.
বিলেত থেকে এই চিঠি পাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেজবাবু আর ন’বাবু বেশ চিন্তায় পড়লেন।
শ্যামাপদ গম্ভীর হয়ে বললেন, এতদিন পর্যন্ত মালপত্র বিক্রি করে টাকাকড়ি হাতে পাবার তিন-চার মাস পরে আমরা ঐসব কোম্পানির পাওনা মিটিয়েছি বলেই আমরা এতগুলি কোম্পানির এজেন্সি চালাতে পেরেছি।
শিবপদ বললেন, তা আর জানি না! খুব ভাল করেই জানি।
কিন্তু এখন থেকে অর্ডারের সঙ্গে অর্ধেক টাকা পাঠাতে হলে তো আমাদের পক্ষে আগের মতো মালপত্র আনানোই অসম্ভব হয়ে উঠবে।
দুএক মিনিট চিন্তাভাবনা করার পর ন’বাবু বললেন, একবার বড়দার সঙ্গে পরামর্শ করলে বোধহয় ভাল হয়।
সেজবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, বড়দার সঙ্গে পরামর্শ করার কথা আমার অনেক আগেই মনে হয়েছে কিন্তু তিনি কি ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপারে আর মাথা ঘামাবেন?
আমরা তো তাঁকে রোজ রোজ বিরক্ত করবো না।
শিবপদ একটু থেমে বলেন, এখন যে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে, শুধু সেই ব্যাপারে তার মতামত জেনে নেব।
ঠিক আছে; আজ রাত্রেই আমি বড়দার সঙ্গে কথা বলব।
দুর্গাপদ প্রথমে রাজি না হলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছু শোনার পর বললেন, আমাকে একটু ভাবতে দাও। দুএকদিন পর আমি তোমাদের দুজনের সঙ্গেই কথা বলব।
পরের দিনই রাত্রিতে উনি দুভাইকে বললেন, কালই তোমরা মিঃ কেলি বা ব্রাউন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে খোঁজ নাও, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ম-কানুন কি সাময়িক ব্যাপার নাকি অনেকদিন চলবে।
বড়বাবু একটু থেমে বলেন, ব্যাপারটা সাময়িক হলে বিশেষ কোনো চিন্তার কারণ। নেই কিন্তু এই টাকাকড়ির কড়াকড়ি বা মালপত্র আসার ব্যাপারে খানিকটা অনিশ্চয়তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়।
সেজবাবু বললেন, আমি কালই ওঁদের সঙ্গে দেখা করে দেখি ওরা কি বলেন।
মিঃ কেলি সেদিনই জরুরি কাজে মাদ্রাজ রওনা হবেন বলে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন তাই শ্যামাপদ মিঃ ব্রাউনের সঙ্গে দেখা করে সবকিছু খোলাখুলি জানতে চাইলেন।
মিঃ ব্রাউন হাতের সিগারেটটা ধরাতে গিয়েও না ধরিয়ে বললেন, মিঃ দাত্তা, তোমাদের ফ্যামিলির সঙ্গে আমাদের কোম্পানির কী সম্পর্ক, তা অত্যন্ত ভালভাবে জানি বলেই তোমাকে আমি ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, অবস্থা দিন দিনই খারাপ হবে।
স্যার, আপনিই বলুন, আমাদের কী করা উচিত।
মিঃ ব্রাউন সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আমাদের কোম্পানিগুলো যেমন অর্ধেক দাম অ্যাডভান্স নিচ্ছে, আপনারাও সেইরকম অ্যাডভান্স নিতে পারলে সব চাইতে ভাল হয়, কিন্তু গভর্নমেন্টের কোনো ডিপার্টমেন্টই তো অ্যাডভান্স দেবে না।
উনি একটু থেমে বলেন, এখানকার দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোও অ্যাডভান্স দেবে কি না তা আমি বলতে পারবো না। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পরিস্থিতি যখন বিশেষ ভাল না, তখন আপনারা যদি সব বিলেতি মালেরই দাম কিছু বাড়িয়ে দেন, তাহলে বোধহয় সকলে তা মেনে নিতে বাধ্য হবে।
শ্যামাপদ ধন্যবাদ জানিয়ে উঠতেই মিঃ ব্রাউন জিজ্ঞেস করলেন, হোয়ার ইজ বড়বাবু? উনি কী এখনও ভারানসীতে?
