তরুণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, একটুও ওজনের হেরফের হয় না?
সহিদুল্লা খাঁ হেসে ওঠে কথা শুনে।-ওজনের হেরফের হবে কেন?
হাসি থামলে খাঁ সাহেব বললেন, একবার ওজন কম দেবার দায়ে দুজনের ফাঁসি হয়। সেই থেকে…
ফাঁসি?
হ্যাঁ, তাই তো শুনেছি।
কবছর আগের কথা?
তা জানি না। তবে বেশ কিছুকাল আগে।
কিংবদন্তীর মতো এসব কাহিনি ঘরে ঘরে শোনা যায়। সঠিক খবর কেউ জানে না, তবে সবাই জানে ওজন কম দেবার সাহস কারুর নেই। আরো অনেক কিছু জানে ওরা। জানে মাঝরাতে কাবুলের নির্জন পথেও নিঃসঙ্গ অর্ধনগ্ন যুবতীর গায়ে হাত দেবার সাহস কোনো আফগানের নেই। কি বললে? চুরি-ডাকাতি? ডাকাতি করলে জোশন গ্রাউন্ডে শুলে চড়ানো হয়। তরুণ বহুজনকে প্রশ্ন করেছে, আপনি দেখেছেন? কেউ দেখেনি। তবে সবাই জানে শূলে চড়ান
কাবুলের রাস্তায় উর্দীপরা পুলিশ ওয়ারলেস গাড়ি নিয়ে ছুটে বেড়ায় না, অ্যান্টি-করাপশন ডিপার্টমেন্টের কৃতিত্ব সরকারি প্রেস নোটে প্রচার করার অবকাশ নেই আফগানিস্থানে। অনেক দেশের সঙ্গেই তুলনা করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তরুণ।
মরুভূমি ও চিরতুষারাবৃত পর্বতের সমন্বয়-ভূমি আফগানিস্থান সত্যি বিচিত্র দেশ। অন্য দেশে সৎ মানুষ খেতে পায় না, কিন্তু অসৎ মানুষ জেলখানায় গিয়ে আহার-বিহার-প্রমোদ করে সরকারি খরচায়। আফগানিস্থানে? যে অসৎ, যে ঘৃণিত তাকে জেলখানায় পাঠায় শাস্তি দেবার জন্য। তাই তো সরকারি কোষাগার শূন্য করে কয়েদীদের সেবা-যত্ন আহার-বিহারের ব্যবস্থা নেই আফগানিস্থানে। কয়েদীদের আহার আসে তার আত্মীয়দের কাছ থেকে। যে কয়েদীর আত্মীয়স্বজন নেই, সে হাতে-পায়ে হাতকড়া পরে শুক্রবারে শুক্রবারে ভিক্ষা করবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এবং সেই ভিক্ষার পয়সায় তার দিন গুজরান হবে। এ ব্যবস্থা ভালো কি মন্দ, তা জানে না তরুণ। তবে জানে এর পেছনে যুক্তি আছে, কারণ আছে।
স্নিগ্ধ-রুক্ষ প্রকৃতির সন্তান আফগানরাও শান্ত, কখনও অশান্ত; কখনও সৌজন্য-ভদ্রতার প্রতীক, কখনও নির্মম পাষাণ। শত্রু নিপাত করে এরা হাসিমুখে। আবার আশ্রয়প্রার্থী চরম শত্রুকেও সন্তান জ্ঞানে সমাদর করে। কিন্তু অপমানের প্রতিশোধ অপমান করেই নেবে, রামধনু গেয়ে নয়।
হঠাৎ ট্রান্সফার অর্ডার পেয়ে কাবুল ছাড়তে যেন তরুণের কষ্টই হচ্ছিল। সে রাত্রে সব কিছু একসঙ্গে মনে পড়ল। বছরের প্রথম তুষারপাতের সময় আফগানদের মতো বরফি খেলার। সময় কি মজাই না হয়েছিল বীণাদির সঙ্গে।
ফেয়ারওয়েল ডিনারের অতিথিরা একে একে সবাই বিদায় নিলেন। অত বড় ড্রইংরুমের তিন কোণায় তিনটি সোফায় তিনজনে চুপচাপ করে বসে রইলেন কতক্ষণ, কেউ জানে না।
