বন্দনা ঈশান কোণে একটা ছোট্ট কালো মেঘ দেখতে পেল। মনের মধ্যে অনিশ্চিতের আশঙ্কা দোলা দিল। অনুমান করতে কষ্ট হলো না বহুগুণা সাহেবের অন্তরের ক্ষীণ আশা।
আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই বন্দনার। তাই যেন একটু মুচকি হাসল। লন্ডনে আসার প্রথম কয়েক মাসে এমনি কত বিপদের ইঙ্গিত দেখা দিয়েছিল! শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে। তাই তো কেমন যেন একটু বিদ্রুপের হাসি উঁকি দিল তার ঐ দুটো ঠোঁটের কোণে।
জান বন্দনা, এতবার তোমাদের এই বিলেতে এসেছি কিন্তু সব সময়ই কাজকর্ম নিয়ে এমন বিশ্রী ব্যস্ত থেকেছি যে কিছুই দেখা হয়নি।
তাই নাকি স্যার?
তবে কি! ব্রিটিশ মিউজিয়াম বা উইন্ডসর ক্যাসেল-এর পাশ দিয়ে গেছি হাজার বার কিন্তু ভিতরে যাবার সময়-সুযোগ হয়নি।
বন্দনা মনে মনে ভাবে, হোটেলের এই ঘরে মাঝে মাঝে তোমার আলিঙ্গন ও আদর উপভোগ করার চাইতে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ান অনেক ভালো।
আমিও যে সব কিছু দেখেছি তা নয়; তবুও চলুন না, সব কিছু দেখিয়ে দেব।
দ্যাটস লাইক এ ওয়ান্ডারফুল গার্ল, বলেই বহুগুণা ডান হাত দিয়ে বন্দনাকে একটু কাছে টেনে আদর করলেন।
বন্দনা লোহার মতো শক্ত হয়ে থাকে, নিজের বুকের পর দুটি হাত রেখে ছোটখাটো আক্রমণ প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করে।
আঃ! তুমি বড় রিজিড, বড় কনজারভেটিভ। এতদিন বিলেতে থাকার পরও একটু ফ্রিলি মিশতে পার না? তাছাড়া আমার মতো ওল্ডম্যানের কাছে লজ্জা কি?
না না, লজ্জা কি!
সকাল সাড়ে এগারটায় বাকিংহাম প্যালেসের সামনে একদল বাচ্চা ও টুরিস্টদের সঙ্গে বহুগুণা সাহেবকে চেঞ্জিং অফ দি গার্ড দেখাল। তারপর ন্যাশনাল গ্যালারি, ব্রিটিশ মিউজিয়াম।
বুঝলে বন্দনা, এ তো মিউজিয়াম নয়, একটা দুনিয়া। ভালোভাবে দেখতে হবে। আর একদিন আসব। চলো আজকে একটু রিজেন্ট পার্ক বা কেনসিংটন গার্ডেনে যাই।
সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই বহুগুণার আরো গুণ প্রকাশ পেল।
শুনেছি তোমাদের এই লন্ডনে ওয়ার্ল্ড ফেমাস নাইট ক্লাব আছে। কে যেন বলেছিল ফোর হানড্রেড ক্লাব, রিভার ক্লাব ও আরো কি কি সব নাইট ক্লাব আছে। কত বারই তো এলাম অথচ কিছুই দেখলাম না। তুমি আমাকে একটু নাইট ক্লাব ঘুরিয়ে দাও তো।
লন্ডনের নাইট ক্লাবগুলি যে পৃথিবীবিখ্যাত, তা, বন্দনা শুনেছে। কখনও দূর থেকে, কখনও পাশ দিয়ে যাবার সময় নাইট ক্লাবগুলোর নিওন সাইন দেখেছে। সেরকম বন্ধু ও অপব্যয় করার মতো টাকাকড়ি থাকলে হয়তো একদিন ভিতরে ঢুকে দেখত। সে সুযোগ ওর আসেনি। তবে শুনেছে সবকিছু। ও জানে যৌবনপসারিণীরা নাচে, দর্শকদের নাচায়। রাত যত গম্ভীর হয় সবাই তত বেশি আদিম হয়। যৌবন-পসারিণীদের দেহ থেকে ধীরে ধীরে পোশাকের ভার যত কমে আসে দর্শকরা তত বেশি মদির হয়, উন্মত্ত হয়, আরো কত কি!