না, স্যার; উনি এখন এখানেই আছেন।
গুড!
মিঃ ব্রাউন মুহূর্তের জন্য থেমে বললেন, যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে উনি যেন আমার সঙ্গে একদিন দেখা করেন।
না না স্যার, অসুবিধে কেন হবে? উনি নিশ্চয়ই দুএকদিনের মধ্যেই আপনার সঙ্গে দেখা করবেন।
ব্রাউন সাহেব একটু হেসে বলেন, তুমি কি জানো, ডুগাপড়োকে আমি বন্ধু মনে করি?
শ্যামাপদ একগাল হেসে বলেন, খুব জানি স্যার!
.
দুদিন পর বড়বাবু ঘরে পা দিতেই মিঃ ব্রাউন চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ওর সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, ডুগাপডো, তুমি এসেছো বলে আমি খুব খুশি।
ঘরের কোণের দুটি চেয়ারে পাশাপাশি বসে নানা কথাবর্তার পর মিঃ ব্রাউন গম্ভীর হয়ে বললেন, ডুগাপডো, তুমি আমাদের কোম্পানির ক্যালকাটা এজেন্ট হলেও তোমাকে আমি বন্ধু মনে করি বলেই দুএকটা কথা বলতে চাই।
উনি একটু থেমে বলেন, ডুগাপডো, আমি তোমাকে খোলাখুলি বলছি, ইউরোপের অবস্থা বিশেষ ভাল মনে হচ্ছে না। ফ্রান্স আর আমাদের ইংল্যান্ড মিউনিকে হিটলারের সঙ্গে চুক্তি সই করলেও কখন কী হয়, কিছু বলা যায় না।
বড়বাবু চুপ করে ওঁর কথা শোনেন।
সত্যি কথা বলতে কি দুবছর আগে মুসোলিনি হঠাৎ কাউকে তোয়াক্কা না করে ইথিওপিয়া দখল করে নেবার পর থেকেই ইউরোপের সব দেশই বেশ চিন্তায় পড়েছে।
মিঃ ব্রাউন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ডুগাপডো, একটা কথা আমি তোমাকে খুব গোপনে বলতে চাই যে বিলেতের কোনো কোম্পানিই আগের মতো মালপত্র পাঠাতে পারবে না। এই অবস্থা কত দিন চলবে, তা কেউ বলতে পারবে না।
এতক্ষণ চুপ করে এইসব কথা শোনার পর বড়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, নিছক বন্ধু হিসেবে বলুন, আমাদের কী করা উচিত।
বিলেত থেকে কম-বেশি যেরকমই মালপত্র আসুক না কেন, এজেন্সির কাজ চালিয়ে যাও কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এখানেই ছোটখটো যন্ত্রপাতি তৈরি করা শুরু করে দাও।
ব্রাউন একটু থেমে বলেন, বিলেত থেকে এখনই যন্ত্রপাতি আনিয়ে চটপট একটা ফ্যাক্টরি চালু করে দাও। বেশি দেরি করলে এই সুযোগটুকুও বোধহয় থাকবে না।
.
দুর্গাপদ বাড়ি ফিরেই দুই ভাইকে ব্রাউন সাহেবের সব কথা বললেন। তারপর দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর উনি বললেন, কেন জানি না, ব্রাউন সাহেবের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হলো, বিলেত থেকে যন্ত্রপাতি আসা হয়তো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে।
