আজ রাত্রেই?
ইয়েস স্যার।
একটা ব্রিটিশ নিউজ পেপারের রিপোর্টের ভিত্তিতে বহুগুণা সাহেবের কমিটি নিয়ে পার্লামেন্টে সর্ট নোটিশে কোশ্চেন টেবিল করেছেন আট-দশজন অপোজিশন এম-পি।
স্যার আমাদের হাই-কমিশনের একজন স্টাফকে সঙ্গে এনেছি। আপনি কাইন্ডলি ওকে আপনার রিপ্লাইটা ডিকটেট করে নিচে একটা সই করে দেবেন। উই উইল সেন্ড এ কেবল টু ডেলি!
এবার তরুণ বন্দনার দিকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়ত স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, এক্সকিউজ মি মিস বোস, চলুন আমাদের অফিস কারে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো।
বন্দনা সেদিন মনে মনে কোটি কোটি প্রণাম জানিয়েছিল ভগবানকে। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল তরুণকে।
সেই থেকে তরুণের প্রতি বন্দনার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস, শ্রদ্ধা। হয়তো ভালোবাসে। বন্দনা বুঝতে পারে তরুণ যেন কি খুঁজে বেড়াচ্ছে সারা দুনিয়ায়। ওর মতো এক সাধারণ মেয়ের দুটি চোখের ছোট্ট দুটি তারার মধ্য দিয়ে বিরাট এক দুনিয়া দেখছে। যেন ক্যামেরার ছোট্ট লেন্সের মধ্য দিয়ে সুন্দর অরণ্য-পর্বতের ছবি ভোলা। ক্যামেরাম্যান প্রকৃতির ওই অনন্য সৌন্দর্যকে বন্দী। করতে চায়, উপভোগ করতে চায় সর্বক্ষণ। তাই তো সে ক্যামেরার লেন্সকে যত্ন করে, ভালোবাসে। বন্দনা জানে সে শুধু ক্যামেরার লেন্সমাত্র, অপরূপ প্রকৃতি নয়।
তবু তার ভালো লাগে, তবু সে খুশি। তরুণ মাছ খেতে চাইলে সে এক পাউন্ড-দেড় পাউন্ড খরচা করে মাছ কেনে, মাংস কিনে কত যত্ন করে রান্না করে।
গ্যাসে মাছটা চাপিয়ে দিয়ে কোণার সোফাটায় বসে বন্দনা প্রশ্ন করে, একটা কথা বলবেন?
নিশ্চয়ই।
আপনি কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন?
কাকে আবার!
আপনি জানেন আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি বিশ্বাস করি আপনি মিথ্যা কথা বলেন না।
না, না, মিথ্যা বলব কেন? খুঁজি না কাউকে। তবে মনে পড়ে যায় অনেক দিন আগেকার কথা, ছেলেবেলার কথা, ছাত্রজীবনের কথা।
একটু নিবিড় হয়ে মিশলেই বেশ বোঝা যায় তরুণ যেন কারুর ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই পৃথিবীতে থেকেও সে যেন এক মহাশূন্যে বিচরণ করছে। পুরুষের চোখে। ধুলো দেওয়া যায়, কিন্তু মেয়েদের? অসম্ভব।
তরুণের জীবনের, মনের দুঃখের ইঙ্গিত পাবার জন্য বন্দনা যেন ওকে আরো ভালোবাসে।
তরুণও ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে বন্দনাকে। কি নিদারুণ পরিশ্রম করে মেয়েটা কটা বছরে সারা পরিবারকে রক্ষা করল।
দুটি বছরে দুজনে কত কাছে এলো।
বন্দনা, এবার তো আমার যাবার পালা।
তোমার ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেছে?
হ্যাঁ।
বন্দনা যেন বাকশক্তিটাও হারিয়ে ফেলল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
তরুণ একটু কাছে টেনে নেয় বন্দনাকে। মাথায় হাত দিয়ে বলে, আমার একটা কথা শুনবে বন্দনা?
নিশ্চয়ই।
তুমি একটা বিয়ে কর।তরুণের দৃষ্টিটা ঘুরে আসে লন্ডনের মেঘলা আকাশের কোল থেকে। আমার খুব ইচ্ছা করে তোমার বিয়েতে আমি খুব হৈ-চৈ করি, খুব মজা করি, খুব মাতব্বরি করি।
আর একটা বছর। ছোট ভাইটা যাদবপুর থেকে বেরিয়ে যাক। তারপর তুমি একটা ছেলে ঠিক করে দিও, নিশ্চয়ই বিয়ে করব।
বন্দনার এমন সুন্দর আত্মসমর্পণে মুগ্ধ হয় তরুণ। এমন অধিকার কজন আধুনিকা দিতে পারে অপরিচিত ডিপ্লোম্যাটকে?
নিশ্চয়ই আমি ছেলে খুঁজে দেব। তবে বিলেতি বাঁদরদের সঙ্গে কিন্তু আমি বিয়ে দেব না!
বন্দনা শুধু মাথা নিচু করে হাসে।
দুদিন পরে হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে তরুণ বিদায় নিল। বন্দনা ওই এয়ারপোর্টের ভিড়ের মধ্যেই প্রণাম করে বলল, আমাকে কিন্তু ভুলে যেও না।
পাগলী মেয়ে কোথাকার।
০৭. উনিশশো ষাট সালের তেসরা মে
উনিশশো ষাট সালের তেসরা মে তুরস্কস্থিত মার্কিন বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে একটা ছোট্ট খবর প্রচার করা হলো : আদানা এয়ারবেস থেকে অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটা বিমান বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের জন্য উড়বার পর নিখোঁজ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ওয়্যার সার্ভিসের অসংখ্য চ্যানেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই ছোট্ট খবরটি ছড়িয়ে পড়ল সারা দুনিয়ায়। কিন্তু কেউই বিশেষ গ্রাহা করল না। কোনো কাগজে খবরটা বেরুল, কোনো কাগজে বেরুল না। ডিপ্লোম্যাটরাও বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না।
দুদিন পর পাঁচই মে সুপ্রিম সোভিয়েটের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চভ ঘোষণা করলেন, একটা পরিচয়বিহীন মার্কিন বিমান সোভিয়েট ইউনিয়নের আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় গুলি করে নামান হয়েছে।
চমকে উঠল দুনিয়া।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটন থেকে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলো, ১৯৫৬ সাল থেকে যে ইউ-টু বিমান পৃথিবী থেকে অনেক উঁচু আবহাওয়া সম্পর্কিত গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনি ওই বিমানের পাইলট তুরস্কের লেক ভ্যান-এর উপর দিয়ে ওড়ার সময় জানায় তার অসিজেন সাপ্লাইতে গণ্ডগোল হচ্ছে। হয়তো এমনি পরিস্থিতিতে বিমানটি রাশিয়ায় ঢুকে পড়ে।
শুধু এইটুকু বলেই ওয়াশিংটন থামল না। ওই একই ঘোষণায় জানাল নিরস্ত্র ওই পাইলটের নাম।
ওয়াশিংটন থেকে মস্কোতে একটা নোট পাঠিয়ে আবহাওয়ার তথ্য সন্ধানী ওই বিমানের বিশদ খবরও জানতে চাইল।
মার্কিন সরকার স্থির ধরে নিয়েছিলেন যে পাইলট ফ্রান্সিস গ্রে পাওয়ার্স বেঁচে নেই। বিমানটিকে গুলি করে নামাবার পর সে বেঁচে থাকতে পারে না।
