জান মা, কলেজের একজন লেকচারার আমার হাত দেখে কি বললেন?
কি বললেন?
বললেন আমার নাকি অনেক দেরিতে বিয়ে। তরুণ মুচকি হাসে।
বাপ-বেটায় বেরিয়ে যাবে আর আমি একলা একলা এই ভূতের বাড়ি পাহারা দেব তাই? মা বেশ রাগ করেই বলেন।
রাগ করবেন না? উনি যে বরাবর স্বপ্ন দেখছেন বি-এ পাস করার পরই ছেলের বিয়ে দেবেন, ইন্দ্রাণীর মতো একটা বউ আনবেন ঘরে। রান্নাঘরে কাজ করতে করতে কতদিন ইন্দ্রাণীকে বলেছেন, দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা মাত্র ছেলে আমার। খুব ইচ্ছা করে ছেলে-বউয়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াই। ঢাকায় যেন আর টেকে না।
কেন মাসিমা, আমরা তো আছি, হাসি হাসি মুখে ইন্দ্রাণী বলে।
তোকে কি আর আমার কাছে চিরকাল ধরে রাখতে পারব মা? কত বড় ঘরে তোর বিয়ে হবে, কোথায় চলে যাবি তার কি কোনো ঠিক ঠিকানা আছে? কথাগুলো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ছোট্ট নিঃশ্বাসও পড়ে।
পরে ইন্দ্রাণী তরুণকে বলেছিল, জান মাসিমা কি বলছিলেন?
কি?
বলছিলেন আমার কত বড় ঘরে বিয়ে হবে, আমি নাকি কোথায় চলে যাব।
বইটা উল্টে রেখে তাচ্ছিল্য ভরে তরুণ জবাব দেয়, ডাকাতদের মতো কোকড়া চুল-ওয়ালা মেয়েকে রমনার কোচোয়ানরা ছাড়া আর কেউ বিয়ে করলে তো?
চোখ দুটো ঘুরিয়ে ইন্দ্রাণী জবাব দেয়, তুমি বুঝি এবার পরীক্ষার পর কোচোয়ানগিরি শুরু করবে?
তরুণ হাসতে হাসতে নিজের হার স্বীকার করে।
এই বুদ্ধি নিয়ে তোমার কোন চুলোয় জায়গা হবে, তাই ভাবি। আমি না থাকলে যে তোমার কি দুর্গতিই হবে?
শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে এখন যৌবনের প্রতিটি দিন পাশে পাশে পেয়েছে ইন্দ্রাণীকে, সাহায্য নিয়েছে প্রতি পদক্ষেপে।
সেদিনের ঢাকা হারিয়ে গেছে তরুণের জীবন থেকে, কিন্তু দূরে সরে যায়নি ইন্দ্রাণীর স্মৃতি। ডিপ্লোম্যাট তরুণ সেনগুপ্ত কত মেয়ের সান্নিধ্য পেয়েছে, কিন্তু ইন্দ্রাণীর স্মৃতি চাপা দিতে পারেনি কেউ। বিধাতাপুরুষের নির্দেশে সে যেন আজও তারই পথ চেয়ে বসে আছে। বন্ধু-বান্ধব। সহকর্মীদের হাসিখুশিভরা সংসার দেখে তাদের ছেলেমেয়েকে আদর করে, ভালোবাসে। কত আনন্দ পায়। দিনের শেষে যখন নিজের শূন্য ফ্ল্যাটে ফিরে আসে, তখন পিকাডেলি সার্কাস-টাইমস স্কোয়ার-গিঞ্জার সব নিওন লাইটগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠলেও তরুণের অন্ধকার মনে একটুও আলোর ইসারা দিতে পারে না। ইন্দ্ৰ-পত্নী ইন্দ্রাণীর মতো হয়তো তার ইন্দ্রাণী সুন্দরী ছিল না। সত্য, কিন্তু সে ছিল অপরূপা, অনন্যা। কিশোরী ইন্দ্রাণী যখন ম্যাট্রিক পাস করে ইডেন কলেজে ভর্তি হলো, শাড়ি পরতে শুরু করল, তখন যেন রাতারাতি ওর দেহে বন্যা এলো। চোখের নিমেষে যেমন পদ্মর ভাবান্তর হয়, ইন্দ্রাণীর সর্বাঙ্গে তেমন ভাবান্তর দেখা দিল। মেঘ দেখলেই যেমন মেঘনার জল নাচতে থাকে তেমনি তার অতদিনের অত পরিচিতা মেয়েটাকে দেখেও তরুণের মনে দোলা দিতে শুরু করল।
