দু-চারটে খবরের কাগজের রিপোর্ট ও পার্লামেন্টে কিছু কোশ্চেন হবার পর কুম্ভকর্ণ ভারত সরকারের যখন নিদ্রাভঙ্গ হয়ে উদ্যোগ ভবনে নতুন ফাইলের জন্ম হলো, ততদিনে ওসব দেশের কয়েক কোটি মানুষের অভ্যাস পাল্টে গেছে। সাউথ আফ্রিকা ও সিংহল গঁাট হয়ে বসেছে লন্ডন টি অকানে।
রোগটা যখন ক্যান্সারের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন সর্বরোগবিনাশিনী বটিকা আবিষ্কারের প্রয়াসে এক ডেপুটি মন্ত্রী তিন সপ্তাহে নটি দেশ ভ্রমণ করে দিল্লি ফিরে গেলেন। এই ভ্রমণে রোগের কোনো সুরাহা হলো না বটে, তবে ডেপুটি মন্ত্রীর গাল দুটি কাশ্মীরী আপেলের মতো লাল হলো।
প্রথম প্রিলিমিনারী রিপোর্ট ও প্রেস কনফারেন্স হতে দেরি হলো না। মাস তিনেকের মধ্যেই মিনিস্টর-ডেপুটি মিনিস্টার-সেক্রেটারির মিটিং হলো। পরের চার মাসে সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারিদের নিয়ে দু-তিনবার মিটিং করলেন। এর পর দুজন ডেপুটি সেক্রেটারি ও একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি টি এক্সপোর্টার্সদের সমস্যা ও মতামত জানার জন্য বারকয়েক কলকাতা-দার্জির্লিং গৌহাটি-শিলং ঘুরে এলেন পরের ছ-সাত মাসের মধ্যেই। জয়েন্ট-সেক্রেটারি দার্জিলিং গিয়ে একটু গ্যাংটক ঘুরে আসায় তার মনে হলো পাঞ্জাবের বেড কভারের ডিমান্ড ওখানে বেশ ভালোই। দিল্লি ফিরে একটা রিপোর্টও দিলেন, বেড কভার বিক্রি হলে সিকিমের কমন ম্যান ভীষণ খুশি হবে ও ইন্ডিয়া-সিকিমের কালচারাল-সোস্যাল ইকনমিক্যাল সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।
কেরালার কোট্টায়াম জেলার অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি এই রিপোর্ট পড়েই বললেন, ডিড আই নট টেল ইউ যে ওখানে কেরালার কয়ার ম্যাটের ভীষণ ডিমান্ড আছে?
তাই নাকি?
তবে কি! সেবার শিলিগুড়ি এয়ারপোর্টে সিকিম প্যালেসের একজন হাই-অফিসারের সঙ্গে দেখা। কথায় কথায় উনিই জানালেন কয়ার ম্যাটকার্পেটের ভালো ডিমান্ড হতে পারে সিকিমে।
কোয়াইট ন্যাচারাল।
তাই তো বলেছিলাম, আপনি একবার কেরালা ঘুরে আসুন। তারপর একটা কমপ্রিহেনসিভ রিপোর্ট দিন।
চায়ের সমস্যা চাপা পড়ল। জয়েন্ট সেক্রেটারি ছুটলেন কেরালা।
যাই হোক, এমনি করে আবার মন্ত্রী পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছুতে পৌঁছুতে চা রপ্তানি শিল্পের প্রায় নাভিশ্বাস হয়ে ওঠার উপক্রম হলো। সার্জিক্যাল অপারেশন করে অনতিবিলম্বে রোগ সারাবার জন্য মিঃ বহুগুণার নেতৃত্বে সাতজনের এক কমিটি নিয়োগ করে বলা হলো সরকারি পয়সায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে এসে চটপট রিপোর্ট দিন।
এই কমিটির শিরোমণি হয়েই বহুগুণা সাহেব লন্ডন এসেছিলেন। টি সেন্টারের ম্যানেজারের ঘরে হলো অফিস। অস্থায়ী আবাসস্থান হলো কাছেরই মাউন্ট রয়্যাল হোটেলে।
