ভাগ্যবান ডিপ্লোম্যাটেরও অভিভাবক থাকবেন, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু বিগ পাওয়ারের ডিপ্লোম্যাটদের প্রায় ছায়ার মতো অনুসরণ করে ওদেরই সহকর্মী-গোয়েন্দা। আবার এই গোয়েন্দাদের নজর রাখার জন্যও আছে ব্যাপক ব্যবস্থা-কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স!
বিগ পাওয়ারের চালেরীগুলো যেন এক-একটি সতীনের সংসার! কেউ কাউকে বিশ্বাস করে কেউ কাউকে ছাড়তেও পারে না। তাই তো সবার মনেই সন্দেহ আর অশান্তি।
ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটিক সার্ভিসে ওসব বালাই নেই। বিগ পাওয়ারের লুকোচুরি খেলার প্রয়োজন আছে। লুকিয়ে লুকিয়ে এদের দেশে কত কি হচ্ছে। বিপরীত পক্ষের সেসব গোপন খবর জানার জন্য ওরা হরির লুঠের বাতাসার মতো শত-শত সহস্র-সহস্র কোটি-কোটি টাকা ব্যয় করতে দ্বিধা করে না আমাদের দেশের মানুষকে খেতে-পরতে দেওয়ারই পয়সা নেই; সুতরাং লুকিয়ে লুকিয়ে অপরের সর্বনাশ করার জন্য অর্থ ব্যয় করা অসম্ভব। আমাদের চান্সেরীগুলো সতীনের সংসার নর। কিছু কিছু অহঙ্কারি বা দায়িত্বজ্ঞানহীন লোক থাকলেও অবিশ্বাসের অন্ধকার নেই কোথাও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইন্ডিয়ান ডিপ্লোম্যাটিক মিশনের সবাই এক বৃহত্তর পরিবারের মতো বসবাস করেন। ভাগাভাগি করে নেন নিজেদের সুখ-দুঃখ।
ফরেন সার্ভিসে ঢুকে প্রথম ফরেন পোস্টিং পাবার পরই দয়ালের বিয়ে হলো। বিয়ের পর মৃণালিনীকে নিয়ে যখন বন-এ ফিরল, তখন কি কাণ্ডটাই না হলো।…
…কর্মচঞ্চল ফ্রাঙ্কফার্ট এয়ারপোর্টের চির কর্মব্যস্ত কর্মচারীরাও থমকে দাঁড়ালেন : শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে মেয়ের দল সারি বেঁধে লাইন করে দাঁড়ালেন। কারু হাতে শাঁখ, কারুর হাতে বরণডালা। মাস্টার অফ সেরিমনিজ শ্রীবাস্তব কোনো ত্রুটি করেনি। এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিল টার্মিনাল বিল্ডিং-এর বাইরে, ল্যান্ডিং গ্রাউন্ডের কাছে এই অনন্য অভ্যর্থনা জানাবার। টেলিভিশন কোম্পানিতে খবর দিয়েছিল, ট্রাডিশনাল ইন্ডিয়ান ওয়েলকাম সেরিমনি টেক করে টেলিকাস্ট করার জন্য।
এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেনটা এসে থামতেই মাস্টার অফ সেরিমনিজ ইঙ্গিত করল। জন-পঞ্চাশেক ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট সঙ্গে সঙ্গে হাতে তালি দিতে দিতে গাইতে শুরু করল রাজস্থানী ফোক সঙ! এসো রাজপুত্র, এসো রাজকন্যা, নতুন জীবনের পরিপূর্ণ সুরাপাত্র পান কর। প্লেনের দরজা খুলতেই শুরু হলো শঙ্খধ্বনি। দয়াল আর মৃণালিনী মুগ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল দরজার মুখে। নিচে নেমে আসতেই মেয়েরা বরণ করল নববধুকে! ধুতি-পাঞ্জাবি শেরওয়ানী-চাপকান পরে পুরুষের দল মালা পরালেন দয়ালকে, মৃণালিনীর হাতে তুলে দিলেন ফুলের তোড়া।
