সেই ডামাডোলের বাজারে আরো কত খাল-বিলের জল ঢুকে গেছে। মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজের কেমিস্ট্রির ডিমোনোস্ট্রেটর, লাহোর হেরল্ড-এর জুনিয়র সাব-এডিটর, আরউইন হাসপাতালের অফিস সুপারিন্টেন্ডেন্ট, কনট প্রেসের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ম্যানেজার, কেষ্টনগর কলেজের লাইব্রেরিয়ান ও আরো কত বিচিত্র মানুষ ইমার্জেন্সী রিক্রুটমেন্টে ফরেন সার্ভিসের প্রথম বা দ্বিতীয় সারি দখল করল।
বীণাদির কথায় তরুণ অবাক হয় না। এরা সিঙ্গাপুর থেকে ডিউটি-ফ্রি ইমপোর্টের স্বপ্ন দেখবে, নাকি ভারত-আফগান মৈত্রীকে আরো দৃঢ় করবে?
বীণাদি বলতেন, আফগানিস্থানকে ওরা চিনবে? সে বিদ্যাবুদ্ধি বা ইচ্ছা আছে ওদের?
মিঃ মেটা প্রতিবাদ করতেন, যত বুদ্ধি তোমার আছে।
বীণাদি দুবছর কাবুলে আছেন। শুধু হিন্দুকুশের নতুন চ্যানেলই দেখেনি, ইন্ডিয়ান এম্বাসীর অনেক রথী-মহারথীর দুর্বলতার খবরও তিনি জানেন। তাই তো মুহূর্তের মধ্যে স্বামীর কথায় প্রতিবাদ জানান, তোমাদের মতো বিদ্যা-বুদ্ধি না থাকতে পারে, তবে মন আছে, ইচ্ছা আছে…।
বীণাদি পলিটিক্যাল কাউন্সেলরকে কেন ড্রাই ফুট কাউন্সেলার বলে ঠাট্টা করতেন, তা জানতে তরুণের সময় লাগেনি। কোনো জানাশুনা লোক কাবুল থেকে দিল্লি গেলেই হলো, পলিটিক্যাল কাউন্সেলার পাঁচ কিলো কিসমিস, পাঁচ কিলো ক্যাসুনাট জয়েন্ট সেক্রেটারির বড় মেয়ে পলির জন্য পাঠাবেনই। বেশি দিন এমন কোনো প্যাসেঞ্জার না পেলে প্লেনের পাইলট মারফত কিছু কিছু পাঠিয়েই দিল্লিতে একটা মেসেজ পাঠাবেন, পলি…সাজাহান রোড, নিউদিল্পি…প্লিজ কালেক্ট প্যাকেট পাইলট ফ্লাইট…ফ্লাইডে…।
চান্সেরীর ক্লার্করা তো ওকে ডি এফ সি-ড্রাই ফুট কাউন্সেলার বলেই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে।
চান্সেরীতে শুধু দিনগত পাপক্ষয় করত তরুণ। কাজ করে আনন্দ পায়নি একটুও। যে চালেরীতে চাঞ্চল্য নেই, উত্তেজনা নেই, কোনো রাজনৈতিক রেষারেষি নেই, সেখানে কি কাজ করে কোনো সত্যিকার ডিপ্লোম্যাট খুশি হয়? পাখতুনিস্থান নিয়ে আফগানিস্থান-পাকিস্তানের রাজনৈতিক লড়াই চলছে। সেই সাতচল্লিশ থেকে পুস্তুভাষী আফগানরা সহ্য করতে পারে না পাকিস্তানকে। আর আফগানিস্থানের শতকরা ষাট-সত্তর জনই হচ্ছে পুস্তুভাষী। তবুও পাকিস্তান কেমন টুকটুক করে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। আর ইন্ডিয়ান এম্বাসী? স্বয়ং অ্যাম্বাসেডরই যদি উদাসীন হন, যদি ডিপ্লোম্যাটিক রিসেপসনে রাজা বা প্রাইম মিনিস্টারের পাশে দাঁড়িয়ে ফটো তোলাই তাঁর স্বপ্ন ও একমাত্র কাজ হয়, তবে এম্বাসী-চালেরীর অন্যেরা কি করবেন। পাকিস্তান