বড়বউ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এখানে এক একটা দিন যেন এক একটা বছর!
রাধা একটু হেসে বলে, হ্যাঁ, বড়মা, ঠিক বলেছ। সব সময় ভবানীপুরের বাড়ির কথা মনে হয়।
হবেই তো!
উনি একটু থেমে বলেন, যে বাড়িতে পাঁচ ভাই, চারবউ, পাঁচটা ছেলেমেয়ে মিলিয়ে চোদ্দ জন ছাড়াও চাকর-দারোয়ন-কোচোয়ান মিলিয়ে আরো জনা দশেক লোক থাকতো, সে বাড়ি ছেড়ে এসে এখানে এভাবে বোবা হয়ে দিন কাটাতে কি কারুর ভাল লাগতে পারে?
তুমি জেঠুকে বলো না, আমরা ফিরে যাই।
তোর জেঠুকে বললেই যেন সে ফিরে যাবে!
বড়বউ একটু থেমে বলেন, তোর জেঠু সারা জীবনেও আর ওখানে ফিরে যাবে কি না খুব সন্দেহ আছে। একবার যখন বাড়িঘর ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে এসেছে, তখন আর ওসব ঝামেলায় ও যাবে না।
দুর্গাপদ মুখে কিছুই বলেন না। উনি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই দশাশ্বমেধ ঘাটে যান গঙ্গাস্নান করতে। তারপর একটু শাক-সবজি ফল-মূল কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরে এসে একটু কিছু মুখে দিয়েই জঙ্গমবাড়ির ওদিকে ভবানীপুরের জগদীশ মিত্তিরের ভাই নরেশবাবুর বাড়ি যান।
আরে দুর্গাপদ, এসো, এসো।
গড়গড়ার নল মুখ থেকে বের করেই নরেশচন্দ্র হাসতে হাসতে বলেন, বুঝলে দুর্গাপদ, ভবানীপুরের লোক ছাড়া কাউকেই ঠিক আপন মনে হয় না।
ফরাস পাতা বিরাট তক্তাপোশের উপর একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসতে বসতে দুর্গাপদ একটু হেসে বলেন, আমারও তো ঐ এক রোগ! তাই তো এখানে এত জানাশুনো লোকজন থাকা সত্ত্বেও শুধু আপনার কাছেই ছুটে আসি।
তা কি আমি জানি না?
নরেশচন্দ্র একটু হেসে বলেন, বাবার কাছে শুনেছি, বড় জ্যেঠু কাশী আসছেন শুনলেই স্যার আশুতোষ পর্যন্ত এখানে এসে হাজির হতেন। আবার আশুবাবু আসার পরের দিনই ত্রিদিব বাঁড়ুজ্যে এখানে চলে আসতেন।
ওঁর কথা শুনে দুর্গাপদ একটু হাসেন। চুপ করে ওঁর কথা শোনেন।
ওরে বাপু, তুমি আর আমিও তো সেই ভবানীপুরের জন্মেছি, বড় হয়েছি। তুমি আম কাছে না এলে তুমিও শান্তি পাবে না, আমিও পাবো না।
ঠিক বলেছেন।
নরেশচন্দ্র গড়গড়ার নলে দু-একটা টান দিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বেশ গম্ভীর হয়েই বলেন, দ্যাখো দুর্গাপদ, সরকারী চাকরি করার সুবাদে চট্টগ্রাম থেকে বাঁকুড়া, দাজিলিং থেকে বসিরহাট পর্যন্ত ঘুরতে হয়ছে। তাছাড়া বেড়াবার নেশা ছিল বলে মানস সরোবর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু সত্যি বলছি, ভবানীপুরের মতো একটা পাড়া ভূ-ভারতে আর দেখিনি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, দুর্গাপদ, সত্যিই তাই।
উনি একটু থেমে বলেন, এলাহাবাদ-লক্ষ্ণৌ-দিল্লি-করাচী-মাদ্রাজ- শহরেও অনেক ভাল ভাল এলাকা আছে। সে সব এলাকায় অনেক ভাল ভাল লোক বাস করেন, কিন্তু একই পাড়ায় আশু মুখুজ্যে, সি.আর.দাশ, সুভাষ বোস বা শরৎ বোসের বাড়ি, একথা বাইরের লোক শুনে ঠিক বিশ্বাস করতে চায় না।
সত্যি, ভবানীপুর নিয়ে আমাদের যথেষ্ট গর্বের কারণ আছে।
নরেশচন্দ্র একটু গলা চড়িয়ে বলেন, আমাদের পাড়া নিয়ে গর্ব করার হাজার কারণ আছে।
উনি না থেমেই এক নিঃশ্বাসে বলে যান, এই একটা পাড়ায় দুজন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট, দু-তিনজন ভাইস চ্যান্সেলার, দশ-বারোজন বিখ্যাত অধ্যাপক, দুর্গাদাস প্রমথেশ বড়ুয়ার মতো অভিনেতা, অন্তত চার-পাঁচজন আই-সি-এস, বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ডাক্তার, হাইকোর্টের তিন-চারজন জজ, দশ-বারোজন বিখ্যাত ব্যারিস্টার…..