দু-চার দিন টি সেন্টারে আসার পরই বহুগুণা সাহেব বললেন, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড মিসেস অরোরা, মিস বোস আমার কাজে একটু হেল্প করুন।
কথাটা বলতে না বলতেই আবার বললেন, অবশ্য যদি আপনার এখানকার কাজের কোনো ক্ষতি না হয়।
মিসেস আবোরা একজন সামান্য ম্যানেজার। চেয়ারম্যান বহুগুণা সাহেবের অনুরোধ উপেক্ষা করার কথা উনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। উনি দিল্লিতে না থাকলেও ভূতপূর্ব সেন্ট্রাল মিনিস্টার বহুগুণা সাহেবের ইনফ্লুয়েন্সের কথা ভালোভাবেই জানেন। চায়ের রফতানির বাজার স্টাডি করতে এলেও এয়ার ইন্ডিয়ার ম্যানেজার থেকে হাইকমিশনার পর্যন্ত ওঁকে নিয়ে মহাব্যস্ত। সুতরাং মিসেস অবোরা কৃতার্থ হয়ে বললেন, নিশ্চয়ই। যদি আমাকে দরকার হয়, বলতে দ্বিধা করবেন না।
তোমাকে বহুগুণা সাহেবের দরকার নেই। তোমার বসন্ত বিদায় নিয়েছে। চৈত্র দিনের ঝরা পাতার বাজারে তোমাকে নিয়ে কি হবে।
না, না, আপনাকে আর বিরক্ত করতে চাই না। মিস বোস হলেই সাফিসিয়েন্ট।
অ্যাজ ইউ প্লিজ স্যার। উই আর অ্যাট ইওর ডিসপোজ্যাল।
মেনী থ্যাঙ্কস মিসেস অরোরা।
কয়েক দিন পর কমিটির অন্য সদস্যরা কন্টিনেন্টে চলে গেলেন।
বহুগুণা সাহেব একাই থেকে গেলেন লন্ডনে।
আমি তো এখন একাই কাজ করব। আমি আর কেন একলা টি সেন্টারে যাই? তুমিই না হয় হোটেলে চলে এসো।
চেয়ারম্যানের আদেশ শিরোধার্য করে নিল বন্দনা।
একদিন বেশ কেটে গেল।
পরদিন।
এখন থেকে রোজ সকালেই আমি কেনসিংটনে হাই-কমিশনারের বাড়ি যাব। তুমি বিকেলের দিকেই এসো।
অ্যাজ ইউ প্লিজ স্যার।
বন্দনা দরজা নক করার আগে একবার ঘড়িটা দেখে নিল। হ্যাঁ, চারটেই বাজে।
কাম ইন।
আমন্ত্রণ শুনে ঘরে যেতেই হাসিমুখে বহুগুণা সাহেব অভ্যর্থনা করলেন, এস, এসো। তোমার কথাই ভাবছিলাম।
বন্দনা পাশের সোফাটায় বসে একটু মুচকি হেসে বললে, সো কাইভ অফ ইউ স্যার।
দেখ বন্দনা, অত ফরম্যাল হবে না।
বহুগুণা সাহেব বন্দনার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর হাত ধরে তুলে নিয়ে বললেন, আমার কাছে এত ফরম্যাল হবার দরকার নেই। বী ইনফরম্যাল, কমফর্টেবল।
এই বলে বন্দনাকে নিয়ে বড় সোফাটায় পাশে বসালেন। বলো কফির সঙ্গে কি খাবে?
থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী মাচ। আমি এখন কিছু খাব না!
আবার ফর্মালিটি? ডান হাত দিয়ে বন্দনাকে একটু জড়িয়ে ধরে বললেন, বিলেতে থেকে একেবারে বিলেতী হয়ে গেছ? বলল কি খাবে?
ওনলি কফি স্যার।
তাই কি হয়?
টেলিফোন তুলেই ডায়াল করলেন, রুম সার্ভিস! প্লিজ সেন্ড টু প্লেটস অফ চিকেন স্যান্ডউইচ, সাম পেস্ট্রি অ্যান্ড কফি ফর টু।
