বরিশাল ঝালকাঠির পোলা হয়েও সরকারসাহেব এমনি এক মেমসাহেবের খপ্পরে পড়ে এক নাগাড়ে যোল বছর ইন্ডিয়ার বাইরে বাইরেই কাটিয়ে দিলেন। ইন্ডিয়ার নন-অ্যালাইনমেন্ট ও অ্যাফররা এশিয়ান প্রেমের নীতি রক্ষা করার জন্য একবার দুবছরের জন্য কলম্বো ছিলেন। ব্যস! সরকারসাহেব সাউথ ব্লকে এসে প্রাইম মিনিস্টারের ঘরটা চিনলেও ফরেন সেক্রেটারির ঘরে যেতে হলে বেয়ারা-চাপরাশীদের জিজ্ঞাসা না করে পারবেন না।
সরকারসাহেবের কথা তরুণ জানে। প্রথম প্রথম বিশ্বাস করত না। ফরেন মিনিস্ট্রির মোটা মোটা নিয়ম-কানুনের বইতে ছাপার অক্ষরে লেখা আছে, তিন বছর পর বদলি হতে হবে। একই রিজিয়নে পরপর পোস্টিং হবে না। দুটো টার্মের বেশি একসঙ্গে বিদেশে থাকা চলবে না এবং আরো কত কি। কিছু ডিপ্লোম্যাট ডিপ্লোম্যাসি করেন, কিছু ডিপ্লোম্যাট তৈল মর্দন করেন, কিছু আবার কাশ্মীরে শ্বশুরবাড়ি বলে এসব নিয়মকে এড়িয়ে চলছেন বেশ হাসিমুখে।
কেন মিঃ জোহর? বাইশ বছরই বিদেশে। মাঝে মাঝে তাজমহল দেখার জন্য সরকারি পয়সায় ইন্ডিয়া আসেন কিন্তু ইন্ডিয়াতে পোস্টিং? জোহরসাহেবকে সে কথা বলার সাহসও কারুর নেই, কেউ বলেন, মিসেস জোহরের স্বর্গত পিতা আর ফরেন মিনিস্টারি নাকি বন্ধু ছিলেন। কেউ বলেন, ওসব বাজে কথা। ফরেন সেক্রেটারির ছেলেকে জোহরসাহেব নিজের কাছে ভি-আই-পি সমাদরে রেখে ব্যারিস্টারি পড়িয়েছেন বলেই…। কেউ আবার ফিসফাস করেন, মিসেস জোহর এককালের নামকরা অভিনেত্রী। এখনও বহুজন তার সাহচর্যে দু এক পেগ স্কচ পেলে ধন্য মনে করেন।
নানা মুনির নানা মত। কোনোটা সত্য কোনোটা মিথ্যা তা তরুণ জানে না। জানতে চায়ও। তবে সে বেশ বুঝতে পারে অন্তঃসলিলা ফন্তুর মতো জোহরসাহেবের কিছু আভার গ্রাউন্ড কানেকশন আছে। আমাদের টপ এ-ওয়ান অ্যাম্বাসেডররা পর্যন্ত মিঃ ও মিসেস জোহরকে যেভাবে মর্যাদা দেন, মেলামেশা করেন, তা দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই।
যাকগে সেসব। যোগীর অত হাই কানেকশনস নেই। তবে তৈল মর্দন! জাপানী ট্রানজিস্টার, হংকং-এ ফ্রি পোর্ট তো আছে।
ইন্দুরকার তিন বছরের জন্যে কাবুল গিয়েছিল। ছবছর পরেও বদলি হতে চায়নি সে। ইন্দুরকার তরুণের সমসাময়িক, একই ব্যাচের ছেলে ওরা। দুজনের মধ্যে যথেষ্ট বন্ধুত্ব। দুজনে পৃথিবীর প্রান্তে থাকলেও নিয়মিত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান চলে। ছাত্রজীবনে ইতিহাস পড়ে নয়, ইন্দুরকারের চিঠি পড়েই আফগানিস্থান সম্পর্কে তরুণের মনে গভীর আগ্রহ জন্মায়। তাই তো অনেক দিন আগে একবার সুযোগ মতো এক জয়েন্ট সেক্রেটারিকে বলেছিল, স্যার, শুনেছি কাটমা-কাবুলে অনেকেই পোস্টিং চান না। আই উইল বী গ্ল্যাড ইফ আই গেট এ চান্স টু সার্ভ দেয়ার।
জয়েন্ট সেক্রেটারি মনে রেখেছিলেন তরুণের অনুরোধ। তাই তো মিনিস্ট্রির ট্রান্সফার-পোস্টিং কমিটির মিটিং-এ যোগীর আপীলের বিষয় উঠতেই তরুণের নাম উঠল।
যোগীর বদলে কাবুল চলেছে তরুণ সেনগুপ্ত। হিন্দুকুশ দেখবে, বামিয়ানে পৃথিবীর বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তি দেখবে, গজনী যাবে, কান্দাহার যাবে। আরো কত কি দেখবে সে। খুব খুশি। তারপর আছে বীণাদি!
