ফরেন সার্ভিসের অফিসার বা তাদের পরিবারকে নিয়ে সাধারণ মানুষের বিচিত্র ধারণা। অনেকের ধারণা ওরা বোধ হয় দিনরাত্রি কেবল মদ খান, চরিত্র বলে কোনো পদার্থ ওদের নেই। সমাজ সংসারের বন্ধুহীন এই মেয়েপুরুষরা শুধু ফুর্তি করেই দিন কাটায়। কথাটা যে সর্বৈব মিথ্যা নয়, তা তরুণ বা বীণাদি জানে। কিন্তু তাই বলে কি ওরা মানুষ নয়? ফরেন। সার্ভিসের অফিসার বা তাদের পরিবারের লোকজন তো রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদের হৃদপিণ্ড আছে মন আছে; আছে দয়া-মায়া-ভালোবাসা। আর আছে মনুষ্যত্ব।
একে সৌরাষ্ট্রের মানুষ, তারপর ভবনগর রাজ কলেজের ভূতপূর্ব লেকচারার। মিঃ মেটা নিতান্তই একজন শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক। কিন্তু রোমের হাওয়া আর ইতালির মাটি কেমন যেন সবাইকে চঞ্চল করে তোলে। তারপর বীণাদির মতো সুন্দরী ও বিদুষী ভার্যা! মিঃ মেটা সত্যিই চঞ্চল হয়ে উঠলেন। মারলোত বা মার্টিনীর বোতল উজাড় না করেও মেটাসাহেব বেশ একটু মদির হয়ে উঠলেন। বীণাদিকে কেন্দ্র করে তার স্বামীর এই রোমান্টিক উন্মাদনা তারও নিশ্চয়ই ভালো লাগতো। হাজার হোক কাকারিয়া লেক-অ্যাপলো বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে ইউরোপের আনন্দ-উৎসবের অন্যতম প্রাণবিন্দুতে এসে মিঃ মেটার মতো স্বামী পেলে যে কোনো ভারতীয় মেয়ের পক্ষেই অমন হওয়া স্বাভাবিক।
উইক-এন্ডে দুজনে মিলে ঘুরে বেড়ালেন ফ্লোরেন্স, সান মারিনো, ভেনিস, জেনোয়া, মিলান, পাড়ুয়া ও পিসা আরো কত জায়গা। চললেন আল্পসে, ভেসে বেড়ালেন সমুদ্র।
তারপর একদিন বীণাদিই বললেন, চলুন মিঃ সেনগুপ্ত ক্যাপরু বেড়িয়ে আসি।
তরুণ মনে মনে হাসে বীণাদির আকস্মিক পরিবর্তনে। বুদ্ধিমান কূটনীতিবিদ। একটু চিন্তা করেই কারণটা খুঁজে পায়। ইতালির মানুষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে চায়। আমেরিকানরা অর্থের নেশায় পাগল; ইংরেজরা কর্তৃত্ব বিস্তার করতে মত্ত, জার্মানরা শক্তিসামর্থ্য দেখাতে ব্যস্ত, কিন্তু ইতালির মানুষ জীবনের সমস্ত রস আহরণ করতে চায়। ছেলে-ছোঁকরা। বুড়ো-বুড়ি যেই হোক, সবাই চায় প্রাণভরে হাসতে, কাঁদতে। শুধু হাসতে-কাঁদতে নয়, পৃথিবীর মধ্যে বোধ করি একমাত্র এরাই পারে প্রাণমন দিয়ে ঝগড়া করতে। দর্শক হতে এরা জানে না, প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় প্রতিটি ঘটনায় এরা অংশ গ্রহণ করবে। রোম বা মিলানের রাস্তায় ট্রাফিক অ্যাকসিডেন্ট হলে এরা কলকাতার মানুষের মতো শুধু ভিড় করে না, মতামত দেয়, ঝগড়া করে মারামারি করে। পরে আবার হাসতে হাসতে দল বেঁধে কোর্ট-কাছারিও যাবে। বিচিত্র এই দেশ। বিচিত্রতর এর মানুষজন। এমন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে সমস্ত অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে, হৃদয়-নিংড়ে চোখের জল ফেলতে আর কেউ পারে না।
বীণাদিও কি এই দেশে এসে এদেরই মতো জীবন-উৎসবে মেতে উঠেছে?
