বড়বউ হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন, তুমি মুক্তি নিয়ে হিমালয়ে যাও কিন্তু আমাকে এভাবে শাস্তি দিও না। ভবানীপুরের ঐ সংসারই আমার কাশীগয়া-বৃন্দাবন।
এই ভাবেই প্রায় বছরখানেক কেটে যায়।
সেদিন নরেশবাবুর সঙ্গে গল্পগুজব করে দুর্গাপদ বাড়িতে পা দিতে না দিতেই রাধা লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল, জ্যেঠু, ছোটকাকার খুব অসুখ। বড়মা খুব কাঁদছে।
উপরের বারান্দায় উঠতেই গগনের মা একটা ছোট্ট সাদা খাম দুর্গাপদর হাতে দিয়ে বলল, আপনি বেরিয়ে যাবার পরপরই এই তার এসেছে।
টেলিগ্রামের উপর দিয়ে চোখ বুলিয়েই দুর্গাপদ আপনমনে অস্ফুট স্বরে বলেন, টাইফায়েড।
রাধা সঙ্গে সঙ্গে বলে, পাশের বাড়ির বড়কাকু এই টেলিগ্রাম পড়ে বললেন, ছোট, কাকার খুব অসুখ।
দুর্গাপদ ধীর পদক্ষেপে ঘরে ঢুকে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, বড়বউ, কান্নাকাটি করো না। ওঠো। আমরা আজই কলকাতা রওনা হব।
.
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, দেখো ছোট মা, আমাদের পাড়ার অনেক পরিবারই নিছক ফুর্তি করে, বদমাইশি করে বা খামখেয়ালিপনার জন্য পথের ভিখিরি হয়ে গেছে কিন্তু দত্তদের সম্পর্কে এ ধরনের কথা কেউ বলতে পারবে না।
কণিকা বলেন, বনবিহারী দত্তর তো রক্ষিতা ছিল। তাছাড়া মেজবাবুও ত….
হ্যাঁ, ছোটমা, বনবিহারি দত্তর রক্ষিতা ছিল ঠিকই কিন্তু তার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের, কোনো ক্ষতি করেননি।…
কিন্তু মেজবাবু?
মেজবাবু অনেকগুলো টাকা নষ্ট করেছেন ঠিকই কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের আয় এক পয়সাও কমেনি।
তাহলে ওদের সবকিছু গেল কী ভাবে?
বলতে পার, আট আনা অদৃষ্টের জন্য আর আট আনা নিছক বোকামির বা রক্ষণশীলতার জন্যই ওরা শেষ হয়ে গেল।
কণিকা একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, অদৃষ্টের জন্য মানে?
অঘোরনাথ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ছোটমা, আজকাল ম্যালেরিয়া কালাজর তো দুরের কথা, কলেরা-টাইফায়েড বা টি.বি হলেও কেউ মরে না কিন্তু চল্লিশের দশকেও অন্তত দশ-পনের লক্ষ বাঙালি প্রত্যেক বছর ম্যালেরিয়ায় মারা যেতো। কলেরা-টাইফায়েড-টি.বি.হলে তো কাউকেই বাঁচান যেতো না।
আজকালকার দিনের ছেলেমেয়েরা এসব শুনলে বিশ্বাসই করতে পারবে না।
জানি।
উনি একটু থেমে বলেন, আমার মা মারা যান নিউমোনিয়ায় আর তোমার শ্বশুর মারা যান টাইফয়েডে কিন্তু আজকাল তো ঐসব অসুখে প্রায় কেউই মারা যায় না।
তা তো বটেই।
যাই হোক, দত্তবাড়ির ছোটবাবু মানে গুরুপদও মারা গেলেন টাইফয়েডে। কাশী থেকে বড়বাবু বড়বউ আসার আগেই কি মারা যান?
না, না, ওঁরা আসার পনের কুড়ি দিন পর মারা যান।
অঘোরনাথ মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ওঁকে বাঁচাবার জন্য তিন ভাই আর তিন বউ যে কি চেষ্টা করেছিলেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। নলিনী সেনগুপ্তর মতো বিখ্যাত ডাক্তার সকাল-বিকেল এসে দেখে যেতেন। একবার মনে হয়েছিল, ছেলেটা বোধহয় ভালই হয়ে গেল কিন্তু ঠিক তার দুদিনের মধ্যেই ছেলেটা চলে গেল।
বড়বউ নিশ্চয়ই খুব ভেঙে পড়েছিলেন?
