এসব আমরা ভাবতেই পারি না।
ছোটমা, তখন শুধু কলকাতায় না, বিহার আর নোয়াখালিতে যা ঘটেছিল, তা কোনো সভ্য দেশে ঘটে না।
তখন দত্তদের কী অবস্থা?
যুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে দেশ স্বাধীন হবার বছর খানেক বছর দেড়েক পর্যন্ত ওঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল না বললেই হয়। এই সময়ই সেজবাবু আর ন’বাবু ওঁদের স্ট্রান্ড রোডের বিশাল গুদাম আর ক্যানিং স্ট্রিট-চীনাবাজার এলাকার দুটো অফিস জালানদের কাছে বিক্রি করে দেন।
তারপর কি ওঁরা আর ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি?
অঘোরনাথ একটু চাপা হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ, করেছিলেন বৈকি। তবে এমনি কোনো ব্যবসা না, ব্যাঙ্কের ব্যবসা।
কণিকা অবাক হয়ে বলেন, ব্যাঙ্কের ব্যবসা?
উনি আগের মতোই চাপা হাসি হেসে বলেন, হ্যাঁ, ছোটমা, ব্যাঙ্কের ব্যবসা।
ব্যাঙ্কের ব্যবসা মানে? তাহলে তোমাকে একটু খুলেইই বলি।
.
সেদিন রবিবার।
সাত সকালে বাড়ির সামনে বিরাট ফোর্ড গাড়িটাকে থামতে দেখেই সেজবউ স্বামীকে বললেন, হ্যাঁগো, তোমার কাছে বোধহয় কেউ এসেছেন।
কে আবার এলেন এই সাত সকালে?
ভদ্রলোককে ঠিক চিনতে পারলাম না।
সেজবউ একটু থেমে বললেন, তবে ভদ্রলোককে দেখে মনে হলো, বোধহয় রাধার বিয়েতে এসেছিলেন।
ঠিক সেই সময়ই মাখন এসে বলল, সেজবাবু, বিধু দত্ত আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
সেজবাবু অবাক হয়ে বললেন, বিধু দত্ত নিজে এসেছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
শ্যামাপদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েই বলেন, বৈঠকখানায় বসিয়েছিস তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
পাখা খুলে দিয়েছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
সেজবাবু নিচে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েই মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে স্ত্রীকে বললেন, সেজবউ, চট করে ঠৈকখানায় চা-জলখাবার পাঠিয়ে দাও।
স্ত্রীর উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই উনি তর তর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যান।
.
সেজবাবুকে বৈঠকখানা ঘরে ঢুকতে দেখেই বিধু দত্ত এক গাল হেসে বলেন, এসো, শ্যামাপদ, এসো। টেলিফোন না করে এসে গেলাম বলে কী…..
সেজবাবুও একগাল হাসি হেসে বলেন, আপনি কেন কষ্ট করে এলেন আমাকেই তো ডেকে পাঠাতে পারতেন।
সেজবাবু পাশের সোফায় বসতেই বিধুবাবু বললেন, যে বাড়িতে ছোটবেলায় হরদম। এসেছি খেয়েছি, সেখানে এলে যে ভাল লাগে, তা কি জানো না?
কথাটা শুনে সেজবাবু একটু হাসেন।
বিধুবাবু বললেন, শিবপদ কি বাড়িতে আছে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছে।
তাহলে ওকেও ডাক দাও।
বিধুবাবুমুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তোমাদের দুজনের সঙ্গে একটু জরুরি পরামর্শ আছে।
বিধুবাবু চা-জলখাবার খেতে খেতে ন’বাবু হাজির হন।
দুপাঁচ মিনিট পারিবারিক কথাবার্তা বলার পর বিধুবাবু অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, যুদ্ধে যত ক্ষয়-ক্ষতিই হোক, তোমরা নিশ্চই স্বীকার করবে, যুদ্ধের কৃপায় হাজার হার বাঙালি ব্যবসা করতে শিখেছে ও প্রায় সবাই বেশ ভাল টাকাই আয় করেছে।
সেজৰাবু বললেন, তা ঠিক।
শিবপদ একটু হেসে বলেন, আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধবই তো একজোট হয়ে, যশোর এয়ারফোর্সে স্টেশনে নানা ধরনের কাজকর্ম করে রাজা হয়ে গেছে।
বিধুবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, তোমরা নিশ্চই স্বীকার করবে, এইসব লোকজন যেভাবেই হোক আবার নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করবে।
সম্মতিতে দুভাই মাথা নাড়েন।
উনি বলে যান, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হলে এদের আরো টাকা লাগবে এবং ব্যাঙ্ক ছাড়া কেউই সে লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি টাকার যোগান দিতে পারবে না।
শ্যামাপদ বললেন, কিন্তু ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্ক কি ওদের সবাইকে টাকা দিতে রাজি হবে?
বিধুবাবু একটু হেসে সামনের গোল টেবিলে একটা চাটি মেরে বললেন, কখনোই দেবে না।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক এইজন্যই ঠিক করেছি, আমরা কয়েকজন মিলে নতুন ব্যাঙ্ক খুলব।
শ্যামাপদ বললেন, যেমন ত্রিদিব লাহা কর্নওয়ালিশ ব্যাঙ্ক খুলেছেন, সেইরকম?
হ্যাঁ।
শিবপদ বললেন, এই কমাসের মধ্যেই তো ওরা বোধহয় সাত-আটটা ব্রাঞ্চ খুলে ফেলেছেন।
লোকে যদি টাকা রাখতে চায়, তাহলে ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চ খুলবে না কেন?
এবার উনি একটু হেসে বলেন, আমাদের নতুন ব্যাঙ্কে তোমরাও থাকবে। তোমরা ভাইই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হবে।
শ্যামাপদ আর শিবপদ একই সঙ্গে বলেন, আমরা?
বিধুবাবু বেশ জোরেই হাসতে হাসতে বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমরা।
.
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, বুঝলে ছোটমা, এই বিধুবাবু তখনকার দিনে এক স্মরণীয় ব্যক্তি ছিলেন।
ওর কথার ইঙ্গিত ঠিক বুঝতে না পেরে কণিকা জিজ্ঞেস করেন, স্মরণীয় ব্যক্তি ছিলেন মানে? উনি কি খুব বড়লোক, নাকি নাম করা পণ্ডিত মানুষ ছিলেন?
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর হয়ে বলেন, দুঃখের কথা কি বলব ছোট মা, তেতাল্লিশের মন্বন্তরে আমাদের এই বাংলা দেশে যে পঞ্চাশ লাখ লোক না খেয়ে মারা যায়, তার মধ্যে অন্তত পনের-বিশ লাখ লোকের মৃত্যুর জন্য এই বিধুবাবু দায়ী ছিলেন।
কণিকা চমকে উঠেন, বলেন কী ছোটকাকা?
হ্যাঁ, ছোট মা, ঠিকই বলছি।
উনি মুহূর্তের জন্য থামতেই কণিকা জিজ্ঞেস করেন, ঐ তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে পঞ্চাশ লাখ মারা যায়? সে বছর কি দেশে ধান-চাল হয়নি?
ধান-চালের অভাবে তো সেবার দুর্ভিক্ষ হয়নি। সেবারের দুর্ভিক্ষ তো বিধুবাবুর মত কিছু ব্যবসাদার সৃষ্টি করেছিলেন।