এম্বাসীর প্রচার বিভাগ কেমন ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের নামে কলঙ্ক রটাচ্ছে। আর ইন্ডিয়ান এম্বাসীর প্রেস অ্যাটাচির কৃপায় প্যারিস থেকে ছাপান ফ্রেন্টি জার্নাল ও তেহেরানে। ছাপা পারসী ভাষার জার্নালের বান্ডিলগুলো স্টোরের মধ্যেই বন্দী হয়ে পড়ে থাকে। কাবুলের। হোটেলে, রেস্তোরাঁয়, এয়ারপোর্টে-সর্বত্র-পাকিস্তানের কত কি নজরে পড়বে। কাবুল ইউনিভার্সিটির রিডিংরুমে পাকিস্তানী প্রচার পুস্তিকার বন্যা বইছে। কিন্তু কোথাও ভারতবর্ষের কোনো কিছুর টিকিটি পর্যন্ত দেখা যাবে না।
কি করবে তরুণ বা মেটা সাহেব? অসহায় হয়ে চাকরি করে গেছে।
চালেরীর বাইরে কিন্তু প্রাণভরে আনন্দ পেয়েছে, উপভোগ করেছে কাবুলবাসের প্রতিটি মুহূর্ত। এমন স্বাধীনতাপ্রিয় জাত ইতিহাসে বিরল বললেই চলে। সব কিছু বরদাস্ত করবে এরা, বরদাস্ত করবে না অন্য জাতের কর্তৃত্ব। শুধু আজ নয়, কোনো দিনই করেনি। প্রায় হাঁটতে হাঁটতেই দেশ দখল করেছেন আলেকজান্ডার, কিন্তু আফগানিস্থানে এসে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন পাঠানশক্তির মারাত্মক স্বাদ! পরবর্তীকালে শিক্ষা পেয়েছিল সাম্রাজ্যলোভী আরবরা। কেন ইংরেজরা? ঝড়ের বেগে এশিয়া-আফ্রিকার ডজন ডজন দেশ দখল করেছে, উড়িয়েছে। ইউনিয়ন জ্যাক। একবার নয়, দুবার নয়, তিনবার বিরাট ইংরেজ বাহিনীর বিপর্যয় হয়েছে এই পাঠান বীরদের হাতে। যখন সামনা-সামনি পারেনি, তখন রাতের অন্ধকারে লোকচক্ষুর আড়ালে চক্রান্ত করে খিড়কির দরজা দিয়ে কাবুলে সংসার পাততে চেয়েছিল বীরের জাত ইংরেজ। তাও পারেনি।
ইদানীংকালে আফগানিস্থান শত শত কোটি সাহায্য নিচ্ছে আমেরিকা-রাশিয়ার কাছ থেকে, কিন্তু তার জন্য মাথা হেঁট করছে না সে; বরং সাহায্য নিয়ে কৃতার্থ করেছে ওদের। কাবুলে ডিপ্লোম্যাটিক পার্টিতে আফগান সরকারের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট-হেড ক্লার্করাও নিমন্ত্রিত হন এবং তারা না এলে হোস্ট অ্যাম্বাসেডররা দুঃখ পান। তরুণ ভাবে নিজের দেশের কথা। একটা ফিল্ম শো দেখার জন্য ভি-আই-পি-দের কি ব্যাকুলতা।
কলকাতা বা দিল্লিতে আফগানদের নিয়ে কতজনকে হাসি-ঠাট্টা করতে শুনেছে তরুণ। শুনেছে ওরা নাকি পিছিয়ে থাকা মধ্যযুগীয়।
কলকাতা-দিল্লি-বোষের মিল্ক বুথের মতো সারা কাবুলে ছড়িয়ে আছে সরকারি নান-এর দোকান। সরকার লরী ভর্তি আটা পৌঁছে দেয় এইসব দোকানে, কর্মচারীরা তৈরি করেন নান। সেই নান খেয়ে বেঁচে থাকেন কাবুলের চার লক্ষ মানুষ। দীনদুঃখী থেকে প্রাইম মিনিস্টারের বাড়ির ডাইনিং টেবিলে পর্যন্ত এই নান পৌঁছে যায়। কোনো নান-এর ওজন এক তোলা কম হবে না।
