয়েদের সাবধান করে সতর্ক করে দেন ওইসব নোংরা ছেলেগুলো সম্পর্কে। মিস যোশী, ইউ আর এ গ্রোন আপ গার্ল। লেখাপড়াও শিখেছ, কিন্তু জীবন সম্পর্কে তোমার চাইতে আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। একটু সাবধানে থেকো।
মিস যোশী শুধু বলেছিল, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।
তখন বয়সটাই এমন যে কারুর উপদেশ শুনতে মন চায় না। আগ্নেয়গিরির মতো দেহের মধ্যে যৌবনের আগুন লুকিয়ে লুকিয়ে টগবগ করে ফুটছে। ফিফথ অ্যাভিনিউ আর টাইমস স্কোয়ারে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে আগ্নেয়গিরি যেন আর শাসন মানতে চায় না, অধিকাংশ মেয়েরা সে শাসন মানেও না। সে শাসন মানবে কেন? ফিফথ অ্যাভিনিউ-টাইম স্কোয়ার দিয়ে সন্ধ্যার আমেজী পরিবেশে একটু ধীর পদক্ষেপে মিস যশোদা যোশীর মতো মেয়েরা যখন ঘুরে বেড়ায়, তখন কে যেন বার বার কানে কানে ফিস্ ফিস্ করে বলে, বিশ্ব সংসারে এসেছ দুদিনের জন্য। আনন্দ কর, উপভোগ কর। চারিদিকে তাকিয়ে দেখ তোমার মতো মেয়েরা কিভাবে রসের মেলায় পরিণী হয়ে…!
মিশ্রের উপদেশ বেসুরো ঠেকে যশোদার কানে। তবুও যে সে শুনেছে, তার জন্যই মিশ্র কৃতজ্ঞ। যশোদা তো অপমান করেও বলতে পারত, আমি কি করি বা না করি সেটা না অফ ইওর বিজনেস।
ঘরপোড়া গরু যে সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়! মিশ্রও তাই তো এসব মেয়েরা বিদেশে এসে এমন স্বচ্ছন্দ হয়ে ছেলেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করলে ভয় পায়।
.
জান তরুণ, কাল রাত্রে চৌবের বাড়ি থেকে আমার ফিরতে ফিরতে রাত দেড়টা-দুটো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ খেয়াল হলো সিগারেট নেই। টাইমস্ স্কোয়ারের কাছে গাড়ি পার্ক করে সিগারেট কেনার জন্য দু পা এগিয়েই দেখি দ্যাট স্কাউড্রেল মালহোত্রার সঙ্গে যশোদা…।
তরুণ বলল, ওদের নিয়ে তুমি অত ভাববে না।
বোতলখানেক হুইস্কি খেয়েও মিশ্র বেহুশ হয় না। একবার মাথা নিচু করে কি যেন ভাবেন। না ভেবে যে থাকতে পারি না তাই। ওদের দেখলেই যে আমার অমলার কথা মনে হয়।
হাতের গেলাসটা নামিয়ে রেখে মিশ্র পাথরের মতো নিশ্ৰুপ নিশ্চল হয়ে বসে পড়েন। চোখের জলও গড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
তরুণের মনে পড়ল সেই পুরনো দিনের কথা…।
সেকশন অফিসার প্রকাশচন্দ্র প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে তরুণকে খবর দিল, জানেন স্যার, জেনেভা থেকে এক্ষুনি একটা মেসেজ এসেছে, মিশ্র সাহেবের মেয়ে সুইসাইড করেছে।
তরুণ চমকে ওঠে, হোয়াট আর ইউ সেইং? অমলা সুইসাইড করেছে?
পাঁচ হাজার মাইল দূরে ছিলেন মিশ্র। কিন্তু খবরটা ওয়েস্ট ইউরোপিয়ান ডেস্কে আসার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল দিল্লি মহারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘরে ঘরে। বাইরের দুনিয়ার লোক মিঃ মিশ্রকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবলেও ফরেন মিনিস্ট্রির সবাই তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, আপনজ্ঞান করে।
