দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর কণিকা জিজ্ঞেস করেন, বিধুবাবুর ছেলেমেয়েরা কেমন ছিল? উনি ওদের লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে-থা দিয়েছিলেন?
ঐ বাপের ছেলেমেয়ে কী ভাল হয়?
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, বিধুবাবুর চার পাঁচটা মোটর গাড়ি ছিল। হিন্দুস্থানী ড্রাইভার এই গাড়িগুলো চালাত। তখন কবীর রোডে কাননবালাও থাকতেন। উনি একটা প্যাকার্ড গাড়ি চড়তেন বলে বিধুবাবুও প্রায় লাখ খানেক টাকা দিয়ে একটা প্যাকার্ড গাড়ি কিনলেন।……
প্যাকার্ড কি খুব দামী গাড়ি ছিল?
হ্যাঁ, ছোট মা, খুবই দামী গাড়ি ছিল।
উনি একটু থেমে বলেন, তখন কলকাতা শহরে শুধু গভর্নর আর কাননবালাই প্যাকার্ড চড়তেন। ওদের পর বিধু দত্ত আর গোয়েঙ্কারা প্যাকার্ড কেনেন।
বিধুবাবুর ছেলেমেয়েদের কথা বলুন।
ওর মেয়ের কথাই বলব বলেই তো প্যাকার্ড গাড়ির কথা বলতে হল।
কণিকা একটু বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, প্যাকার্ড গাড়ির সঙ্গে মেয়ের লেখাপড়া বা বিয়ে-থার কী সম্পর্ক?
অঘোরনাথ একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, বিধু দত্ত ঐ প্যাকার্ড গাড়ি চালাবার জন্য যে বাঙালি ছোকরাটাকে চাকরি দিয়েছিলেন, সে একদিন ঐ গাড়ি আর বিধু দত্তর মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়।
হা ভগবান!
কিন্তু ছোট মা, তুমি শুনলে অবাক হবে, মেয়েটা ওকে বিয়ে করে সত্যি সুখী হয়েছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, ওরা পালিয়ে যাবার মাস তিনেক পর একদিন ভোরবেলায় উঠে বিধু দত্ত দেখলেন, বাড়ির সামনে তার প্যাকার্ড গাড়িটা রাখা আছে। সামনের সিটের উপর মেয়ের লেখা দুচার লাইনের একটা চিঠি-বাবা, আমি আমার সিদ্ধান্তে ভুল করিনি। আমার স্বামীর অর্থ-প্রতিপত্তি না থাকলেও সে সৎ এবং পরিশ্রমী। আমি আমার স্বামীর কাছে যে মর্যাদা ও ভালবাসা পাচ্ছি, তা অনেকের কপালেই জোটে না।….
বিধু দত্তর ছেলেরা কী করতো?
ওর দুটি ছেলে দুটি অবতার ছিল। দুটোর কোনটাই ম্যাট্রিক পাস করতে না পারলেও গুণের শেষ ছিল না।
আচ্ছা ছোটকাকা, বিধু দত্ত সত্যি সত্যি ব্যাঙ্ক খুলেছিলেন?
হ্যাঁ, ছোট মা, ব্যাঙ্ক খুলেছিলেন।
সে ব্যাঙ্ক এখনও চলছে?
না, না, সে ব্যাঙ্ক করে উঠে গেছে।
উঠে গেছে?
হ্যাঁ।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, এই হতচ্ছাড়া বিধু দত্তর জন্য যে কত হাজার হাজার মধ্যবিত্ত আর ছোটখাটো ব্যবসাদারদের সর্বনাশ হয়েছিল, তা তুমি ভাবতে পারবে না।
উনি একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, এই ব্যাঙ্কের জন্যই তো আমাদের এই দত্ত পরিবারকে বাড়ি থেকে পালাতে হয়েছিল।
কণিকা অবাক হয়ে বলেন, পালাতে হয়েছিল? কেন?
সে অনেক কথা!
.