শীতের সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়া এমব্যাঙ্কমেন্ট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তরুণ একটু দাঁড়ায়। ফেন্সিং-এ ভর দিয়ে টেমস-এর দিকে তাকায়। চারিদিকে কুয়াশা যেন তরুণকেও গ্রাস করে।-এই কবছর ইন্দ্রাণী নিশ্চয়ই আরো পূর্ণ, পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ওর ওই স্বচ্ছ কালো চোখের বিদ্যুৎ আরো উজ্জ্বল আরো স্পষ্ট হয়েছে। ওর ওই ঘন কালো কেঁকড়া কোঁকড়া চুলগুলো কোনোদিনই শাসন মানত না। যে একগোছা চুল সব সময় কপালের ওপর উড়ে বেড়াত, সেগুলো তো এতদিনে আরো সুন্দর, আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ঘন কুয়াশা পাতলা হলো। ও-পারের রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলের আলো যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তরুণের মনের স্বপ্নময় কুয়াশাও কেটে যায়, ফিরে আসে রূঢ় বাস্তবে, নির্মম ইন্দ্রাণী-বিহীন নিঃসঙ্গ জীবনে।
মনটা কদিন ধরেই ভালো না। ডেপুটি হাই-কমিশনারের সঙ্গে কাজ করতে একটুও ইচ্ছা করে না। বুড়ো-হাবড়া হাই-কমিশনার দেশসেবার বিনিময়ে কেনসিংটনের ওই বিরাট প্রাসাদ ও রোলস রয়েস ভোগ করছেন। কিছু কাগজপত্র সই করতে হয় বটে, তবে বিন্দুমাত্র দায়িত্ব-কর্তব্যের বালাই নেই। ডেপুটি হাই-কমিশনারই সর্বময় কর্তা।
ডেপুটি হাই-কমিশনার মিঃ ব্যাস নিঃসন্দেহে একজন উঁচুদরের কূটনীতিবিদ। বেনিয়া ইংরেজ পর্যন্ত দর কষাকষিতে মাঝে মাঝে হার মানতে বাধ্য হয়। এর আগে উনি যখন অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন তখন ভারতীয় ইমিগ্রান্টদের নিয়ে এক মহা হৈ-চৈ পড়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদপত্র। ও রাজনীতিবিদ এমন হাহাকার করে উঠলেন যেন কয়েকজন ব্ল্যাক ইন্ডিয়ানকে অস্ট্রেলিয়ায় পাকাঁপাকি ভাবে থাকার অনুমতি দিলে আকাশ ভেঙে পড়বে। মিঃ ব্যাস তখন কানে কানে ফিসফিস করে ওঁদের বলেছিলেন, কিছু মধ্যযুগীয় অধিবাসী ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান বলে কোনো। জাত নেই। তোমরা সবাই একদিন ইমিগ্রান্ট হয়েই এ দেশে এসেছিলে। সুতরাং ইন্ডিয়ানদের এত ঘেন্না করছ কেন?
এই ছোট্ট একটা চিমটি কাটাতেই অস্ট্রেলিয়ার ওই সংবাদপত্র ও রাজনীতিবিদরা হুঁশ ফিরে পেয়েছিলেন এবং কাজ হয়েছিল।
কূটনীতিবিদ ব্যাস সাহেবের নিন্দা তার চরম শত্রুরাও করবে না। তবে সন্ধ্যার পর বা কাজ কর্মের অবসরে সুন্দরী-সান্নিধ্য পেলে ভুলে যান বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়। হাজার হোক সাবেকী মানুষ! শিকার করেন শুধু ভারতীয়।…
