দুভাই প্রায় এক সঙ্গেই বললেন, তাহলে তো সর্বনাশ।
বড়বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সত্যি সত্যিই যদি বিলেত থেকে যন্ত্রপাতি আসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তো আমাদের আসল ব্যবসাটাই উঠে যাবে।
সেজবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, হ্যাঁ, তা তো হবেই।
ন’বাবু বললেন, বড়দা, কারখানা করার ব্যাপারে আপনার কী মত?
বড়বাবু বললেন, সব চাইতে বড় কথা হচ্ছে, কারখানার ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শুধু টাকা থাকলেই তো কারখানা চালানো যায় না।
সেজবাবু বললেন, আমরা বরাবর বিলেত থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি বিক্রি করেই আয় করেছি।
বড়বাবু সঙ্গে বললেন, ব্রিজ তৈরি করেও তো আমাদের কম আয় হয় না।
তা ঠিক কিন্তু সে কাজ তো অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিই।
কারখানাও তো আমরা অন্যদের দিয়ে চালিয়ে নিতে পারি।
বড়বাবু প্রায় না থেমেই বলেন, সমস্যাটা সেখানে না। আসল চিন্তার বিষয় হচ্ছে, কারখানায় কী তৈরি করা হবে, কারখানা চালাবার উপযুক্ত লোক কোথায় পাওয়া যাবে, কারখানায় তৈরি মালপত্র, কোথায় বিক্রি করা যাবে ইত্যাদি।
ন’বাবু বললেন, বড়দা, আমরা কী এইসব ঝামেলা সামলাতে পারব?
সব ব্যবসাতেই ঝামেলা আছে। তবে কারখানা চালাতে পারবে কি না তা তোমরাই ভেবে দেখ।
সেজবাবু একটু হেসে বলেন, বড়দা, আমরা এঞ্জিনিয়ারও না, বি. এ.-এম. এ পাসও করিনি। আমাদের দ্বারা কি কারখানা চালানো সম্ভব?
বড়বাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, ব্যাপারটা যে খুব সহজ না, তা আমি জানি কিন্তু তবু তোমরা ভেবে দেখে আমাকে জানিও।
.
১০.
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, বুঝলে ছোটমা, ওরা ভাবনা চিন্তা আর এর-ওর সঙ্গে পরামর্শ করতে করতেই হিটলারের সৈন্যরা পোল্যান্ড আক্রমণ করেই দখল করে নিল।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমেই বললেন, সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেন আর ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেই শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
কণিকা প্রশ্ন করেন, সঙ্গে সঙ্গেই কি বিলেত থেকে এখানে যন্ত্রপাতি আসা বন্ধ হয়ে গেল?
খুব জরুরি জিনিসপত্র ছাড়া সবকিছু আসা বন্ধ হয়ে গেল।
দত্তদের ব্যবসার কী হলো?
যুদ্ধ শুরু হবার প্রথম দিকে ওরা ভালই ব্যবসা করেন।…
কী ভাবে?
গুদামে যেসব যন্ত্রপাতি ছিল, তা বেশ চড়া দামে বিক্রি করতেন। তাছাড়া জার্মানি নরওয়ে-ডেনমার্ক-নেদারল্যান্ড ইত্যাদি জয় করে ফ্রান্স আক্রমণ না করা পর্যন্ত বিলেত থেকে যে সামান্য যন্ত্রপাতিই আসুক না কেন, তাও বেশ চড়া দামে বিক্রি করে দত্তরা ভালই আয় করেন।
তারপর?
তারপর যুদ্ধ আরো ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলেত থেকে জাহাজ আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। কদাচিৎ কখনও এক-আধটা জাহাজ এলেও তাতে যন্ত্রপাতি কখনই আসত না।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, যুদ্ধ শুরু হবার বছর দেড়-দুই পর থেকেই দত্তদের এজেন্সির ব্যবসা প্রায় বন্ধই হয়ে গেল।
কণিকা বললেন, ওঁরা, তো ব্রিজও তৈরি করতেন।
হ্যাঁ, করতেন।
উনি একটু থেমে বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিকে যুদ্ধে খরচ চালাবার জন্য গভর্নমেন্ট শুধু ব্রিজ তৈরি না, অনেক কাজই বন্ধ করে দেয়। তারপর জাপান যখন একটার পর একটা দেশ দখল করে বার্মা আর ভারতের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল, তখন গভর্নমেন্ট সৈন্য-সামন্ত গাড়ি-ঘোড়া ট্যাঙ্ক নিয়ে যাবার জন্য আসামের দিকে তড়িঘড়ি করে রাস্তাঘাট-ব্রিজ বা এয়ার ফিল্ড তৈরি শুরু করল।
অঘোরনাথ একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, হ্যাঁ, তখন হাজার হাজার নতুন কন্ট্রাক্টরদের সঙ্গে ওঁরাও বেশ ভালই কাজ পেয়েছিলেন।
তারপর ওঁরা কী ব্যবসা করেন?
বলছি ছোটমা, সব বলছি।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ঐ যুদ্ধের বাজারেই ওরা মেজবাবুর মেয়ের বিয়ে দিলেন খুবই ধুমধাম করে। যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে বড়বাবু মারা গেলেন।
তারপর?
উনিশ শ পঁয়তাল্লিশ সালের মে মাসে জার্মানি আর আগস্ট মাসে জাপান আত্মসমর্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো ঠিকই কিন্তু সারা দেশের অবস্থা তখন খুবই খারাপ।
খারাপ মানে?
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, ছোটমা, তখন তুমি নেহাতই শিশু ছিলে বলে কিছুই বুঝতে পারেনি।
উনি একটু থেমে বলেন, তখন টাকা দিয়েও চাল-ডাল-তেল-নুন-কাপড় চোপড় পাওয়া দুষ্কর ছিল। যুদ্ধ হঠাৎ থেমে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ লোক রাতারাতি বেকার হয়ে গেল। এককথায় তখন চারদিকেই হাহাকার অবস্থা।
কণিকা চুপ করে শুধু ওঁর কথা শোনেন।
অন্য দিকে রাজনীতিতেও তখন টালমাটাল অবস্থা। কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের জন্য যেসব কংগ্রেস নেতা আর কর্মীরা জেলে ছিলেন তারা জেল থেকে ছাড়া পেলেও মুসলিম লিগের দৌরাত্ম্যে যখন-তখন এখানে-ওখানে মারামারি কাটাকাটি লেগেই থাকত।
অঘোরনাথ একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, এদিকে দেশ স্বাধীনতার দিকে যতই এগুচ্ছে ততই মারামারি কাটাকাটি বাড়তে লাগল।
উনি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলেন, বুঝলে ছোটমা, মুসলিম লিগের ডায়রেক্ট অ্যাকশানের দিন লিগের হাজার হাজার লাখ লাখ গুণ্ডারা মুড়ি-মুড়কির মতো হিন্দুদের খুন করল।
কণিকা গম্ভীর হয়ে বলেন, হ্যাঁ, বাবা-মার কাছে শুনেছি, তখন ঐ খুন-খারাপির জন্য আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে ওঁদের পালাতে হয়েছিল।
ছোটমা, তুমি শুনলে অবাক হবে, সারা শহরে যখন তাণ্ডব চলছে, তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দী সাহেব পুলিশকে কিচ্ছু করতে দেননি। কদিন পর যখন হিন্দুরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করল, তখনই প্রথম পুলিশকে রাস্তায় দেখা গেল।
