এডিনবরা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জন্য ভারতবর্ষ থেকে একদল শিল্পী এলেন লন্ডনে। কলকাতার মিস বলাকা রায় ও বোম্বের সুজাতাও এলেন। ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ ওঁদের থাকার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মিঃ ব্যাস গম্ভীরভাবে জানিয়ে দিলেন, ডোন্ট বার অ্যাবাউট আওয়ার আর্টিস্টস। আমাদের আর্টিস্টদের থাকার ব্যবস্থা আমরাই করব।
ব্যাস সাহেব আর্টিস্টদের জানিয়ে দিলেন, ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করলেই বড় বড় হোটেলে থাকতে হবে ও তার ফলে আপনাদের সীমিত ফরেন এক্সচেঞ্জ নিয়ে বিপদে পড়বেন। তাই আমরাই ব্যবস্থা করছি।
কলকাতা থেকে মিস রায় লিখলেন, মেনি মেনি থ্যাঙ্কস। আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাব তা ভেবে পাচ্ছি না। ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ ইনভিটেশন পাঠিয়েছেন বলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মাত্র ২৭ পাউন্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ মঞ্জুর করেছে। দশ দিনের জন্য সাতাশ পাউন্ড! ভাবলেও মাথা ঘুরে যাচ্ছে। ভেবেছিলাম এসকর্ট হিসেবে ছোট ভাইকে সঙ্গে নেব, কিন্তু এই ফরেন এক্সচেঞ্জ…।
শেষে লিখলেন, আপনার ভরসাতেই আসছি। দয়া করে দেখবেন। এয়ারপোর্টে যদি কাউকে পাঠান তবে বিশেষ কৃতজ্ঞ হবো।
ব্যাস সাহেব মনে মনে হাসলেন। উত্তর দিলেন পরদিনই, কিছু ঘাবড়াবেন না মিস রায়। আপনাদের সাহায্য করা আমার কর্তব্য। সব ব্যবস্থা ঠিক থাকবে। যদি কাইন্ডলি একুশে বি-ও-এ-সি ফ্লাইট থ্রি-সিক্স-ওয়ানে আসেন, তবে বড় ভালো হয়।
ডেপুটি হাই-কমিশনার সাহেব এমনভাবে প্রোগ্রাম ঠিক করলেন যে, দুজন আর্টিস্ট একসঙ্গে এলেন না। তাছাড়া এক একজনকে এক-একটা হোটেলে ব্যবস্থা করলেন। কার্লটন টাওয়ারে সুজাতা, স্ট্রান্ড প্যালেসে মিস রায়। বোম্বের উঠতি নায়ক প্রেমকুমার? কেনসিনটন প্যালেসে।
সবাইকে এক কৈফিয়ত, লন্ডনে এখন পুরোপুরি টুরিস্ট সীজন ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক চাটার্ড ফ্লাইটে রোজ কয়েক হাজার আমেরিকান আর কানাডিয়ান আসছে। কিভাবে যে আমরা হোটেলে রিজার্ভেশন পেয়েছি, তা ভাবলেও অবাক লাগে।
সুজাতা দেবী বছর তিনেক আগে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল দেখে দেশে ফেরার পথে মাত্র দুদিনের জন্য লন্ডনে এসেছিলেন শুধু বোম্বের বাজারে নিজের দাম বাড়াবার জন্য। সুতরাং ধরতে গেলে তিনজনেই একেবারে আনকোরা। নিউকামারদের হাত করা খুব সহজ। টালিগঞ্জের ফিল্ম পাড়ায় বা পার্কস্ট্রিটের ওই দু-চারটে রেস্তোরাঁয় চালিয়াতি করা সহজ, কিন্তু লন্ডনের মতো মহা মহানগরে এসে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে রীতিমতো কেরামতি দরকার। অজস্র অর্থ থাকলে তবু সম্ভব, কিন্তু সাতাশ পাউন্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ নিয়ে?
হিথরো এয়ারপোর্টে মিঃ ব্যাস ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, মিস রয়। দিজ ইজ ব্যাস।
গুড আফটারনুন! গুড আফটারনুন! আপনি নিজে কষ্ট করে এয়ারপোর্টে এসেছেন?
