অঘোরনাথ চোখ দুটো বড় বড় করে বলেন, তোমাকে কি বলব ছোট মা, ওদের ঐ ব্যাঙ্ক খোলার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার মানুষ সত্যি চমকে উঠল।
চমকে উঠল কেন?
তখন দুতিনটে বিলেতি ব্যাঙ্ক ছাড়া শুধু ইম্পিরিয়্যাল ব্যাঙ্কই বিখ্যাত ছিল। যুদ্ধের বাজারে বেঙ্গল ব্যাঙ্ক, ভবানীপুর ব্যাঙ্ক, ক্যালকাটা ব্যাঙ্ক বা ঐ ধরনের যে ব্যাঙ্কগুলো। গজিয়ে উঠেছিল তারা মোটামুটি ভাল ব্যবসা করলেও দত্তদের ব্যাঙ্কের মত আধুনিকও ছিল না- বা একই সঙ্গে এতগুলো ব্রাঞ্চ খুলে ব্যবসাও শুরু করতে পারেনি।
ওদের ব্যাঙ্ক বুঝি খুব সুন্দর ছিল?
হ্যাঁ, ছোটমা, ওদের ব্যাঙ্কে গেলেই মনে হতো, কোনো বিলিতি ব্যাঙ্কে এসেছি।
উনি একটু থেমে বলেন, দুতিন মাসের মধ্যেই ঐ ব্যাঙ্কের এমন সুনাম হল যে হাজার হাজার লোক অন্য ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে ওদের ব্যাঙ্কে রাখতে শুরু করল।…
কণিকা প্রশ্ন করেন, তাহলে ওদের ব্যাঙ্ক উঠে গেল কেন?
অঘোরনাথ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তখন ব্যাঙের ছাতার মত যতগুলো ব্যাঙ্ক গজিয়ে উঠেছিল, সেগুলো উঠে যায় এক দল লোকের জোচ্চুরি বদমাইশির জন্য।
জোচ্চুরি মানে?
বৃদ্ধ একটু হেসে বলে, বিধু দত্ত স্রেফ জোচ্চুরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই ব্যাঙ্ক খুলেছিল কিন্তু তিনি খুব ভাল করেই জানতেন, শ্যামাপদ-শিবপদ টাকা খাঁটিয়ে লাভ করার জন্যই বিশ লাখ টাকা এই ব্যবসায় ঢেলেছিল।
উনি একটু থেমে বলেন, তাই তো ব্যাঙ্ক একটু জমে উঠতেই বিধু আর ওর চেলা স্নেহময় সরকার ওদের দুভাইকে হাত করার জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন।
.
সাত সকালে সস্ত্রীক বিধু দত্ত ফিরপোর বিরাট দুটো কেক নিয়ে হাজির হতেই শ্যামাপদ আর শিবপদ অবাক।
বিধু দত্ত হাসতে হাসতে বললেন, গ্রেট ক্যালকাটা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশনের ডিরেক্টরদের বাড়িতে তো আর দশ-বিশ টাকার দানাদার হাতে করে আসতে পারি না!
ওর কথা শুনে দুভাই হো হো করে হেসে ওঠেন।
শ্যামাপদ চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলেন, এবার মনে হচ্ছে, আমরা সত্যি ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হয়েছি।
বিধু দত্ত একটু হেসে বলেন, এ তো সবে কলির সন্ধে। এখন দিন দিনই বুঝতে পারবে, এই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হওয়া কত সম্মানের, কত ক্ষমতার।
শিবপদ শ্রীমতী দত্তকে উপরে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতেই বিধুবাবু একটু চাপা হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কী হে, ব্যাঙ্কের ব্যাপারে তোমরা খুশি তো?
শ্যামাপদ খুশির হাসি হেসে বলেন, আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি ব্যাঙ্ক এত ভাল চলবে।
কী হে শিবপদ, তোমার কী মনে হচ্ছে?