ওঁর কথার মাঝখানেই দুর্গাপদ বলেন, এতগুলো বিখ্যাত লোক এক পাড়ায় থাকেন, ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়।
ওরে বাপু, তোমাদের মতো ব্যবসাদারই বা অন্য পাড়ায় কজন আছে?
কথাটা শুনে দুর্গাপদর খুবই ভাল লাগে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলেন, আপনার মতো বিলেত ফেরত এঞ্জিনিয়ারই বা অন্য পাড়ায় কজন আছেন?
ওঁর কথা শুনে নরেশচন্দ্র হাসতে হাসতে বলেন, ওরে বাপু, বাপ-জ্যেঠার পয়সায় বিলেত গিয়ে কোনোমতে একটা তকমা যোগাড় করতে পেরেছিলাম বলে সাহেবদের ঠকিয়ে বেশ জীবনটা কাটিয়ে দিলাম। শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই জানে, আমি কত ভাল এঞ্জিনিয়ার।
কী যে বলেন আপনি?
দুর্গাপদ, সত্যি কথাই বলছি। বিলেত থেকে একটা সার্টিফিকেট এনেছি বলেই মনে কর না, আমি দারুণ ভাল এঞ্জিনিয়ার।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, আমরা দুভাই যে মহাসুখে জীবন কাটিয়ে দিলাম, তাতে আমাদের বিশেষ কেরামতি নেই।
এবার উনি দুর্গাপদর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলেন, তুমি ভাবলে অবাক হবে, বাবার অঙ্কের বই আর জেঠুর ইতিহাস বই থেকে আমরা দুভাই বছরে অন্তত তিরিশ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা পাই।
বলেন কী?
হ্যাঁ, দুর্গাপদ, বাপ-জেঠার বইয়ের টাকাতেই আমাদের বাড়ি-গাড়ি সবকিছু।
নরেশচন্দ্র একটু গর্বের হাসি হেসে বলেন, জ্যেঠার ইতিহাস বই তো এখানকার হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরও পড়ান হয়।
সত্যি গর্বের কথা।
.
দুপুরবেলায় খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করার পর দুর্গাপদ প্রতিদিন বিকেলে রাধাকে নিয়ে গঙ্গায় নৌকো চড়ে ঘুরে বেড়ান বেশ কিছুক্ষণ।
দুর্গাপদ একটু হেসে রাধাকে জিজ্ঞেস করেন, কী বড়মা, এই গঙ্গায় নৌকো চড়ে ঘুরে বেড়াতে কেমন লাগে?
ভাল লাগে, তবে ভাইবোনরা নেই বলে তত ভাল নাগে না।
পুজোর ছুটিতে তো কলকাতা থেকে সবাই নিশ্চয়ই এখানে আসবে। তখন সব ভাইবোনদের নিয়ে..
