সেই আশায় ও ভরসায় ৬ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জোর গলায় প্রচার করা হলো, সোভিয়েট আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো কথাই উঠতে পারে না।
সেই তেসরা মের ঘোষণার পর কুশ্চভ কদিন ধরে শুধু মুচকি মুচকি হাসলেন। সাতই মে আর সে হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। সুপ্রিম সোভিয়েটে বক্তৃতা দেবার সময় ইউ-টু বিমানের নাড়িনক্ষত্র জানিয়ে ঘোষণা করলেন, ফ্রান্সিস গ্রে জীবিত ও সোভিয়েট কারাগারে। ফ্রান্সিস গ্রে স্বীকারোক্তি করেছে যে, তার সঙ্গে প্রচুর টাকা, আত্মহত্যার সরঞ্জাম, সোনা, অস্ত্রশস্ত্র ও এক থলি ভর্তি ঘড়ি ও আংটি ছিল।
এই বক্তৃতার শেষে ক্রুশ্চভ নরওয়ে, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সতর্ক করে বললেন, যেসব দেশ থেকে এইসব গোয়েন্দা বিমান উড়বে, তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে।
মার্কিন সরকারকে কঠোরতম ভাষায় নিন্দা করলেও কুশ্চভ প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার সম্পর্কে একটুও কটু কথা বললেন না।
সারা দুনিয়ার ডিপ্লোম্যাটরা ক্রুশ্চভের এই রসিকতা ঠিক হয়তো ধরতে পারলেন না। সবাই ভাবলেন, হয়তো তেমন কিছু হবে না।
সাতই মে ওয়াশিংটন থেকে আবার বিবৃতি। প্রায় প্রত্যক্ষভাবেই তারা স্বীকার করলেন গোয়েন্দা বিমানের অভিযান কাহিনি-তবে ঠিক অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এবার শুধু ক্রেমলিনের নেতৃবৃন্দ নয়, সারা দুনিয়ার ডিপ্লোম্যাটরাও মুখ টিপে হাসতে শুরু করলেন। আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি তাহলে সরকারের বিনা অনুমতিতেই এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আর কোনো গত্যন্তর না থাকায় শেষ পর্যন্ত ইউ-টু ফ্লাইট সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব ঘোষণা করলেন এগারোই মে।
ওইদিন প্রায় একই সময়ে মস্কোর ফরেন করেসপনডেন্টদের কুশ্চভ নেমন্তন্ন করে ইউ-টু ফ্লাইটের যন্ত্রপাতি সাজ-সরঞ্জাম দেখালেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সাইক্লোন উঠল। আমেরিকার দুই দোস্ত-ফরাসি ও ব্রিটিশ সরকার ভাবল যে ওদের দেশের উপর দিয়েও নিশ্চয়ই অমনি গোয়েন্দা বিমান ঘুরে বেড়ায়। জ্ঞাতিশত্রু।
পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। কুশ্চভের ধমক খেয়ে নরওয়ে প্রতিবাদপত্র পাঠাল ওয়াশিংটনে। ব্ল্যাক সী-র এ-পারের তুরস্ক, প্রভুসেবা করতে গিয়ে বিপদের মুখোমুখি হবে ভাবতে পারেনি। মার্কিন সাহায্যে তুরস্ক বেঁচে আছে বলে নরওয়ের মতো প্রতিবাদও পাঠাতে পারল না ওয়াশিংটনে। ফাপরে পড়ল পাকিস্তান। আয়ুর খাঁ একই সঙ্গে কবছর দুধ আর তামাক খাচ্ছিলেন কিন্তু এবার কুশ্চভের ধমক খেয়ে তার পাতলুন ঢিলা হয়ে গেল।
কদিন পরই প্যারিস সামিট! দীর্ঘদিনের পৃথিবীব্যাপী প্রচেষ্টার পর বিশ্বের চার মহাশক্তি বিশ্ব সমস্যার সমাধানের আশায় কদিন পরই প্যারিসে বসবে। তারপর প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ক্রুশ্চভের আমন্ত্রণে যাবেন সোভিয়েট ইউনিয়ন। এমনি এক বিরাট সম্ভাবনাপূর্ণ মুহূর্তের ঠিক আগে অ্যালান ডালেস পাঠালেন ইউ-টু?