ঠিক দেড় মাস পর হার্টফেল করে উনিও মারা গেলেন।
বড়বউও মারা গেলেন?
হ্যাঁ, ছোটমা, উনি এই আঘাত সহ্য করতে না পেরেই চলে গেলেন! যে দেওরকে ঠিক নিজের ছেলের মতো মানুষ করেছেন, ভালবেসেছেন তার মৃত্যু সহ্য করা কী সহজ ব্যাপার?
ইস! কি দুঃখের ব্যাপার!
বৃদ্ধ অঘোরনাথ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে যান, দত্তবাড়ির এই বড়বউকে আমরা মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করতাম। সত্যি কথা বলতে কি, উনি এই পাড়ার সব ছোট ছেলেমেয়েকেই নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন।
সরকারবাড়ির ঠাকুমার কাছেও ওঁর অনেক প্রশংসা শুনেছি।
যাঁরাই ওঁকে চিনতেন, জানতেন, তারাই ওঁর প্রশংসা করবেন।
উনি না থেমেই কণিকার দিকে তাকিয়ে বলেন, জানো ছোটমা, আমার মা ওঁকে প্রথম দেখে কী বলেছিলেন?
কণিকা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকাতেই অঘোরনাথ বলেন, বিয়ের পরপরই মা একদিন বড়বাবু আর বড়বউকে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছিলেন। সেদিন খাওয়া-দাওয়ার পর মা বড়বাবুকে বলেছিলেন, দুর্গা, তোমাকে একটা কথা বলে দিচ্ছি, তোমার এই বউ কিন্তু সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। এর মুখে যত দিন হাসি থাকবে, তত দিন তোমাদের সংসারে লক্ষ্মী বাঁধা থাকবে। আর এই বউমা যদি কোনো দুঃখ পায়, তাহলে বোধহয় তোমাদের মঙ্গল হবে না।
আমাদের ঠাকুমা এই কথা বলেছিলেন?
হ্যাঁ, ছোটমা, মা এই কথাই বলেছিলেন আর তা বর্ণে বর্ণে মিলে গেছে।
বড়বউ মারা যাবার পর ওদের কি হয়েছিল?
ওর মৃত্যুর পরই তো ওরা ধাপে ধাপে পড়তে শুরু করল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, ছোট মা, সত্যিই তাই।
.
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, সব গাছেরই হাজার হাজার শিকড় থাকে কিন্তু তার মধ্যে প্রধান শিকড়টাই গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখে, দাঁড় করিয়ে রাখে। সব সংসারেই এক একজন মানুষ থাকেন, যাঁকে কেন্দ্র করে সংসারের সুখ-শান্তি শ্রীবৃদ্ধি হয়। বড়বউ তো এইরকমই একজন ছিলেন।
দত্ত পরিবারের এই সব রোগ-শোক-মৃত্যুর পালা শুরু হবার আগে থেকেই বিশ্বের বাজারে নিদারুণ অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছিল কিন্তু তার গুরুত্ব বা ভবিষ্যৎ প্রভাব উপলব্ধির মতো বিদ্যা-বুদ্ধি ওদের কারুরই ছিল না। তখনও বিলেত থেকে জাহাজে সবকিছুই আসছে; দত্ত পরিবার সেসব বিক্রি করে লাভও করছে। তবে হ্যাঁ, এরই মধ্যে। দুএকটা কোম্পানি যন্ত্রপাতি পাঠাতে দেরি করছে বা তৈরি করা বন্ধ করে অন্য কিছু করছে। যে দুটি জার্মান কোম্পানি ইস্পাতের তৈরি যন্ত্রপাতি দত্তদের সাপ্লাই করতো, তারা তো সোজাসুজি জানিয়ে দিল, ওরা অন্য ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরিতে এতই ব্যস্ত যে ভারতবর্ষের এজেন্টদের অর্ডার নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হলো। এদিকে বিলেত থেকে আসা সব যন্ত্রপাতির দাম বাড়তে শুরু করল। শুধু তাই নয়, প্রায় সব বিলিতি কোম্পানিই জানিয়ে দিল, অর্ডারের সঙ্গে অর্ধেক দাম পাঠাতে হবে; বাকি অর্ধেক জাহাজ থেকে মালপত্র ছাড়াবার আগেই দিতে হবে।