তরুণ ড্রাই মার্টিনির গেলাসে চুমুক দিয়ে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মিঃ মেটাকে কথাটা বলল। মিঃ মেটা একটু লজ্জিত হলেন। কথার মোড় ঘোরাল তরুণ, ক্যাপরী গিয়ে কি হবে? তার চেয়ে চলুন গ্রান্ডসুইপে গিয়ে গল্প করতে করতে বাদাম চিবুই।
বীণাদি বললেন, বাজে কথা বাদে দিন। মোট কথা জেনে রাখুন, সামনের উইক-এন্ডে আপনি আমাদের সঙ্গে ক্যাপরী যাচ্ছেন।
আত্মসমর্পণ করার আগে তরুণ বলল, অমন রোমান্টিক জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? আই অ্যাম গিভিং ইউ দি লাস্ট চান্স টু থিংক ইট ওভার।
নেপলস্-এর পাশে ক্যাপরী দ্বীপে গিয়েছিল ওরা তিনজনে। গান আর কাব্যের খ্যাতিসমৃদ্ধ এই ছোট্ট দ্বীপে গিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছিল তিনজনেই। ফুল-পাতায় ভরা ব্লু-গ্রোতোতে ছবি তুলেছে, ছবির মতো সুন্দর অ্যানাক্যাপরী গ্রামে ঘুরেছে, মোগানো খেয়েছে, দড়ির জুতো কিনেছে। কিন্তু শেষে মেরিনা পিকোলো বীচ থেকে ফেরার পথে এক অপ্রত্যাশিত মোটর দুর্ঘটনায় নিদারুণভাবে আহত হলেন মিঃ মেটা।
সে ইতিহাস দীর্ঘ। তবে দুর্ঘটনার ফলে মেটা দম্পতির জীবনে একটা পাকাঁপাকি আসন হলো তরুণের। বীণাদির বিশ্বাস, তরুণের জন্যই মেটাসাহেব সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছেন। বীণাদি তাই কৃতজ্ঞ। মেটাসাহেবও ভুলে যাননি তরুণের সেবা-যত্ন তদ্বির-তদারক।
আর তরুণের? তার রুক্ষ জীবন-প্রান্তরে মেটা-দম্পতি এক পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয়। বীণাদিকে সে এয়ারপোর্টে আশা করেনি। নিশ্চিত জানত সে খাবার-দাবার তৈরিতে এত ব্যস্ত থাকবে। যে, এয়ারপোর্টে গিয়ে সময় নষ্ট করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তরুণকে দেখে বীণাদি যেন হাতে স্বর্গ পেল। তুমি এসে বাঁচালে আমাকে।
কেন বীণাদি?
দুদিন থাকলেই বুঝবে কেন। বীণাদি প্রায় দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন।
মিঃ মেটা বললেন, এত তুচ্ছ ব্যাপারে আমাদের কলিগরা নিজেদের ব্যস্ত রাখেন যে বীণা তা টলারেট করতে পারে না!
তরুণ আক্ষেপ করে বলল, এইতো আমাদের রোগ।
পরে লাঞ্চ খাবার সময় বীণাদি বলেছিলেন, জান ভাই, আজ প্রায় তিন মাস বাড়ির বাইরে যাই না বললেই হয়।
কেন?
লন্ডন, নিউইয়র্ক, রোম বা কলম্বোর মতো সোসাইটি বলে কোনো পদার্থ তো এখানে নেই। তোমার দাদার কলিগদের বাড়ি গিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ডিউটি-ফ্রি ইমপোর্টের গল্প আর ভালো লাগে না।
সত্যি, বিচিত্র আমাদের দেশ। বিচিত্রতর হচ্ছে ফরেন সার্ভিসের এক শ্রেণীর অফিসার। শুধু ফরেন সার্ভিস কেন? সব সার্ভিসেস-এরই এক অবস্থা। আজ যেসব আই-সি-এস গভর্নর হয়েও মনে শান্তি পান না, তারা যৌবনে স্বপ্ন দেখতেন ডেপুটি সেক্রেটারি হয়ে রিটায়ার করার। দেড়শো বছরের ইংরেজ রাজত্বের মেয়াদ আর একটু বাড়লেই হয়েছিল আর কি! ওয়েলেসলী-সাজাহান মথুরা রোডের বাংলো চোখে দেখতে হতো না, গোল মার্কেটের আশপাশের কোনো অলিগলিতেই এঁদের ভাবলীলা সাঙ্গ হতো। ফরেন সার্ভিসের সিনিয়রদের জীবনকাহিনি আরো চমকপ্রদ যে পুরী সাহেব স্বপ্ন দেখতেন হাথরাশ বা গোরক্ষপুরের ডেপুটি কমিশনার হয়ে রিটায়ার করার পর ড্রইংরুমে বার লাইব্রেরির ফেয়ারওয়েলের গ্রুপ ফটো টাঙাবেন, তিনি আজ লন্ডন-ওয়াশিংটন মস্কো-টোকিও ছাড়া পোস্টিং নেন না। কেন? উনি যে সাতচল্লিশ সালে ময়ূরের পালক পরে ফরেন সার্ভিসে জয়েন করে আজ টপ এক্সপার্ট।