কেবিন-ব্যাগ হ্যাঁন্ডব্যাগ ঠিক করে ধরতে ধরতে বললেন, ছি ছি, আমাদের জন্য আপনাকে কি দুর্ভোগই না সহ্য করতে হলো।
ব্যাস সাহেব মনে মনে ভাবলেন, আসব না সুন্দরী! তোমার মতো সুন্দরী অথচ ইগনোরেন্ট গেস্টদের শিকার করবার জন্য রোজ এয়ারপোর্টে আসতে রাজি আছি।
নিজের অজ্ঞাতেই ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে উঠল। হাজার হোক আপনি একজন সেলিব্রেটেড আর্টিস্ট। আপনাদের সাহায্য করা তো আমার কর্তব্য।
নিজের গাড়িতে নিজে ড্রাইভ করে মিস রায়কে নিয়ে গেলেন স্ট্রান্ড প্যালেস। গাড়ি থেকে নামার আগে মিস রায়ের কোটের দুটো বোম আটকে দিয়ে উপদেশ দিলেন, বোতামগুলো ভালো-করে আটকে নিন। হঠাৎ কখন ঠাণ্ডা লেগে যাবে, তা টেরও পাবেন না।
ফিল্ম স্টার হলেও বাঙালি মেয়ে তো! ব্যাস সাহেব অত আপন জ্ঞানে কোটের বোম লাগাবার সময় বলাকা রায় একটু অস্বস্তি বোধ করেছিল। কিন্তু একে লন্ডন, তারপর এমন। পরম হিতাকাক্ষী; তাই আপত্তি করা তো দূরের কথা, হাসিমুখেই ধন্যবাদ জানিয়েছিল। তাছাড়া সিনেমা-অ্যাকট্রেস হয়েও কলকাতা শহরে ঠিক সামাজিক স্বীকৃতি বা মর্যাদা পান না মিস রায়। একটু হাসি, একটু কথা, একটু মেলামেশা অনেকেই পছন্দ করেন, কিন্তু স্বীকৃতি-মর্যাদা দিতে ওঁদের বড় কুণ্ঠা। লন্ডনে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের এমন সহজ সরল মেলামেশা ও সাহায্যে মিস রায় বরং কৃতজ্ঞ হলেন।
একটু জল, একটু সার ছড়ালে ফসল হবেই। জমিটা উর্বর হলে সে ফসল আরো ভালো
এই সামান্য সৌজন্যের সার ছড়িয়েই ব্যাস সাহেব শান্তি পেলেন না। ওয়েস্ট মিনিস্টার, সেন্ট জেমস পার্ক, বাকিংহাম প্যালেস, রিজেন্ট পার্ক, হাইড পার্ক, মার্বেল আর্চ, জুলজিক্যাল গার্ডেন, কেনসিংটন গার্ডেন দেখালেন, বেড়ালেন! তারপর মিস রায় এডিনবরা থেকে ফিরে এলে উদার ডেপুটি হাই-কমিশনার সাহেব তাকে নাইট ক্লাব দেখালেন, উইক-এন্ডে ব্রাইটনের সমুদ্র পাড়েও নিয়ে গেলেন।
মৌমাছি শুধু মধুর জন্যই ফুলের কাছে যায়, ফুলের সৌন্দর্য বা সান্নিধ্য উপভোগের জন্য নয়। ব্যাস সাহেবও ঠিক তাই। নিজের কাজ-কর্ম কাউন্সিলার ও তরুণের উপর চাপিয়ে দিয়ে মিছিমিছি বলাকা রায়ের পিছনে ঘুরে বেড়াননি, একথা হাই-কমিশনের সবাই জানত।
মিসেস ব্যাস তখন ইন্ডিয়ায় থাকায় ব্যাস সাহেবের লীলাখেলা আরো জমেছিল। বলাকাকে বিদায় দেবার পর সুজাতাকে তো নিজের আস্তানাতেই নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অনারে ডিনার-ককটেল হলো। ডেইলি মীরর-এর ফটোগ্রাফারকে এনে ফিচার ছাপাবার ব্যবস্থাও হলো।