অভাবিত আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন চিন্তাশীল রাষ্ট্রনায়করা। সবার মুখে এক কথা, প্যারিস সামিট হবে তো? কুশ্চভ আসবেন তো?
শেষ পর্যন্ত ওরলি এয়ারপোর্টে এরোফ্লোটের স্পেশ্যাল প্লেন ল্যান্ড করল। হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন শুভ।
আঠারোই মে প্যারিসে সারা দুনিয়ার সাংবাদিকদের একটা গল্প শোনালেন কুশ্চভ।–ছেলেবেলায় বড় গরিব ছিলাম আমরা। আমরা দুঃখী মা একটু দুধ, একটু ক্ষীর অতি যত্নে লুকিয়ে রাখতেন আমাদের দেবার জন্যে। কোথা থেকে একটা বিড়াল এসে ওই দুধ ওই ক্ষীর একটু খেয়ে গেলে মা রাগে দুঃখে জ্বলে উঠতেন। শেষকালে বিড়ালটার মুণ্ডু ধরে ওই ক্ষীরের মধ্যে ঘষে দিতেন। কেন জানেন? বিড়ালটাকে শিক্ষা দেবার জন্য।
গল্পটা বলে ক্রুশ্চভ সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের দেশের মানুষের একটু দুধ, একটু ক্ষীর যে সব ছাবলা বিড়াল চুরি করে খেতে চায়, তাদের শিক্ষা দেবার জন্যে একটু নাক ঘষে দেব। আর কিছু নয়।
শীর্ষ সম্মেলন শুধু বর্জন করেই শান্ত হলেন না কুশ্চভ, প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারকে সোভিয়েট ইউনিয়ন ভ্রমণ করতে নিষেধ করলেন।
যত সহজে এসব ঘটনাগুলো খবরের কাগজের রিপোর্টাররা লিখতে পারেন, ডিপ্লোম্যাটদের পক্ষে ঠিক তত সহজে এর তালে তালে চলা সহজ নয়! যুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতির সেই স্মরণীয় দিনগুলিতে মস্কো, লন্ডন, প্যারিস, ওয়াশিংটন ও ইউনাইটেড নেশন্স্থিত ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটদের দিবারাত্র শুধু ওয়ারলেস ট্রান্সক্রিপ্টের ফাইল নিয়ে কাটাতে হয়েছে।
অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন এমন মহিলার সন্তান, ছেলে না মেয়ে, তা অনেক আধুনিক বৈজ্ঞানিক জানেন বলে দাবি করেন। কিন্তু রাশিয়া বা কুশ্চভের মনে কি আছে তা কেউ বলতে পারেন না। তবুও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য সোভিয়েট ইউনিয়ন ও ভারতবর্ষ প্রায় একই পথের পথিক। তাই তো দুনিয়ার নানা কোথা থেকে সম্ভাবিত সোভিয়েট পদক্ষেপ সম্পর্কে ভারতীয় দূতাবাসে ঘন ঘন তাগিদ।
বাইরের দুনিয়াকে না জানালেও মস্কো ও ইউনাইটেড নেশনস-এর ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটরা অনুমান করলেন, ক্রুশ্চভ ওইখানেই যবনিকা টানবেন না। নতুন রঙ্গমঞ্চে এবার নাটক শুরু হবে।
মস্কো ও ইউনাইটেড নেশনস থেকে ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটিক মিশন টপ সিক্রেট কোডেড় মেসেজ পাঠালেন দিল্লিতে। সতর্ক করে দেওয়া হলো সম্ভাবিত সোভিয়েটের পদক্ষেপ সম্পর্কে। দিল্লিতে ক্যাবিনেট ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে একবার ওই নোট নিয়ে আলোচনাও হলো। মোটামুটিভাবে ঠিক করা হলো বিশ্বশান্তির জন্য ক্রুশ্চভের আবেদন অগ্রাহ্য করার প্রশ্নই ওঠে না।
