বিদেশ-বিভুইতে বলাকা রায় বা সুজাতার মতো কত কে আসেন। ভারতবর্ষের পরিচিত সমাজ-সংসার থেকে দূরে এসে এঁরা যেন কেমন মুক্ত হন বহুদিনের বহু রীতিনীতি সংস্কার থেকে। কেমন যেন শিথিল হয় সব বন্ধন। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ দেখার আনন্দে মেতে ওঠে বলাকা রায়, সুজাতা ও আরো অনেকে। আর সেই বন্ধনহীন আনন্দের ফাটলের সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে ঢুকে পড়েন ব্যাস সাহেব।
যে তরুণ সারা জীবন ধরে ভালোবেসেছে, স্বপ্ন দেখেছে শুধু ইন্দ্রাণীকে, সে সহ্য করতে পারে না ব্যভিচারী ব্যাসকে। অথচ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত অল্ডউইচের বিরাট হাই-কমিশনে শুধু ওই একটি মানুষকে নিয়েই তার সংসার! কুটনৈতিক দুনিয়ার বিরাট চাকচিক্য-রোশনাইয়ের মধ্যেও তরুণ যেন আলোর নিশানা খুঁজে পায় না। কতদিনের কত স্বপ্নের লন্ডনও যেন ভালো লাগে না তার। এত বড় শহরের এত পরিচিতের মধ্যেও নিঃসঙ্গতার দাহ যেন তাকে আরো পীড়া দেয়।
০৬. কেনসিংটন গার্ডেনস
কেনসিংটন গার্ডেনস, হাইড পার্কের বাঁদিক দিয়ে যে রাস্তাটি চলে গেছে, তার নাম বেজওয়াটার বোড়। এজওয়ার রোড ও পার্ক লেনের মোড়ে মার্বেল আর্চকে স্পর্শ করতেই বেজওয়াটার। রোডের নাম হারিয়ে গেল, শুরু হলো অক্সফোর্ড স্ট্রিট।
সবুজের মেলার পাশের শান্ত বেজওয়াটার রোড নাম পাল্টাতেই চরিত্র হারিয়ে ফেলল। প্রাণ-চঞ্চল অক্সফোর্ড স্ট্রিট যেন মানুষের উন্মত্ত আকাক্ষার তীর্থক্ষেত্র। দুনিয়ার সবকিছু সম্পদ-সম্ভোগের প্রদর্শনী হচ্ছে এই অক্সফোর্ড স্ট্রিট পাড়া। অক্সফোর্ড স্ট্রিট, বেকার স্ট্রিট, নিউ বন্ড স্ট্রিট, রিজেন্ট স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট, টটেনহোম কোর্ট রোড, চারিং ক্রশ ও আশপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। সীমাহীন লালসা নিয়ে বেড়াচ্ছে সবাই।
অক্সফোর্ড স্ট্রিট সোজা আরো এগিয়ে গেল। মানুষের ভিড় একটু পাতলা হলো। রাস্তার নামও পাল্টে গেল। এবার নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রিট। এর পর আবার পরিচয় ও চরিত্র পাল্টে গেল
ওই একই রাস্তার। হলো হাই হোবন। আবার বদলে গেল। এবার শুধু হোবন।
রাস্তাটা ধনুকের মতো একটু ডান দিকে বেঁকে যেতেই আরো কতবার ওই একই রাস্তার পরিচয় ও চরিত্র পাল্টে গেল।
বেশ মজা লাগে তরুণের। কোনোদিন কাজকর্মের মাঝে সুযোগ পেলে অফিস থেকে বেরিয়ে স্ট্রান্ড রোড ধরে এগিয়ে যায় চারিং ক্রশ। তারপর যেদিকে খুশি চলে যায়। হারিয়ে যায় সর্বজনীন মহামেলায়। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে হাজির হয় টি সেন্টারে।
শুধু ক্লান্ত হয়ে নয়, মাঝে মাঝে ভুল করে, অন্যমনস্ক হয়েও তরুণ হাজির হয় টি সেন্টারে।
কাউন্টারের কাছে যাবার আগেই মিস বোস এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানান, আসুন, আসুন। এতদিন কোথায় ছিলেন?