বহুগুণার মতো বৃদ্ধকে নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত ফোরহানড্রেড ক্লাবে যাবার কথা ভাবতেও বন্দনার বিশ্রী লাগল। একবার ভাবল, মিসেস অরোরাকে বলে। তারপর মনে হলো, বহুগুণা সাহেবের এইসব গুণের কথা জানাজানি হলে ওকে নিয়েও নিশ্চয়ই সরস আলোচনা শুরু হবে। নিশ্চয়ই অনেকে অনেক কিছু ভাববে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এদিক-ওদিক সেদিক চিন্তা করে বন্দনা বলল, ঠিক আছে, আমি আপনার একটা রিজার্ভেশন করে দেব।
ইউ নটি গার্ল! আমাকে একলা একলা নেকড়ে বাঘের মুখে ঠেলে দিতে চাও?
বন্দনার হাসি পেল।
নাইট ক্লাবে গেলেন বহুগুণা সাহেব। মিস বন্দনা বোসকে পাশে নিয়ে উপভোগ করলেন যৌবন-পসারিণীদের নাচ। লাস্ট ফাইন্যাল সিনে লাইট অফ হয়ে গেলে মুহূর্তের জন্য আতিশয্যের আধিক্যে বন্দনার হাতটা চেপে ধরলেন। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়।
বারোটা বাজার আগেই নাইট ক্লাব থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ফেরার পথে বেশ একটু নিবিড় হয়ে বসলেন।
জান বন্দনা, তোমাকে বলতে একেবারেই ভুলে গেছি। কাল সকালেই চারজন ব্রিটিশ অনার্স আসছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। হাইকমিশনের অফিস থেকে যে ব্রিফ দিয়েছে, তার বেসিসে তোমাকে আজ রাত্রেই একটা ছোট্ট নোট ঠিক করে দিতে হবে।
আজ রাত্রেই? বন্দনা চমকে ওঠে। নাইট ক্লাব থেকে ফেরার পর বহুগুণা সাহেবের সঙ্গে হোটেলে ওই কাজ করতে হবে? আমি বরং স্যার কাল ভোরে এসেই…।
কথা শেষ হবার আগেই বহুগুণ বাধা দিলেন, নট অ্যাট অল! আজ রাত্রেই ওটাকে রেডি করতে হবে।
হোটেলের ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বহুগুণা সাহেব নিজে বন্দনার কোট খুলে দিলেন। মুহূর্তের জন্য একবার যেন কী ভীষণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আগুনের হল্কার মতো নিঃশ্বাস পড়ছে তার। চিড়িয়াখানার নেকড়ে বাঘও তখন ওঁকে দেখলে হয়তো ভয় পেত।
বহুগুণা সাহেব আরো এগিয়ে এলেন। বন্দনা একটু পিছিয়ে যেতেই বহুগুণা সাহেব দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, প্লিজ ডোন্ট ডিসিভ মি টু-নাইট।
বন্দনার মুখ দিয়ে একটি শব্দ বেরুল না। বহুগুণা সাহেব হঠাৎ আলোটা নিভিয়ে দিয়ে দানবের বেগে জড়িয়ে ধরলেন বন্দনাকে!
সঙ্গে সঙ্গে কে যেন দরজায় ঠক্ঠক্ করে নক করল।
ঘরে আলো জ্বলে উঠল। বন্দনা প্রায় কাঁপতে কাঁপতে পাশে সরে দাঁড়াল। বহুগুণা সাহেব একটু থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, কাম ইন।
দরজা খুলে অপ্রত্যাশিত ভাবে তরুণ সেনগুপ্ত একটা গোলাপি কভার নিয়ে ঘরে ঢুকল, এক্সকিউজ মি স্যার! দিল্লি থেকে একটা আর্জেন্ট মেসেজ আছে। আজ রাত্রেই রিপ্লাই দিতে হবে।