মে আই হ্যাভ ইওর অ্যাটেনশন প্লিজ!
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ভাইকাউন্ট এসে গেল কাবুল।
বিমান থেকে বেরিয়ে আসতেই ফার্স্ট সেক্রেটারি মিঃ মেটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল তরুণ। হাজার হোক সিনিয়র অফিসার! কৃতজ্ঞতা জানাল বারবার, সো কাইভ অফ ইউ…
ডোন্ট বী টু ফরম্যাল টরুণ! তুমি আসছ আর আমি এয়ারপোর্টে আসব না?
থার্ড সেক্রেটারি, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ও কমার্শিয়াল অ্যাটাচি এবং আরো তিন-চারজন। এসেছিলেন অভ্যর্থনা জানাতে। আলাপ-পরিচয় হলো সবার সঙ্গে।
যারা দেশ-বিদেশ ঘুরে থাকেন তারা এয়ারপোর্ট দেখেই সেই দেশ সম্পর্কে বেশ একটা ধারণা করে নিতে পারেন। লন্ডন ও নিউইয়র্ক-দুটি এয়ারপোর্টই বিরাট ও অত্যন্ত কর্মচঞ্চল এবং আধুনিকতমও বটে। তবু বেশ বোঝা যায় যে, দুটি দেশের মাঝখানে রয়েছে অ্যাটলান্টিক! ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মস্কো এয়ারপোর্টও বিরাট ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক মুহূর্ত দেখলেই দুটি দেশের জনজীবন সম্পর্কে একটা ধারণা করতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না।
মস্কোর তুলনায় কাবুল এয়ারপোর্ট অনেক ছোট হলেও বেশ সুন্দর। রাশিয়ার সাহায্যে তৈরি কাবুল এয়ারপোর্ট বড় প্রাণহীন। তবুও ভালো লাগল তরুণের। দাঁড়িয়েই মনে পড়ল দমদম, পালাম…কোনো তুলনাই হয় না।
এম্বাসি থেকে তরুণের জন্য কোয়ার্টার ঠিক করা হয়েছিল কিন্তু মিঃ সেটা কিছুতেই ছাড়লেন না। বীণা উইল কিল মী, যদি তোমাকে বাড়ি না নিয়ে যাই।
তরুণ এয়ারপোর্ট বিল্ডিং থেকে বেরুবার সময় হাসতে হাসতে বললো, দ্যাট আই নো। তবে কি জানেন, একবার বীণাদির খাতির যত্ন পেতে শুরু করলে কি আর কোনোদিন নিজের কোয়ার্টারে যাব?
অ্যাড অ্যাটাচি ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগ নিয়ে চান্সেরীতে চলে গেলেন। অন্যান্যদের কেউ চান্সেরী, কেউ বাড়ি গেলেন।
পাখতুনিস্থান অ্যাভিনিউ ধরে মিঃ মেটার গাড়িতে যেতে যেতে তরুণের মনে পড়ল অনেক দিন আগেকার কথা।-বীণাদি আর তরুণ একই সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছিল। বিয়ের পর বীণাদি যেদিন মিঃ মেটার সংসার করা শুরু করেন, তরুণও সেইদিন প্রথম ফরেন পোস্টিং পেয়ে কাজ শুরু করে। একই প্লেনে দুজনে দিল্লি থেকে রোম গিয়েছিল কিন্তু তখন পরিচয় ছিল না। রোম এয়ারপোর্টে মিঃ মেটা একই সঙ্গে দুজনকে অভ্যর্থনা করেন।