মাস তিনেক ধরে আলাপ-আলোচনা শলা-পরামর্শের পর ঠিক হল, ব্যাঙ্কের নাম। হবে গ্রেট ক্যালকাটা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন। চেয়ারম্যান হলেন বিধুভূষণ দত্ত। ডিরেক্টর হলেন শ্যামাপদ দত্ত, শিবপদ দত্ত ছাড়াও বিধুবাবুর স্ত্রী শ্রীমতী পারুল দত্ত ও ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ভূতপূর্ব চিফ ক্যাশিয়ার স্নেহময় সরকার।
বিধুবাবু বললেন, বুঝলে শ্যামাপদ, ব্যাঙ্কের কয়েক শ কর্মচারীকে ঠিক মত চালান আর লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকার পাই পয়সা পর্যন্ত হিসেব-নিকেশ রাখা খুব সহজ ব্যাপার না।
শিবপদ একটু হেসে বলেন, তা আমরা খুব ভাল করেই জানি।
তাছাড়া আমাদের ব্যাঙ্কের ভিতরকার খবর-টবর যাতে অন্য ব্যাঙ্কে পৌঁছে না যায়, সেদিকেও যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে।
শ্যামাপদ বললেন, সে তো রাখতেই হবে। তা না হলে আমরা ব্যাঙ্ক চালাব কী করে?
এবার বিধুবাবু বললেন, শ্যামাপদ-শিবপদ, তোমাদের যদি মত থাকে, তাহলে বাইরের কাউকে জেনারেল ম্যানেজার না করে স্নেহময়বাবুকেই জেনারেল ম্যানেজার করলেই বোধহয় ভাল হয়।
প্রস্তাবটা শুনে স্নেহময়বাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন, আমাকে? রিটায়ার করার পর আবার…
শ্যামাপদ বললেন, স্নেহময়বাবু, আপনি জেনারেল ম্যানেজার হলে আমরা কত নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো, তা জানেন?
শিবপদ ওকে বললেন, আপনি ব্যাঙ্কের একজন প্রধান শেয়ার হোল্ডার আর ডিরেক্টর। ব্যাঙ্কের ব্যাপারে আপনার যে দরদ থাকবে, তা কি মাইনে করা লোকের কাছে। পাওয়া সম্ভব?
বিধুবাবু বলেন, ঠিক বলেছ শিবপদ।
শেষ পর্যন্ত স্নেহময়বাবু ওদের প্রস্তাব মেনে নেন।
এদিকে ঠিক হল, বিধুবাবু ও তার স্ত্রী দশ-দশ লাখ করে বিশ লাখ ও শ্যামাপদ শিবপদও বিশ লাখ বিনিয়োগ করবেন। এছাড়া স্নেহময়বাবু পঞ্চাশ হাজার টাকা বিনিয়োগ করবেন; তবে তার অর্ধেক নগদে ও বাকি অর্ধেক মাসিক হাজার টাকার কিস্তিতে। হ্যাঁ, স্নেহময়বাবুর মাইনে ঠিক হল দুহাজার টাকা।
এরপর ওরা ঠিক করলেন, জনসাধারণের আস্থা অর্জনের জন্য প্রথমেই অত্যন্ত ভালভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে দশটি ব্রাঞ্চ খোলা হবে। তারপর প্রত্যেক মাসের পয়লা তারিখে একটি করে নতুন ব্রাঞ্চ খোলা হবে।
বিধুবাবু স্নেহময়বাবুকে বললেন, মিঃ সরকার, এমন করে ব্যাঙ্ক চালাতে হবে যে প্রত্যেকটি লোক যেন স্বীকার করতে বাধ্য হয়, আমাদের ব্যাঙ্কের সঙ্গে বিলিতি ব্যাঙ্কের কোনো পার্থক্য নেই।
হ্যাঁ, আমিও ঠিক তাই চাই।
আর একটা কথা। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন ছাপা হবার আগে যেন এই ব্যাঙ্কের ব্যাপারে কেউ কিচ্ছু না জানতে পারে, সেদিকে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