অনেকক্ষণ পর বীণাদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তোমার সঙ্গে আমাদের এতটা ঘনিষ্ঠতা না হলেই ভালো হতো! যাদের থাকা না থাকার ঠিকঠিকানা নেই, যারা আজ কাবুলে কাল ক্যালিফোর্নিয়ায় বা কোরিয়ায়, তারা যে কেন মানুষকে ভালোবাসে, আপন করে, তা বুঝি না।
মিঃ মেটা একটু সান্ত্বনা দেন, বছর তিনেকের মধ্যেই আবার যাতে আমরা একই মিশনে থাকতে পারি…।
বীণাদি প্রায় গর্জে উঠলেন, বাজে বক করো না তো! তোমার ওই ধাপ্পাবাজি অনেক শুনেছি।
এবার তরুণ কথা বলে, নিত্য নতুন দেশ দেখছি আর তোমাদের ভালোবাসা পাচ্ছি বলেই তো আমি বেঁচে আছি। নয়তো আমি কি করে বাঁচি বল তো?
এতদিন যে প্রশ্ন অনেক কষ্টে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন, এবার বীণাদি সেই প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, ঢাকার কোনো খবর পেলে?
অতি দুঃখেও তরুণ হাসে। বলে, আর কি খবর পাব? শেষ সর্বনাশের কনফারমেশন?
ছি ছি, ওকথা বলছ কেন?-বীণাদি উঠে এসে তরুণের পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে সান্ত্বনা জানান।
একটু থেমে আবার বলেন, তুমি তো কোনো অন্যায় করনি তরুণ। দেখবে ভগবানও তোমার প্রতি অন্যায় করবেন না। একদিন তুমি ওকে খুঁজে পাবেই।
পরদিন সকালে কাবুল এয়ারপোর্টে ভাইকাউন্টের চারটে ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠল, পাখাগুলো বন বন করে ঘুরে উঠল। ঝাঁপসা চোখেও প্লেনের জানালা দিয়ে তরুণ যেন স্পষ্ট দেখে বীণাদিকে। আর প্লেনের গর্জন স্তব্ধ করে বীণাদির শান্ত কণ্ঠ শুনতে পায়, একদিন তুমি। ওকে খুঁজে পাবেই।
০৫. খবরের কাগজ বা চলতি রাজনৈতিক ডিক্সনারী
খবরের কাগজ বা চলতি রাজনৈতিক ডিক্সনারীর ভাষায় বিগ পাওয়ারের ব্যাপারই আলাদা। ওখানে যে কি হয়, আর কি হয় না, তা স্বয়ং অলমাইটি গডও জানেন না। অনেকটা মধ্যযুগীয় হারেমের মতো আর কি! কিছু বোঝা যায়, কিছু দেখা যায়, কিছু শোনা যায়, কিছু অনুমান করা যায়। তবুও সব কিছু জানা অসম্ভব। ওদের ওখানে কে সত্যিকার ডিপ্লোম্যাট বা প্রেস অফিসার বা গোয়েন্দা বিভাগের লোক, তা স্বয়ং অ্যাম্বাসেডরের অন্তর্যামীও জানেন না।
বিগ পাওয়ারের অ্যাম্বাসেডরদের অবস্থা অনেকটা বড় বড় কোম্পানির পাবলিক রিলেশান্স ম্যানেজারের মতো। কোম্পানির পরিচালনা বা অর্থকরী ব্যাপারে বা গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক রিলেশান্স ম্যানেজারের কোনো ভূমিকা নেই কিন্তু প্রচার বেশি। অ্যাম্বাসেডর বক্তৃতা দেবেন, ছবি ছাপা হবে, এম্বাসীর সবাই তাকে মান্যগণ্য করবে, কিন্তু রাজনৈতিক চাবিকাঠি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যের কাছে থাকে।
