সে তো অনেক দেরি।
হ্যাঁ, তা একটু দেরি আছে ঠিকই কিন্তু আমার সঙ্গে নৌকোয় চড়ে বেড়াতে তোমার ভাল লাগে না?
ভাল কেন লাগবে না কিন্তু ভাইবোনেরা থাকলে খুব মজা হয়।
রাধা মুহূর্তের জন্য থেমেই বলে, ভাইবোনদের ছেড়ে থাকতে আমার একটুও ভাল লাগে না। সব সময় মনে হয়, ছুটে ওদের কাছে চলে যাই।
দুর্গাপদ ডান হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলেন, কিন্তু বড়মা, তুমি চলে গেলে আমি কাকে নিয়ে নৌকোয় চড়ে বেড়াব?
আমি কি একলা একলা ভবানীপুর যেতে পারি? তুমি আর বড়মাও তো আমার সঙ্গে যাবে।
রাধা একটা হাত দিয়ে দুর্গাপদর মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়েই জিজ্ঞেস করে, জ্যেঠুযাবে তো?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবো, তবে কিছুদিন পর।
.
দুর্গাপদ খুব ভাল করেই জানেন, বড়বউও এখানে এসে শান্তিতে নেই। থাকবেন কী করে? উনি যখন বউ হয়ে দত্তবাড়িতে আসেন, তখন ছোট দুই দেওর তো নেহতেই শিশু। গুরুপদকে তো উনি প্রায় নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করেন। তাছাড়া কালীপদ আর শ্যামাপদ তো ওঁর নিজের ভাইদের চাইতেও অনেক বেশি প্রিয়। সব চাইতে বড় কথা, নিজের ছেলেমেয়ে না হলেও দেওরদের ছেলেমেয়েরাই তো ওঁর প্রাণ, ওঁর এক একটা স্বপ্ন। এদের সবাইকে ছেড়ে কোনদিন কোথাও থামেনি, থাকতে পারেন না।
দুর্গাপদ জানেন, ভাল না লাগলেও অনেক কাজ করতে হয় সংসারী মানুষকে। তাই তো যে সংসার, যে ব্যবসা-বাণিজ্য উনি প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছেন, সেসব ছেড়ে থাকতে কষ্ট হলেও নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েছেন।
.
কলকাতার সঙ্গে নিয়মিত চিঠিপত্রের লেনদেন আছে! আগে ভাইরা প্রায় প্রত্যেক চিঠিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেই দুর্গাপদ উত্তর দিতেন, তোমরা প্রত্যেকেই যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ। বহু বছর ধরিয়াই তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সহিত জড়িত আছে। সুতরাং আমার স্থির বিশ্বাস, পরিস্থিতি অনুযায়ী তোমরা অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত লইবে। পদে পদে প্রবাসী গুরুজনের পরামর্শ লইয়া ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়, সম্ভবও নয়।
ভবানীপুরের বাড়ির সব খোঁজখবর জানিয়ে বড়বউএর কাছে হরদম সেজবউন বউ-এর চিঠি আসে। তবে ছোট দেওর-এর চিঠি এলেই বড়বউ-এর মন খারাপ হয়ে যায়। স্বামীকে শুনিয়ে উনি রাধাকে বলেন, নিজের পেটে ছেলেমেয়ে না ধরলেও তোর ছোটকাকাকেই তো আমি ছেলের মতো মানুষ করেছি। এই ছেলেটাকে কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে না শুলে আমিও ঘুমুতে পারতাম না, তোর ছোট কাকারও ঘুম আসতো না।
রাধা হাসতে হাসতে বলে, তুমি মাছের কাঁটা বেছে না দিলে তো ছোটকাকা এখনও খেতে পারে না।
বড়বউ একটু হেসে বলেন, আঠারো-বিশ বয়স পর্যন্ত আমি না খাইয়ে দিলে ওর পেটই ভরত না।
উনি সঙ্গে সঙ্গেই একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষগ্লভভাবে বলেন, ওর চিঠি পড়লেই মনে হয়, এখুনি ছুটে ভবানীপুরের বাড়িতে চলে যাই।
দুর্গাপদর কানে সব কথাই পৌঁছায় কিন্তু একটি কথাও বলেন না। তবে দু-চার দিন পর উনি বিকেলের চা খেতে বলেন, বড়বউ, তোমাকে দু-একটা কথা বলতাম।
হ্যাঁ, বল।
দেখো বড়বউ, আমাদের পরিবারের উপর লক্ষ্মীর আশীর্বাদ থাকলেও সরস্বতী মোটই সুপ্রসন্ন না। আমার ঠাকুর্দা দামোদর দত্ত কোনমতে পাঠশালার পাঠ শেষ করলেও মিডল স্কুলে একই ক্লাসে পরপর তিন বার ফেল করে পড়াশুনা ছেড়ে দেন। শুধু বুদ্ধি,পরিশ্রম আর নিষ্ঠার দ্বারা তিনি ব্যবসা বাণিজ্য করে অনেক টাকাকড়ি বিষয় সম্পত্তি করেন।
উনি একটু থেমে বলেন, বাবার সব কথাই তো তুমি জানো। তাছাড়া আমরা পাঁচ ভাই যে কী মহাপণ্ডিত, তাও তুমি খুব ভাল করেই জানো।
বড়বউ রাধাকে পাশে নিয়ে চুপ করে ওঁর কথা শোনেন।
বুঝলে বড়বউ, থার্ড ক্লাসে তিন বছর কাটিয়েও যখন সেকেন্ড ক্লাসে উঠতে পারলাম না, তখন বাবার নির্দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজকর্ম দেখাশুনা শুরু করলাম। আমি তখন ঠিক যোল বছরের।
দুর্গাপদ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, তারপর আটত্রিশ বছর শুধু ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তি আর সংসার ছাড়া আর কোনো দিকে মন দিইনি। আমার উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সব ভাইরাই খুশি থেকেছে।
উনি একটু থামেন; কি যেন একটু চিন্তা করেন। তারপর বলেন, বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হঠাৎ কালী আর মেজবউমা চলে যেতেই মনে হলো যদি কোনো কারণে আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমার তিনটে ভাই তো মহাবিপদে পড়বে। তাই ঠিক করলাম, আমি সুস্থ থাকতে থাকতেই ওদের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমি দূরে চলে যাবো।
দুর্গাপদ একটু হেসে বললেন, বুঝলে বড়বউ, আমাকে কাছে পেলে ওরা কোনোদিনই ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তির দায়-দায়িত্ব নেবে না। তাছাড়া…..
উনি কথাটা না শেষ করেই নীরব হয়ে যান।
বড়বউ বললেন, তাছাড়া কী? কথাটা শেষ কর।
বলছিলাম, সে রকম দরকার হলে ভাইরাও আমার কাছে আসবে বা আমিও ওদের কাছে যাব কিন্তু দিবারাত্র ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে সত্যি আর ভাল লাগে না।
বড়বউ একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, তুমি তো শুধু তোমার কথাই বললে কিন্তু আমিও তো একটা মানুষ! আমারও তো মন-প্রাণ ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে কিছু আছে। তার কি কোনো মূল্য নেই?
নিশ্চয়ই মূল্য আছে।
দুর্গাপদ একটু থেমে বলেন, কিন্তু বড়বউ, একটা বয়সে সংসারে যেমন জড়িয়ে পড়তে হয়, তেমনি একটা বয়সে সংসার থেকে মুক্তিও নিতে হয়। তা না হলে…