তরুণ একটু হাসে, এক ঝলক দেখে নেয় মিস বোসের অশান্ত, অবাধ্য চুলগুলো আর ওই দুটো মিষ্টি চোখ। তারপর বলে, কোথায় আর যাব?
বন্দনা বোস বলে, আজও কি মানুষের শোভাযাত্রা দেখতে এদিকে এসেছেন?
যদি বলি আপনার কাছেই এসেছি।
রাশ-আওয়ার না হলেও তখনও বেশ কিছু কাস্টমার ছিলেন। তবুও বন্দনা হেসে উঠল। ভ্রূ দুটো টেনে উপরে উঠিয়ে বলল, ফর গডস সেক, এমন মিথ্যা বলবেন না।
যাকগে, ওসব বাজে কথা ছাড়ুন। চলুন আপনার বাড়ি যাই।
এক্ষুনি?
তবে কি? মিসেস অরোরাকে বলুন আমাকে মাছ রান্না করে খাওয়াবেন বলে…।
বন্দনা আবার একটু হেসেই চলে গেলেন মিসেস আরোয়ার কাছে।
দু-এক মিনিটের মধ্যেই ঘুরে এসে বললেন, আপনার বহিনী আপনাকে ডাকছেন।
হাইকমিশনের সবাইকেই মিসেস আরোরা একটু খাতির করেন। তবে তরুণকে উনি ভালোবাসেন। হাইকমিশনের আর কেউ ওঁকে বহিনজী বলেন না, উনিও আর কাউকে ভাইসাব। বলেন না। লন্ডন শহরে এসব সম্পর্ক দুর্লভ হলেও মনটা তো ভারতীয়।
কদাচিৎ কখনও কখনও তরুণ এদিকে এলে বন্দনার সঙ্গে দেখা করবেই। সেবার চার্চ হলে নববর্ষ উৎসব আলাপ হবার পর থেকেই দুজনের মধ্যে একটা বেশ মৈত্রীর ভাব জমে উঠেছে। বন্দনায় ওই চুল আর ওই চোখ দুটো দেখে তরুণের যে অনেক কথা মনে পড়ে, অনেক স্মৃতি ফিরে আসে। কিন্তু সেকথা একটি বারের জন্যও প্রকাশ করে না। তবে বন্দনা জানে, বোঝে, তরুণ তাকে পছন্দ করে, হয়তো একটু ভালোবাসে। সে পছন্দ বা ভালোবাসায় অবশ্য মালিন্যের স্পর্শ নেই। টি এক্সপোর্ট ব্যুরোর চেয়ারম্যানের মতো নোংরা চরিত্রের লোক তরুণ নয়, সেকথা বন্দনা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।
বৃদ্ধ চেয়ারম্যানের কথা মনে হলে ঘেন্নায় বন্দনার সারা মন ঘিনঘিন করে ওঠে।
…বিশ্বের বাজারে ইন্ডিয়ান টি-র চাহিদা কমে যাচ্ছে। এককালে যেসব দেশে শুধু দার্জিলিং বা আসামের চা বিক্রি হতো, সেসব দেশের বাজারে সিংহল ও সাউথ আফ্রিকায় চায়ের বেশ চাহিদা হচ্ছে। লন্ডন চা নিলামের বাজারে কবছর আগেও ইউরোপ আমেরিকার কাস্টমাররা দার্জিলিং টি কেনার জন্য হুড়োমুড়ি করত। লন্ডন, নিউইয়র্ক, বার্লিন, জেনেভা, ব্রাসেলস, টারান্টা উরস্টার, জনারিওর বড় বড় রেস্তোরাঁয় কবছর আগেও ইন্ডিয়ান চা সার্ভ করে নিজেদের কৌলিন্য প্রচার করত। বড় বড় নিওনসাইনের বিজ্ঞাপন দিত, ফর বেস্ট ইন্ডিয়ান টি, ভিজিট…। কবছরের মধ্যে সব নিওনসাইনের আলো নিভে গেল।
কর্মবীর ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও তাদের প্রতিভাবান কমার্শিয়াল অ্যাটাচির দল এসব ব্যাপারে নজর দেবার তাগিদবোধ করলেন না। কলকাতা থেকে বেস্ট ইন্ডিয়ান টি-র স্যাম্পল প্যাকেট পেয়েই ওঁরা মহাখুশি রইলেন।