অ্যাম্বাসেডর আসেননি ইচ্ছা করেই। তাই স্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন, যাও, যাও, তুমি যাও। আমার সামনে হয়তো ওরা ঠিক সহজ হয়ে হৈ-হুঁল্লোড় করতে পারবে না।
মাস্টার অফ সেরিমনিজ সব অনুষ্ঠান শেষে এগিয়ে নিয়ে গেলেন অ্যাম্বাসেডর-পত্নীকে। সন্তানতুল্য দয়ালকে আশীর্বাদ করলেন, নব-বধূর সিঁথিতে পরিয়ে দিলেন সিঁদুর।
সন্ধ্যায় জার্মান টেলিভিশনে এয়ারপোর্টের এই অনুষ্ঠান টেলিকাস্ট করা হলো। রাতারাতি দয়াল ও মৃণালিনী বিখ্যাত হয়ে গেল! বন-এ দয়াল মৃণালিনীকে নিয়ে কতদিন ধরে চলল আনন্দোৎসব।
সেদিন বন ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসীর যাঁরা দয়াল মৃণালিনীকে নিয়ে এই আনন্দোৎসব করেছিলেন, তারা ছড়িয়ে পড়েছেন সারা দুনিয়ায়। কেউ অস্ট্রেলিয়া, কেউ ভিয়েত্সাম, কেউ ওয়াশিংটন, কেউ মস্কো। কত কি হয়ে গেছে এর মধ্যে। কত উত্থান কত পতন। তবুও কেউ ভুলতে পারেননি দয়াল আর মৃণালিনীর কথা। যে মৃণালিনীকে নিয়ে ওঁরা এত আনন্দ করেছিলেন, সে মা হতে পারল না জেনে সবাই দুঃখিত, মর্মাহত। পর পর তিন তিনটি সন্তান নষ্ট হলো মৃণালিনীর। একটা ফুটফুটে সুন্দর শিশু দেখলে কাঙালিনীর মতো ছুটে যায় মৃণালিনী। চান্সেরীর বন্ধু-বান্ধবদের বাচ্চাদের নিয়েই আজ সে দিন কাটায়।
তরুণ দুঃখ পায় মৃণালিনীকে দেখে, সান্ত্বনা পায় দুঃখের এতগুলো অংশীদার দেখে।
মৃণালিনী তরুণকে বলত, জানেন ভাই, প্রথম প্রথম নিজেকে সামলাতে পারতাম না। একলা থাকলেই চুপচাপ বসে বসে চোখের জল ফেলতাম। পার্টিতে রিসেপশনে ককটেল-এ গিয়েছি কিন্তু মুহূর্তের জন্য মনে শান্তি পাইনি। কিন্তু আজ?
বন্ধুপত্নীকে আর বলতে হয় না। বাকিটুকু তরুণ জানে। জানে নায়েক, বঙ্গস্বামী, চ্যাটার্জী, শ্রীবাস্তবের ছেলেমেয়েরাই ওর সারা জীবন জুড়ে রয়েছে। অস্ট্রিয়ায় থাকবার সময় মিসেস শ্রীবাস্তব অসুস্থ হলে দুটি বাচ্চাই তো মৃণালিনীর কাছে থেকেছে। ছোট বাচ্চাটা তো নিজের বাপ-মার কাছে যেতেই চায় না। দয়াল যেখানেই বদলি হোক না কেন, মৃণালিনীর একটা সংসার সেখানে আছে।
আচ্ছা দাদা, তোমার বাচ্চা হলে আমার কাছে রাখবে তো? মৃণালিনী সত্যি সত্যি জানতে চায় তরুণের কাছে।
তরুণ মুচকি হাসে।
হাসছ কেন দাদা?
হাসব না? একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে। একটু পরে, একটু যেন তলিয়ে যায়। বলে, ওসব কথা আজ ভাবি না, ভাবতে পারি না, ভাবতে চাই না।
সত্যিই কি সেসব ভাবে না তরুণ? লুকিয়ে লুকিয়ে চুরি করে নিঃসঙ্গ তরুণ নিশ্চয়ই সে স্বপ্ন দেখে। কত কি ইচ্ছে করে, কত কি মনে পড়ে তার।
