বিধুবাবুদের জন্য দুর্ভিক্ষ হয়েছিল?
হ্যাঁ, ছোট মা, বিধুবাবুর মত কয়েকজন বিবেকহীন হৃদয়হীন স্বার্থপর লোভী ব্যবসাদারের জন্যই পঞ্চাশ লাখ লোক না খেয়ে মারা যায়।
অঘোরনাথ একটু থেমে কণিকার দিকে তাকিয়ে বলেন, জাপান একটা পর একটা দেশ দখল করে ভারতবর্ষের দিকে এগিয়ে আসতেই লক্ষ লক্ষ ইংরেজ-আমেরিকান অস্ট্রেলিয়ান সৈন কলকাতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বহু শহরে ছড়িয়ে পড়ল।
কণিকা কোন প্রশ্ন না করে অপলক দৃষ্টিতে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বৃদ্ধ বলে যান, ঐ লক্ষ লক্ষ সৈন্যসামন্ত আর যুদ্ধের ব্যাপারে হাজার রকম কাজে নিযুক্ত লোকজনদের খাওয়াবার জন্য গভর্নমেন্ট বাজার থেকে চাল কেনা শুরু করল।
অঘোরনাথ একটা তুড়ি দিয়েই বলেন, ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে চালের দাম পাঁচ টাকা থেকে দশ টাকা, দশ টাকা থেকে বিশ টাকা, বিশ টাকা থেকে……
ওর কুথার মাঝখানেই কণিকা প্রশ্ন করেন, তখন কি এক কিলো চালের দাম পাঁচ টাকা ছিলো?
না, না, কিলো-টিলো না। যুদ্ধ শুরু হবার পরও চালের মণ পাঁচ টাকা ছিল।
কণিকা একটু হেসে বলেন, তখন চাল এত সস্তা ছিল? অঘোরনাথ একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, ছোট মা, তখন সব কিছুই সস্তা ছিল। সরষের তেল ছিল পাঁচ আনা সের। আমাদের এই ভবানীপুরের বাড়ি থেকে ট্যাক্সিতে হাওড়া স্টেশন যেতাম এক টাকা দু আনায় আর হাওড়া থেকে এলাহাবাদের ইন্টার ক্লাশের ভাড়া ছিল আট টাকা।
কণিকা হাসতে হাসতেই বলেন, এ তো রাম রাজত্বের কাহিনী শোনালেন।
আমি জানি ছোট মা, এসব তোমাদের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকেই জিনিস-পত্তরের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করল।
উনি একটু থেমে বলেন, এখন তো তুমিই দশ টাকা দিয়ে এক কিলো চাল কিনছ কিন্তু তখন চালের মণ চল্লিশ টাকা হওয়ায় পঞ্চাশ লাখ লোককে না খেয়ে মরতে হয়েছিল।
বিধুবাবুও এর জন্য দায়ী?
এক শ বার দায়ী।
অঘোরনাথ বেশ জোরের সঙ্গেই কথাটা বলে একটু থামেন। তারপর আবার শুরু করেন, যুদ্ধ শুরু হবার আগে বার্মা থেকে চাল না আনলে আমাদের প্রয়োজন মিটত না কিন্তু যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই বার্মা থেকে চাল আসা বন্ধ হয়ে গেল। তবু দেশের ধান-চাল খেয়েই দেশের মানুষ কোনমতে বাঁচতে পারতো কিন্তু তখন ইংরেজদের কাছে যুদ্ধে লড়াই করাই সব চাইতে বড় ব্যাপার। দেশের লোক মরলো কি বাঁচলো, তাতে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে অঘোরনাথ কয়েক মিনিট চুপ করে থাকেন।
তারপর আবার উনি বলেন, পাঞ্জাবের ইস্পাহানী সাহেবকে গভর্নমেন্টই বাংলাদেশের বাজার থেকে লক্ষ লক্ষ মণ চাল কেনার কনট্রাক্ট দিলেন। আর ইস্পাহানী এই দায়িত্ব যে তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দিলেন, তার একজন ছিলেন এই বিধু দত্ত।
অঘোরনাথ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বুঝলে ছোট মা, ঐ ইস্পাহানীর পরামর্শে এই বিধু দত্তরা বাজারের দরের চাইতে দু পাঁচ টাকা বেশি দাম দিয়ে রোজ হাজার হাজার মণ চাল কিনতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বাড়তে শুরু করল।
এই বিধু দত্ত কী ভবানীপুরেরই লোক?
না, না, ও কোন কালেই আমাদের পাড়ায় থাকেনি।
উনি একটু থেমে বলেন, শুনেছি, আগে বিধু দত্ত বারো টাকা ভাড়ায় কালীঘাটের একটা বাড়ির দুখানা ঘরে চারটি ছেলেমেয়ে ছাড়া মা আর বউকে নিয়ে থাকত।
তারপর কোথায় থাকতেন?
অঘোরনাথ একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, বিধু দত্ত সমস্ত উত্তর বাংলা–মানে দার্জিলিং, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, রাজশাহি, দিনাজপুর, রংপুর, মালদা, জলপাইগুড়ি–এই আটটা জেলা থেকে চাল কেনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এক একটা জেলার লাভ দিয়ে উনি কলকাতায় এক একটা বাড়ি করেন বা কেনেন।
তার মানে ওর আটটা বাড়ি ছিল?
হ্যাঁ।
উনি একটু থেমে বলেন, তার মধ্যে কবীর রোড, সাদার্ন অ্যাভিনিউ বা আমির আলি অ্যাভিনিউয়ের বাড়িগুলো তো প্রাসাদের মত ছিল।
তার মানে উনি প্রচুর টাকা আয় করেছিলেন।
হ্যাঁ, দু তিন কোটি টাকা নিশ্চয়ই আয় করেছিলেন।
বৃদ্ধ মুহূর্তের জন্য না থেমেই বলেন, আর কি জানো ছোট মা, এই পাপের টাকা আয় করার ফলও উনি হাতে হাতে পেয়েছিলেন।
কী ফল পেয়েছিলেন?
যে দিনই উনি দশ-বিশ লাখ টাকার চেক নিয়ে বাড়িতে এসেছেন, সেই সব দিনই ওর এক একটা সর্বনাশ হয়েছে।
তাই নাকি?
অঘোরনাথ গম্ভীর হয়ে বলেন, প্রথম দিন যেদিন উনি মোটা টাকার চেক পান, সেদিনই ওঁর স্ত্রী মারা যায়। মাস তিনেক পর আবার যেদিন দশ-বারো লাখ টাকার চেক পান, সেদিনই ওর মা আগুনে পুড়ে মারা যায়।
বলেন কী ছোটকাকা?
শুনলে তুমি অবাক হবে ছোট মা, কবীর রোডের বাড়ির গৃহপ্রবেশের দিনই তিন তলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে ওঁর ছোট ছেলে মারা যায়।
কণিকা একটু মুখ বিকৃতি করে বলেন, এতগুলো সর্বনাশের পরও বিধুবাবুর মাথা ঠিক ছিল?
বৃদ্ধ একটু মুখ বিকৃত করে বলেন, এই সর্বনাশের পর বিধু দত্ত বড়ছেলের বিয়ে দেবার জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে মেয়েটিকে ওর এত ভাল লেগে গেল যে ঐ মেয়েটিকে উনি নিজেই বিয়ে করেন।
এ রাম! রাম!
কণিকা একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, মেয়েটার বাড়ির লোকজন রাজি হল কীভাবে?
বিধু দত্তর বাড়ি-গাড়ি টাকাকড়ি দেখে বেচারীদের মাথা ঘুরে গিয়েছিল।