শিবপদ একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, আমার তো মনে হচ্ছে, বছর তিনেকের মধ্যেই আমরা আমাদের ইনভেস্ট করা টাকাটা উঠিয়ে নিতে পারব।
বিধুবাবু মুচকি হেসে বললেন, আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের বিশ লাখ টাকা দুবছরের মধ্যেই পেয়ে যাবে।
দুবছরের মধ্যে পেয়ে যাব?
হ্যাঁ, পেয়ে যাবে।
তার মানে বছরে দশ লাখ…
শ্যামাপদ ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, তার মানে মোটামুটি ভাবে মাসে মাসে প্রায় একাশি হাজার টাকা।
বিধুবাবু আলতো করে টেবিল চাপড়ে বলেন, আরে ওর চাইতে বেশিই তো তোমরা ডিরেক্টর হিসেবে পাবে। এর উপর শেয়ার হোল্ডার হিসেবে লাভ তো আছেই।
শিবপদ বলে, আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
বিধুবাবু একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কটা গাড়ি?
তিনটে।
ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হিসেবে ব্যাঙ্ক থেকেই তোমাদের দুটো গাড়ি পাবার কথা।
শ্যামাপদ বলেন, ব্যাঙ্কের গাড়ি পেলে ব্রাঞ্চগুলো একটু ঘুরে-ফিরে দেখার সুবিধে হয়।
শোনো শ্যামাপদ, ব্যাঙ্ক থেকেই তোমাদের দুটো গাড়ি কিনে দেওয়া হবে।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তোমাদের গাড়ি তোমাদের কাছেই থাকবে। মাঝখান থেকে তোমরা দুটো গাড়ির জন্য লাখ খানেক টাকা পেয়ে যাবে আর গাড়ি দুটো চালাবার অন্য সব খরচও ব্যাঙ্ক দেবে।
শিবপদ খুশির হাসি হেসে জিজ্ঞেস করেন, দুজন ড্রাইভারের মাইনেও ব্যাঙ্ক দেবে?
একশবার দেবে।
বিধুবাবু একটু হেসে বলেন, ভুলে যেও না শিবপদ, আমরা ভাল টাকা আয় করব বলেই ব্যাঙ্কের ব্যবসা শুরু করেছি; ব্যাঙ্কের টাকাকড়ি বিলিয়ে দেবার জন্য আশ্রম খুলিনি।
শ্যামাপদ জিজ্ঞেস করেন, আপনি আর বৌদিও গাড়ির জন্য ব্যাঙ্ক থেকে টাকা…
সব ডিরেক্টরেরই সমান সুযোগ পাওয়া উচিত, তাই না?
উনি সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, তোমাদের আপত্তি না থাকলে আমরা দুজনেও একই ভাবে। ব্যাঙ্ক থেকে লাখখানেক নেব।
না, না, আপত্তির কী আছে!
তাহলে কাল এগারটা নাগাদ তোমরা দুজনেই হেড অফিসে এসা। এই গাড়ির ব্যাপারটা তখনই মিটিয়ে ফেলা যাবে।
হ্যাঁ, ঠিক আছে।
বিধুবাবু একটু হেসে বলেন, আমাদের দুজনের কাগজে তোমরা সই করবে আর তোমাদের কাগজে আমরা সই করব। ব্যস! তাহলেই কোন ঝামেলা থাকবে না।
শিবপদ বললেন, আমরা ডিরেক্টর হিসেবে তো এসব করতেই পারি, তাই না?
বিধুবাবু সামনের সেন্টার টেবিলের উপর একটা ঘুষি মেরে বেশ জোরের সঙ্গেই বলেন, আমরা তিনজন ডিরেক্টর এক মত হলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারি।
ঠিক সেই সময় শ্রীমতী দত্ত উপর থেকে নেমে এসে ড্রইংরুমে পা দিয়েই স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আচ্ছা, আমরা টি ব্যাঙ্কের টাকায় বাইরে যেতে পারি?
বাইরে মানে?
বাইরে মানে দিল্লি- বোম্বে এলাহাবাদ-লক্ষ্ণৌ…
